কেউ কৌতূহল নিয়ে হাতে নিয়ে দেখছেন, কেউ দাম জানতে চাইছেন, আবার কেউ কেউ পছন্দ করে কিনে নিচ্ছেন। ময়মনসিংহের শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন উদ্যানের এক পাশে বসে কৃত্রিম ফুলের তোড়া বিক্রি করছেন সুমাইয়া আক্তার (ইলমা)। এই বিশেষ ফুলগুলো তৈরি করা হয়েছে পাইপ ক্লিনার দিয়ে, যা মূলত মখমল বা তুলার মতো ফাইবারে জড়ানো এক ধরনের নমনীয় ও চিকন ধাতব তার। দেখতে একদম প্রাকৃতিক ফুলের মতো হলেও এগুলো সহজে নষ্ট হয় না এবং সঠিক যত্নে রাখলে দীর্ঘদিন সতেজ থাকে।
মূলত অনলাইনে নিজের তৈরি পণ্য বিক্রি করে আসছিলেন সুমাইয়া (২৪)। তবে সাধারণ মানুষের সরাসরি আগ্রহ কেমন, তা যাচাই করতে গত বৃহস্পতিবার প্রথমবারের মতো উদ্যানের খোলা জায়গায় ফুলের তোড়া নিয়ে বসেন তিনি। শুরুতে মনে কিছুটা সংশয় ও চিন্তা থাকলেও ক্রেতাদের ব্যাপক সাড়া পেয়ে এখন বেশ আশাবাদী এই তরুণ উদ্যোক্তা।
ময়মনসিংহের গৌরীপুর উপজেলার ভালুকা এলাকার বাসিন্দা সুমাইয়া। তিনি চলতি বছর গৌরীপুর সরকারি কলেজ থেকে সমাজকর্মে স্নাতক সম্পন্ন করেছেন। ২০২৪ সালে তাঁর বিয়ে হয়। স্বামী বাহার উদ্দিন একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত। স্বামীর সঙ্গে বর্তমানে ত্রিশালে বসবাস করছেন সুমাইয়া। সংসারের দৈনন্দিন কাজ, পড়াশোনা এবং টিউশনির ব্যস্ততার ফাঁকেই অবসরে তিনি এই শৈল্পিক ফুলের তোড়া তৈরি করেন।
সুমাইয়ার উদ্যোক্তা হওয়ার যাত্রা শুরু হয় ২০২১ সালের শেষ দিকে। টিউশনির মাত্র ১ হাজার ৯০০ টাকা পুঁজি দিয়ে তিনি হস্তশিল্পের কাজ শুরু করেন। শুরুর দিকে তিনি ছবি আঁকতেন এবং ক্যানভাস পেইন্টিং করতেন। পরবর্তীতে হাতে নকশা করা পাঞ্জাবি, শাড়ি, ফটোফ্রেম ও শুভেচ্ছা কার্ড তৈরি করে অনলাইনে বিক্রি শুরু করেন। তাঁর এই সৃজনশীল কাজের ফেসবুক পেজের নাম ‘ইলমা রাফটস’।
তবে পাইপ ক্লিনারের ফুলের তোড়া তৈরির কাজ শুরু করার পর অন্যান্য হস্তশিল্পের কাজ আর করেন না সুমাইয়া। তাঁর ভাষ্যমতে, অনলাইনে ওই ধরনের পণ্য বিক্রির প্রতিযোগিতা অনেক বেশি এবং অনেকেই তা করেন। এক সময় তাঁর আগের হস্তশিল্পের পণ্যের বিক্রিও কমতে শুরু করে। তাই তিনি ভিন্নধর্মী কিছু তৈরির কথা চিন্তা করেন। বর্তমানে সব খরচ বাদ দিয়ে শুধুমাত্র তোড়া বিক্রি করেই তিনি মাসে ১০ থেকে ১২ হাজার টাকা আয় করছেন।
গত আট-নয় মাস ধরে সুমাইয়া পাইপ ক্লিনার ব্যবহার করে নানা নকশার ফুল বানাচ্ছেন। ফেসবুকে এই ধরনের ফুল তৈরির ভিডিও দেখে তাঁর মনে আগ্রহ জন্মে। ক্রেতার চাহিদা অনুযায়ী তিনি ছোট, মাঝারি ও বড়—নানা আকারের তোড়া তৈরি করেন এবং পছন্দমতো রং ও নকশাও করে দেন।
নিজের এই পথচলা সম্পর্কে সুমাইয়া বলেন, “ছোটবেলা থেকেই আর্ট ও ক্রাফটের প্রতি আগ্রহ ছিল। পরিবারের চাওয়া ছিল, পড়াশোনা শেষ করে চাকরি করি। তবে এসব কাজের প্রতি আমার টান রয়েছে। তাই পড়াশোনা ও অন্যান্য কাজের পাশাপাশি উদ্যোগটি চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছি।”
এই ফুল তৈরির প্রধান উপকরণ হলো পাইপ ক্লিনার। সুমাইয়া জানান, চীন ও জাপান থেকে অনলাইনে বিক্রেতারা এসব উপকরণ দেশে আনেন এবং তিনি তাঁদের কাছ থেকেই তা সংগ্রহ করেন। এর পাশাপাশি লাগে ফ্লোরাল টেপ (কৃত্রিম ফুল বানানোর বিশেষ কাগজের টেপ), ফিতা ও মোড়ানোর কাগজ। প্রায় ৮ ইঞ্চি লম্বা ও ৯ মিলিমিটার পুরু একটি পাইপ ক্লিনারের দাম দুই থেকে তিন টাকার মতো।
একটি বড় তোড়া তৈরি করতে উপকরণ বাবদ ২৫০ থেকে ৩০০ টাকা খরচ হয়। নকশাভেদে এটি তৈরি করতে দুই থেকে তিন ঘণ্টা বা তার বেশি সময় লাগে। এমন একটি তোড়া প্রায় এক হাজার টাকায় বিক্রি হয়। তবে সুমাইয়ার তৈরি তোড়ার দাম শুরু হয় মাত্র ৮০ টাকা থেকে। সম্প্রতি তিনি তিন হাজার টাকার একটি তোড়াও বিক্রি করেছেন। তবে নিয়মিত সময় দিতে না পারায় বর্তমানে বিক্রি কিছুটা সীমিত।
শিল্প ও কারুকার্যের প্রতি তাঁর ভালোবাসা ছোটবেলা থেকেই। পরিবারের প্রত্যাশা ছিল পড়াশোনা শেষ করে তিনি কোনো চাকরিতে যোগ দেবেন, কিন্তু সৃজনশীল কাজের প্রতি তাঁর প্রবল আকর্ষণ তাঁকে এই পথে নিয়ে এসেছে। তাই পড়াশোনা ও পারিবারিক দায়িত্বের পাশাপাশি তিনি এই উদ্যোগটি এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছেন।
এই যাত্রায় সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ছিল মানসম্মত উপকরণের পাইকারি বাজার খুঁজে পাওয়া। সুমাইয়া বলেন, “অনেকে খুচরা বিক্রি করেন। কিন্তু ভালো মানের উপকরণ কম দামে কোথায় পাওয়া যায়, তা খুঁজে বের করতে বেশ কষ্ট হয়েছে। এখনো পড়াশোনা, টিউশনি ও সংসারের কাজের পর বিকেলে বা রাতে সময় বের করে কাজ করি।”
সুমাইয়ার এই প্রচেষ্টায় তাঁর স্বামী বাহার উদ্দিন পূর্ণ সমর্থন দিয়েছেন। উপকরণ সংগ্রহ থেকে শুরু করে প্যাকেজিং পর্যন্ত নানা কাজে তিনি সহযোগিতা করেন। বাহার বলেন, “আগে ও (সুমাইয়া) হাতে নকশা করা পাঞ্জাবি তৈরি করে অনলাইনে বিক্রি করত। পরে ভিডিও দেখে নতুন কাজ শিখেছে। কাজটা ভালো। অবসর সময় কাজে লাগিয়ে নিজের একটা উদ্যোগ গড়ে তোলার চেষ্টা করছে। লেগে থাকলে সামনে আরও ভালো করা সম্ভব।”
প্রাকৃতিক ফুল খুব দ্রুত শুকিয়ে যায়, কিন্তু পাইপ ক্লিনারের তৈরি এই কৃত্রিম ফুল যত্নে রাখলে দীর্ঘস্থায়ী হয়। এমনকি ময়লা হলে সাবান ও পানি দিয়ে এগুলো পরিষ্কার করা সম্ভব। সুমাইয়া বলেন, “পড়াশোনা ও পরিবারের দায়িত্ব সামলে এই কাজটাও চালিয়ে যেতে চাই। অনেক নারী ও তরুণ এ ধরনের কাজ করছেন। তাঁদের দেখে উৎসাহ পাই। নিয়মিত কাজ করতে পারলে একদিন উদ্যোগটি আরও বড় করতে পারব বলে আশা করি।”
উদ্যান পরিদর্শনে আসা সাবিহা বিনতে জামান ও নীলা নৌরিন এই ফুলগুলো দেখে মুগ্ধ হন। তাঁদের মতে, ফুলগুলো অত্যন্ত সুন্দর। তাজা ফুল অল্প দিনেই নষ্ট হয়ে যায়, কিন্তু প্রায় কাছাকাছি দামেই এই কৃত্রিম ফুলগুলো কিনে দীর্ঘদিন ঘর সাজিয়ে রাখা যাবে।