পাঁচ বছর ধরে ক্যানসারের বিরুদ্ধে লড়াই করছেন জনপ্রিয় উপস্থাপক সামিয়া আফরিন। দীর্ঘ চিকিৎসা শেষে স্বাভাবিক জীবনে ফিরলেও তিন মাস আগে তাঁর শরীরে আবারও ম্যালিগন্যান্ট টিউমার ধরা পড়েছে। এবার সমস্যার উৎস ওভারিয়ান বা ডিম্বাশয়ের ক্যানসার। বর্তমানে অস্ত্রোপচার সম্পন্ন করে কেমোথেরাপি চলমান রয়েছে। সামিয়া আফরিনের সাথে কথা বলেছেন মনজুর কাদের।

স্বাস্থ্যের প্রতিদিনের রুটিন নিয়ে সামিয়া জানান, তিনি খুব সকালে উঠেন। যদিও বাইরে হাঁটতে যান না, তবে বাসার ছাদে হাঁটাহাঁটি করেন। এরপর যোগব্যায়াম এবং শ্বাস-প্রশ্বাসের ব্যায়াম করেন। তিনি লক্ষ্য করেছেন যে, নির্দিষ্ট সময় পর হাঁপিয়ে উঠেন, যা ঠিক করার চেষ্টা করছেন। তিনি বলেন, "যেকোনো রোগীর ক্ষেত্রেই নিজের শরীরের দিকে খেয়াল রাখা জরুরি। না চাইলেও এসব নিয়ে কাজ করলে শরীরটা ধীরে ধীরে রিফর্ম করে। আসলে প্রাকৃতিক নিয়মেই অনেক কিছু রিফর্ম হয়, শরীরও তার ব্যতিক্রম না। রোগের বিষয়টাকে স্পোর্টিংলি নিতে পারলে পুরো প্রক্রিয়াটা আরও সহজ হয়।" খাদ্যাভ্যাসেও তিনি পরিবর্তন এনেছেন। তিনি বলেন, "খাবারও খুব বুঝেশুনে খাচ্ছি। যতটা সম্ভব ফ্রেশ ফুড খাওয়ার চেষ্টা করছি। বিষয়টা আমার কাছে বেশ মজারও লাগে। আগেকার দিনে ফ্রিজ ছিল না, প্রতিদিন বাজার হতো, প্রতিদিন রান্না হতো। তখন জীবনযাত্রা অনেক সহজ ছিল। এখন সবকিছু সহজ করার চেষ্টা করতে গিয়ে জীবনটাই যেন আরও জটিল হয়ে গেছে।"

মানসিক প্রশান্তির জন্য সামিয়া তার পরিবারের সময় কাটানোর ওপর জোর দেন। তিনি বলেন, "আমার সঙ্গে মা–বাবা থাকেন, সন্তানেরা থাকে—ওদের সঙ্গে সময় কাটাই। টুকটাক বই পড়ার চেষ্টা করি। অনেক সময় আল–কোরআনের সুরার বাংলা তরজমা পড়ি। এগুলো সময় নিয়ে পড়ি। নিয়মিতই পড়ি। মানসিকভাবে আমাকে সবচেয়ে বেশি আনন্দ দেয় গান। গান শুনতে খুব পছন্দ করি, গাইতেও ভালোবাসি। মেলোডিয়াস কোনো গান পেলেই শুনতে থাকি। এই সময়ে মুসাফির ক্যাফের সব গান আমার খুব প্রিয় হয়ে গেছে। দেখা যাচ্ছে, সারাদিন মুসাফির ক্যাফের গান শুনছি। এত সুন্দর! এসবই আমাকে বেশি স্বস্তি দিচ্ছে।" তিনি আরও জানান, অনেক সময় ফোন করা থেকে বিরত থাকেন কারণ তখন কথা বলতে ইচ্ছা করে না। বারান্দায় বসে গাছের সাথে সময় কাটানো এবং দুটি বিড়ালের সাথে থাকা তাকে আনন্দ দেয়। কাছের বন্ধুরা আসলেও তিনি সীমিত সময়ের মধ্যেই তাদের সাথে কথা বলেন।

পরিবারের সহযোগিতা নিয়ে তিনি বলেন, "সত্যি বলতে, বাসার সবার সহযোগিতা অবিশ্বাস্য। আমার হাজব্যান্ডের সাপোর্টের কথা আর কী বলব! মানুষ যখন ভালনারেবল থাকে, তখন কারও ছোট্ট কথাতেও অনেক বেশি আপসেট বা ইমোশনাল হওয়ার একটা বিষয় থাকে। আমার মনে হয়, এ ব্যাপারগুলো স্বামী–সন্তান ও মা–বাবা বেশ ভালোভাবেই বোঝে। অনেক সময় শরীরে ইরিটেশনের কারণে হয়তো আমার মেজাজ খারাপ হচ্ছে বা কারও কথা শুনতে ভালো লাগছে না—এ বিষয়গুলো ওরা খুব ভালোভাবে বোঝে। তাই ওরা কেউ কোনো যুক্তিতর্কে যায় না। জানি, এ পর্যায়টা চলে গেলে এসবও থাকবে না। ছোটখাটো বিষয়গুলো ওরা খুব সুন্দরভাবে সামলে নেয়।"

দীর্ঘ চিকিৎসার অভিজ্ঞতা জীবনদৃষ্টিতে কী পরিবর্তন এনেছে, সে বিষয়ে সামিয়া জানান, ২০২২ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত দুই বছর চিকিৎসা চালু ছিল এবং এরপর তিন বছর ফলোআপ হয়েছে। এই সময়ের মধ্যে তিনি একটি পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে গেছেন। তিনি বলেন, "এখন আমি খুব বেশি স্ট্রেসফুল কথা সহ্য করতে পারি না। আগে যে বিষয়গুলো আমাকে খুব বেশি ইফেক্ট করত না, এখন সেগুলোও করে। সেই জায়গা থেকে, নিজের মানসিক স্বাস্থ্যের নিরাপত্তার কথা ভেবে, আবেগ ঠিক রাখতে টক্সিক মানুষ থেকে দূরে থাকি। আমরা সবাই সামাজিক, সবার সঙ্গে চলাফেরা করব; কিন্তু কিছু ক্ষেত্রে নিজেকে নিরাপদে রাখাটাও জরুরি—এটাও বুঝতে হয়।"

চিকিৎসার মাঝেও তিনি নিজেকে কাজের সাথে যুক্ত রেখেছেন। তিনি জানান, 'পারপাস' নিয়ে পডকাস্ট করছেন। অপারেশনের আগে সব পর্বের শুটিং শেষ করেছেন এবং এখন সেগুলো প্রচার হচ্ছে। ফাউন্ডেশনের কাজ করছেন এবং ফেসবুক পেজ আপগ্রেড করার চেষ্টা করছেন। তিনি দুঃখ প্রকাশ করে বলেন, "অনেক মানুষ সাহায্য চান। সেখান থেকে কোনো কার্যক্রম এখন চালাতে পারছি না, সাহায্য করতে পারছি না—এটা ভেবে খারাপ লাগে।" ঈদের আগে ক্যানসার সচেতনতামূলক একটি মেডিকেল ক্যাম্প করেছেন। অক্টোবর, নভেম্বর ও ডিসেম্বরে রাজবাড়ীর গ্রামের বাড়িতে আরও দুটি ক্যাম্প করার পরিকল্পনা ছিল, তবে শারীরিক অবস্থার কারণে এখন ভ্রমণ করা কঠিন। তিনি বলেন, "তবে আল্লাহ যদি চান, এগুলো করতে চাই। আমার মনে হয়, আমরা কত ভাগ্যবান! সেরা চিকিৎসাসেবা পাচ্ছি, ভালো খাবার পাচ্ছি, অনেক ভালো আছি। অথচ আমাদের আশপাশে কত সুবিধাবঞ্চিত মানুষ, তাদের জন্য খারাপ লাগে। প্রতিদিন সকালে উঠে চিন্তা করি, ওদের জন্য যদি কিছু করে যাওয়া যায়। আমরা সম্মিলিতভাবে চেষ্টা করলে সম্ভব। একার পক্ষে কোনোভাবেই সম্ভব নয়।" ভবিষ্যতে একটি ওয়েলনেস স্টুডিও চালু করার ইচ্ছাও তার আছে।