শারদীয় দুর্গাপূজাকে কেন্দ্র করে বর্ণিল আলোকসজ্জায় সেজেছে কবি জীবনানন্দের স্মৃতিবিজড়িত শহর বরিশাল। নগরীর প্রধান সড়ক থেকে শুরু করে অলিগলি, মন্দির এবং পূজামণ্ডপ—সবখানেই এখন রঙিন বাতির ঝলকানি। সন্ধ্যা নামলেই আলোয় বদলে যাচ্ছে পুরো নগরের দৃশ্যপট। এই দৃষ্টিনন্দন আলোকসজ্জা উপভোগ করতে পরিবার-পরিজন নিয়ে রাস্তায় বের হচ্ছেন সব বয়সী মানুষ। দূর-দূরান্ত থেকেও ভিড় করছেন দর্শনার্থীরা, যাদের চোখেমুখে স্পষ্ট উৎসবের আনন্দ। অন্যদিকে, দেবী দুর্গার আগমনে অশুভ শক্তির বিনাশ এবং সমাজে শান্তি ও সম্প্রীতি প্রতিষ্ঠার প্রত্যাশা করছেন সনাতন ধর্মাবলম্বীরা।

স্বর্গলোক ছেড়ে মর্ত্যলোকে এসেছেন দেবী দুর্গা। দেবীর এই আগমনকে ঘিরে চারদিকে এখন উৎসবের আমেজ। নানা আয়োজন ও নতুন সাজে সেজে উঠেছে মন্দির ও পূজামণ্ডপগুলো। ঢাকের বাদ্য, শঙ্খধ্বনি আর ভক্তদের প্রার্থনায় মুখর হয়ে উঠেছে চারপাশ। প্রতিমা দর্শনের পাশাপাশি মণ্ডপের নান্দনিক সাজসজ্জা ও আলোকসজ্জা উপভোগ করছেন দর্শনার্থীরা।

পূজাকে কেন্দ্র করে বরিশাল নগরীর সদর রোড, হাসপাতাল রোড, বিএম কলেজ এলাকা ও কালীবাড়ি সড়কসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় করা হয়েছে বর্ণিল আলোকসজ্জা। নগরের বিভিন্ন ওয়ার্ডের পূজামণ্ডপের সামনে তৈরি করা হয়েছে নানা নকশার আলোকিত তোরণ। সন্ধ্যার পর এসব সড়ক ও মণ্ডপে মানুষের ভিড় ক্রমশ বাড়ছে। আলোর এই সৌন্দর্য দেখতে এক মণ্ডপ থেকে অন্য মণ্ডপে ঘুরছেন অনেকে।

আলোকসজ্জা দেখতে আসা দর্শনার্থী আশীষ চৌধুরী টুটুল বলেন, “ঐতিহ্যবাহী শ্রী শ্রী শঙ্কর মঠ ও জগন্নাথ মন্দিরে মণ্ডপের মূল সজ্জার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে দৃষ্টিনন্দন আলোকসজ্জা করা হয়েছে। আলো-আঁধারির অপূর্ব খেলা পুরো পরিবেশকে আরও আকর্ষণীয় করে তুলেছে। বরিশালে প্রতিবছরই দুর্গাপূজা ঘিরে এমন বর্ণিল আলোকসজ্জা করা হয়, যা দেখতে বিভিন্ন এলাকা থেকে মানুষ ছুটে আসেন। এবারও পরিবার নিয়ে পুরো বরিশাল ঘুরে দেখেছি। প্রতিটি মণ্ডপের সাজসজ্জা, আলোর ঝলকানি এবং উৎসবের পরিবেশ আমাদের মুগ্ধ করেছে। সব মিলিয়ে খুবই ভালো লেগেছে। পরিবারের সবাইকে নিয়ে এমন সুন্দর পরিবেশে ঘুরতে পারা সত্যিই আনন্দের। ধর্মীয় উৎসব হলেও এই আয়োজন সব ধর্মের মানুষের মধ্যে আনন্দ, সম্প্রীতি ও সৌহার্দ্যের বন্ধন আরও দৃঢ় করে।”

দর্শনার্থী শতাব্দী সরকার বলেন, “এবার দুর্গাপূজা উপলক্ষে বিভিন্ন মণ্ডপে দৃষ্টিনন্দন আলোকসজ্জা করা হয়েছে। গতবারের তুলনায় এবার আলোকসজ্জায় বেশ ভিন্নতা আনা হয়েছে, যা মণ্ডপগুলোর সৌন্দর্য আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। সন্ধ্যার পর আলোর ঝলমলে সাজে পুরো এলাকা উৎসবমুখর হয়ে উঠছে। মণ্ডপের সাজসজ্জা, আলোকসজ্জা ও সার্বিক আয়োজন দেখতে দর্শনার্থীরাও ভিড় করছেন। সব মিলিয়ে এবার পূজার পরিবেশ বেশ ভালো লাগছে। আমাদের প্রত্যাশা, শারদীয় দুর্গাপূজা শান্তিপূর্ণ, আনন্দমুখর ও উৎসবের আমেজে সম্পন্ন হবে। সব ধর্মের মানুষের অংশগ্রহণে সম্প্রীতি ও সৌহার্দ্যের বন্ধন আরও দৃঢ় হবে। সবাই নির্বিঘ্নে পূজামণ্ডপ ঘুরে দেখবেন এবং আনন্দের মধ্য দিয়ে উৎসব উদ্‌যাপন করবেন এটাই আমাদের প্রত্যাশা।”

আরেকজন দর্শনার্থী নারায়ণ সাহা বলেন, “শারদীয় দুর্গাপূজা উপলক্ষে বরিশাল নগরীকে দৃষ্টিনন্দনভাবে সাজানো হয়েছে। নগরীর সদর রোড থেকে শুরু করে হাসপাতাল রোড, বিএম কলেজ এলাকা ও কালীবাড়ি সড়কসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সড়ক বাহারি রঙের বাতিতে আলোকিত করা হয়েছে। এ ছাড়া নগরের বিভিন্ন ওয়ার্ডের পূজামণ্ডপের সামনে নানা নকশার রঙিন বাতি দিয়ে তৈরি করা হয়েছে দৃষ্টিনন্দন তোরণ। সন্ধ্যার পর এসব আলোকসজ্জায় পুরো নগরী যেন নতুন রূপে সেজে উঠেছে। পূজামণ্ডপগুলোতে দর্শনার্থীদের ভিড় বাড়ছে, সবাই ঘুরে ঘুরে প্রতিমা ও মণ্ডপের সাজসজ্জা দেখছেন। আমরাও পরিবারের সদস্যদের নিয়ে এই সুন্দর আয়োজন উপভোগ করতে বের হয়েছি। একসঙ্গে বিভিন্ন মণ্ডপ ঘুরে দেখা, আলোকসজ্জা উপভোগ করা এবং উৎসবের আনন্দ ভাগাভাগি করতে খুবই ভালো লাগছে। বরিশালে প্রতিবছরই দুর্গাপূজাকে ঘিরে এমন আয়োজন হয়, যা নগরীর সৌন্দর্য বাড়ানোর পাশাপাশি মানুষের মধ্যে আনন্দ ও সম্প্রীতির বন্ধন আরও দৃঢ় করে।”

দেবী দুর্গার আগমন অশুভ শক্তিকে বিনাশ করবে—এমন প্রত্যাশার কথা জানিয়ে বরিশালের শ্রী শ্রী শংকর মঠ পূজা উদ্‌যাপন কমিটির সভাপতি লিমন কৃষ্ণ সাহা কানু বলেন, “দেবী দুর্গার আগমনের মধ্য দিয়ে পৃথিবী থেকে সব অশুভ শক্তির বিনাশ হবে এবং সত্য ও সুন্দরের জয় প্রতিষ্ঠিত হবে এটাই আমাদের প্রত্যাশা। দেবী দুর্গা শক্তি, সাহস ও ন্যায়ের প্রতীক। তার আগমন আমাদের মধ্যে নতুন আশার সঞ্চার করে। অশুভ শক্তিকে দূর করে সমাজে শান্তি, সম্প্রীতি ও কল্যাণ প্রতিষ্ঠার প্রত্যাশা থেকেই পুরো বরিশাল নগরীকে বর্ণিল আলোকসজ্জায় সাজানো হয়েছে। এবার বরিশাল জেলার ১০টি উপজেলা ও সিটি করপোরেশন মিলিয়ে মোট ৬৩৭টি পূজামণ্ডপে শারদীয় দুর্গাপূজার আয়োজন করা হয়েছে। প্রতিটি মণ্ডপে নিজস্ব পরিকল্পনা ও নান্দনিকতার সমন্বয়ে সাজসজ্জা এবং আলোকসজ্জা করা হয়েছে। সন্ধ্যার পর রঙিন আলোর ঝলকানিতে মণ্ডপগুলো আরও আকর্ষণীয় হয়ে উঠছে। দর্শনার্থীরা পরিবার-পরিজন নিয়ে মণ্ডপে মণ্ডপে ঘুরে পূজার আনন্দ উপভোগ করছেন। এমন বর্ণিল আলোকসজ্জা আমাদের দীর্ঘদিনের ঐতিহ্যের অংশ। আমরা বিশ্বাস করি, আলোর এই আয়োজন অন্ধকার ও অশুভ শক্তির অবসানের প্রতীক। দুর্গাপূজার মধ্য দিয়ে সব ধর্মের মানুষের মধ্যে সৌহার্দ্য, সম্প্রীতি ও ভ্রাতৃত্বের বন্ধন আরও সুদৃঢ় হবে। সবাই যেন শান্তিপূর্ণ ও উৎসবমুখর পরিবেশে শারদীয় দুর্গোৎসব উদ্‌যাপন করতে পারেন, সেটাই আমাদের প্রত্যাশা।”

এদিকে, দুর্গোৎসব ঘিরে নগরীর পূজামণ্ডপগুলোতে নিরাপত্তা জোরদার করেছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। নিয়মিত টহলের পাশাপাশি বিভিন্ন মন্দির ও পূজামণ্ডপ পরিদর্শন করছেন পুলিশ কর্মকর্তারা। উৎসবের পরিবেশ বজায় রাখা এবং যেকোনো অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।

বরিশাল মেট্রোপলিটন পুলিশের কমিশনার আবু রায়হান মুহাম্মদ সালেহ্ বলেন, “শারদীয় দুর্গাপূজা নির্বিঘ্ন, শান্তিপূর্ণ ও উৎসবমুখর পরিবেশে উদ্‌যাপন নিশ্চিত করতে বরিশাল মেট্রোপলিটন পুলিশের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় সব ধরনের নিরাপত্তাব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। নগরীর প্রতিটি পূজামণ্ডপের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পুলিশ সদস্যরা দায়িত্ব পালন করছেন। পাশাপাশি বিভিন্ন পূজামণ্ডপ পরিদর্শন, নিয়মিত টহল এবং সার্বিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। পূজাকে কেন্দ্র করে কোনো ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনা যেন না ঘটে, সে বিষয়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সতর্ক রয়েছে। পূজা উদ্‌যাপন কমিটির নেতাদের সঙ্গেও সমন্বয় রাখা হচ্ছে, যাতে কোথাও কোনো সমস্যা দেখা দিলে দ্রুত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া যায়। নগরীর সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে সব ধরনের প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়েছে। আমরা চাই, ধর্ম-বর্ণনির্বিশেষে সবাই যেন নিরাপদ পরিবেশে শারদীয় দুর্গোৎসবের আনন্দ ভাগাভাগি করতে পারেন। এ জন্য নগরবাসীকে সচেতন থাকার পাশাপাশি যেকোনো ধরনের সন্দেহজনক পরিস্থিতি নজরে এলে পুলিশকে জানানোর অনুরোধ করছি।”