মাত্র ১১ বছর বয়স, কিন্তু তার অসামান্য সৃজনশীলতা ও ভক্তি জয় করে নিয়েছে পুরো এলাকার মানুষের মন। দিনাজপুরের বীরগঞ্জ পৌরসভার হরিবাসরপাড়ার শিশু মাধুর্য্য রায় নিজ হাতে দেবী দুর্গা ও অন্যান্য দেব-দেবীর প্রতিমা তৈরি করে আয়োজন করেছে দুর্গাপূজার। আর তার নিপুণ হাতে গড়া সেই দুর্গা প্রতিমা দেখার জন্য দূর-দূরান্ত থেকে ছুটে আসছেন ভক্ত ও দর্শনার্থীরা।
বীরগঞ্জ পৌরসভার ৭ নম্বর ওয়ার্ডের হরিবাসরপাড়ার বাসিন্দা নিত্যানন্দ রায় ও গোলাপি রানী বর্মনের সন্তান মাধুর্য্য রায়। নিজেদের বসতবাড়িতেই ব্যতিক্রমী এই দুর্গোৎসবের আয়োজন করেছে তার পরিবার। শারদীয় উৎসবকে কেন্দ্র করে তার এই উদ্যোগ কেবল পূজার আনুষ্ঠানিকতায় সীমাবদ্ধ থাকেনি; বরং এটি নিজের হাতে শিল্প সৃষ্টির আনন্দ এবং দীর্ঘদিনের অনুশীলনে গড়ে ওঠা এক শিশুর সৃজনশীলতার অনন্য বহিঃপ্রকাশ। ছোট্ট দুটি হাতের স্পর্শে কাদা-মাটি আর খড় থেকে প্রাণ পেয়েছেন দেবী দুর্গা, গণেশ, কার্তিক, লক্ষ্মী ও সরস্বতী। প্রতিমা তৈরি, রং করা, সাজসজ্জা থেকে শুরু করে আলোকসজ্জা—সবকিছুতেই মিশে আছে মাধুর্য্যের সৃজনশীলতার ছাপ। শিশুটির এমন অসাধারণ প্রতিভা প্রত্যক্ষ করতে প্রতিদিনই ভিড় করছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।
মাটি ও খড় দিয়ে একে একে প্রতিমা গড়ার পর নিজের হাতেই সেগুলোতে রং লাগিয়েছে এবং নানা উপকরণে সাজিয়েছে মাধুর্য্য। পূজামণ্ডপের সাজসজ্জা ও আলোকসজ্জার কাজেও ছিল তার সক্রিয় অংশগ্রহণ। এত কম বয়সে এমন নিখুঁতভাবে প্রতিমা গড়ার চেষ্টা এবং প্রতিটি কাজে তার আন্তরিকতা দেখে মুগ্ধ হচ্ছেন দর্শনার্থীরা।
জানা গেছে, প্রায় পাঁচ বছর আগে খুব ছোট পরিসরে মাটি দিয়ে প্রতিমা তৈরির কাজ শুরু করে মাধুর্য্য। সেই থেকে ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে তার আগ্রহ ও দক্ষতা। এবারের শারদীয় দুর্গোৎসবকে সামনে রেখে প্রায় ৪০ দিন আগে থেকেই শুরু হয় তার প্রস্তুতি। দীর্ঘ সময় ধরে একমনে নিজের হাতে প্রতিমা তৈরি ও মণ্ডপ সাজানোর কাজ করে সে। পরিবারের সহযোগিতা আর নিজের প্রবল ইচ্ছাশক্তিতেই রূপ নিয়েছে এই ব্যতিক্রমী আয়োজন।
সন্তানের এমন প্রতিভায় আনন্দিত মাধুর্য্যের মা গোলাপি রানী বর্মন ও বাবা নিত্যানন্দ রায়। পরিবারের অন্য সদস্যরাও তাকে সার্বিক উৎসাহ জোগাচ্ছেন। মামা কৃষ্ণ চন্দ্র বর্মনসহ স্বজনদের কাছে মাধুর্য্যের এই উদ্যোগ এখন গভীর আনন্দ ও গর্বের বিষয়।
দিনাজপুর শহরের রায়সাহেব বাড়ি এলাকার বাসিন্দা কল্পনা রানী মাধুর্য্যের মণ্ডপে পূজা দেখতে এসে বলেন, “দিনাজপুর শহরে এমনকি আমার বাড়ির পাশেই বড় পরিসরে দুর্গাপূজার আয়োজন হয়েছে। কিন্তু ১১ বছরের এক শিশুর নিজ হাতে তৈরি প্রতিমা দেখার আগ্রহ থেকে এখানে এসেছি। প্রতিমাটি সত্যিই খুব সুন্দর হয়েছে।”
আরেক দর্শনার্থী যুথি রাণী জানান, দুর্গাপূজায় তারা সাধারণত বিভিন্ন মন্দিরে ঘুরে পূজা দেখেন। তবে এবার ১১ বছরের একটি শিশুর নিজের হাতে তৈরি প্রতিমা ও এই ব্যতিক্রমী আয়োজন দেখতে এসেছেন। শিশুটির এমন উদ্যোগ সত্যিই প্রশংসনীয় বলে তিনি মনে করেন।
নিজের অনুভূতির কথা জানিয়ে মাধুর্য্য রায় বলে, “আমি বেশ কয়েক বছর ধরে দুর্গাপ্রতিমা তৈরি করছি। প্রতিবছর নিজের হাতেই প্রতিমা বানাই। এবারের প্রতিমাটি তৈরি করতে আমার প্রায় দেড় মাস সময় লেগেছে। আমি নিজেই পূজার আয়োজন করি, আর এ কাজে মা আমাকে সব রকম সহযোগিতা করেন।”
মাধুর্য্যের মা গোলাপি রানী বর্মন বলেন, “ছোটবেলা থেকেই মাটি দিয়ে নানা কিছু তৈরি করতে পছন্দ করত সে। মাটি নাড়াচাড়া করতে করতে প্রথমে ঘোড়া, হাতিসহ বিভিন্ন খেলনা বানাত। একসময় নিজেই দুর্গাপ্রতিমা গড়া শুরু করে। আমি চাই, তার মনের ইচ্ছা পূরণ হোক। মেয়েকে খুশি রাখতে নিজের সাধ্যমতো সহযোগিতা করি। তার এমন আগ্রহ ও কাজ দেখে আমারও খুব ভালো লাগে।”
বীরগঞ্জ উপজেলা পূজা উদযাপন পরিষদের সাধারণ সম্পাদক গোপাল দেব শর্ম্মা বলেন, “মাত্র ১১ বছর বয়সে মাধুর্য্যের এমন সৃজনশীল উদ্যোগ অত্যন্ত প্রশংসনীয়। আগ্রহ, অধ্যবসায় ও নিয়মিত চর্চা থাকলে এত ছোট বয়সেও যে দক্ষতার স্বাক্ষর রাখা যায়, মাধুর্য্য তারই উৎকৃষ্ট উদাহরণ।”