শারদীয় দুর্গাপূজার মহাষ্টমীর পুণ্যলগ্নে সিলেটের জৈনপুরে অবস্থিত শ্রী শ্রী মহালক্ষ্মী গ্রীবা মহাপীঠে অত্যন্ত জাঁকজমকপূর্ণভাবে কুমারী পূজা অনুষ্ঠিত হয়েছে। সোমবার (১৯ অক্টোবর) মহাঅষ্টমীর সকালে এই বিশেষ ধর্মীয় আচার সম্পন্ন হয়। সিলেটে দ্বিতীয়বারের মতো আয়োজিত এই কুমারী পূজার কথা শুনে ভোর থেকেই মহালক্ষ্মী মন্দিরে ভক্তদের উপচে পড়া ভিড় লক্ষ্য করা যায়। কেবল স্থানীয়রা নয়, বরং দূর-দূরান্ত থেকেও অসংখ্য দর্শনার্থী ও পুণ্যার্থী এই বিশেষ পূজা প্রত্যক্ষ করতে এখানে ছুটে আসেন। ফলে পূজা শুরু হওয়ার আগেই পুরো মন্দির প্রাঙ্গণ ভক্তদের ভিড়ে পরিপূর্ণ হয়ে ওঠে।
সকাল ৮টার সময় কুমারী পূজার আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম শুরু হয়। ঢাক, ঢোল, কাঁসর, শঙ্খ ও ঘণ্টার গম্ভীর শব্দের সাথে পুরোহিতের মন্ত্রোচ্চারণের মধ্য দিয়ে এই পূজা পর্বের সূচনা করা হয়। এরপর সকাল ১০টায় কুমারী দেবীর অধিষ্ঠান আচারের মাধ্যমে পূজার মূল আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন হয়।
নারীশক্তির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা ও সম্মান জানানোর একটি প্রতীকী আয়োজন হিসেবে এই পূজায় দেবী দুর্গার প্রতিরূপ হিসেবে একজন কুমারী কন্যাকে পূজা করা হয়। সনাতন ধর্মীয় বিশ্বাস অনুযায়ী, প্রতিটি নারীর ভেতরেই দেবী মহামায়ার অবিনশ্বর শক্তি বিদ্যমান। এই বিশ্বাসের ওপর ভিত্তি করেই কুমারী কন্যার মধ্যে দেবীর রূপ কল্পনা করে পূজা-অর্চনা করা হয়। কুমারী পূজার মূল উদ্দেশ্য হলো নারীশক্তির আরাধনার পাশাপাশি সমাজের প্রতিটি নারীর প্রতি শ্রদ্ধা ও সম্মান প্রদর্শনের গুরুত্ব ফুটিয়ে তোলা।
এই বিষয়ে মহালক্ষ্মী গ্রীবা মহাপীঠের পুরোহিত বলেন, “মহাষ্টমীর পূজার্চনার অংশ হিসেবে কুমারীকে দেবী দুর্গার প্রতীক ধরে আরাধনা করা হয়। সনাতন ধর্মীয় বিশ্বাস অনুযায়ী, এ পূজায় নারীর মধ্যে নিহিত দেবীশক্তি ও মাতৃশক্তির বন্দনা করা হয়। এর মাধ্যমে নারীশক্তির প্রতি শ্রদ্ধা, সম্মান ও মর্যাদার বার্তাই সমাজে ছড়িয়ে দেওয়া হয়।”
জৈনপুরে দ্বিতীয়বারের মতো এমন আয়োজন করায় স্থানীয় ভক্তদের মধ্যে ব্যাপক উৎসাহ ও উদ্দীপনা পরিলক্ষিত হয়। পূজাকে কেন্দ্র করে মণ্ডপে ভক্তদের স্বতঃস্ফূর্ত উপস্থিতি এবং ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতার কারণে চারদিকে এক উৎসবমুখর পরিবেশ তৈরি হয়। আয়োজকদের মতে, ধর্মীয় ঐতিহ্য ও সংস্কৃতিকে ধারণ করে কুমারী পূজার এই আয়োজন যদি ধারাবাহিকভাবে রাখা যায়, তবে নতুন প্রজন্মের কাছে সনাতন ধর্মীয় আচারের তাৎপর্য এবং নারীশক্তির মাতৃরূপের মহিমা আরও স্পষ্টভাবে ফুটে উঠবে।
পূজায় আগত অতিথিদের মধ্যে সিলেট-৩ আসনের সংসদ সদস্যের স্ত্রী দিনারা মালিক সবাইকে শারদীয় শুভেচ্ছা জানিয়ে বলেন, “এ পূজোয় আমার প্রথম আসা। জীবনের প্রথম এমন অভিজ্ঞতা পেয়ে খুবই ভালো লাগছে। সত্যি আমি খুব উৎসাহিত, আমার জন্য এটি সম্পূর্ণ নতুন একটি অভিজ্ঞতা।”
অন্যতম অতিথি হিসেবে উপস্থিত ভারতীয় সহকারী হাইকমিশনারের স্ত্রী সুমনা দাস বলেন, “আমি জানতাম এখানে সতী মায়ের গ্রীবা শক্তিপীঠ আছে। তবে এখানে কুমারী পূজা এবারই প্রথম দেখছি। এখানকার মানুষের ভাব, ভক্তি ও আনন্দ দেখে আমি মুগ্ধ। মনে হচ্ছে যেন কলকাতাতেই বসে আছি, কলকাতাকে একদমই মিস করছি না।”
ভারতীয় সহকারী হাইকমিশনার অনিরুদ্ধ দাস তাঁর অনুভূতি ব্যক্ত করে বলেন, “আমি আগেও এই শক্তিপীঠে এসেছি। তবে আজকের কুমারী পূজা উপলক্ষে আমন্ত্রিত হয়ে অংশ নিতে পেরে সত্যিই খুব ভালো লাগছে।”
জৈনপুরের শ্রী শ্রী মহালক্ষ্মী গ্রীবা মহাপীঠ মন্দিরের সভাপতি শিবব্রত ভৌমিক জানান, “এবারের পূজোতেও আমরা পুলিশ প্রশাসন থেকে শুরু করে রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ সকলের সর্বাত্মক সহযোগিতা পেয়েছি। আশা করছি পূজার বাকি আনুষ্ঠানিকতাও অত্যন্ত আনন্দঘন পরিবেশে সম্পন্ন হবে।”