বর্জ্য হিসেবে ফেলে দেওয়া প্লাস্টিকের বোতল যখন ময়লার স্তূপে জমা হয়, তখন তা পরিবেশের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়ায়। কিন্তু সেই পরিত্যক্ত বোতলগুলোকেই সৃজনশীলতার ছোঁয়ায় অসাধারণ এক শিল্পকর্মে রূপান্তর করা হয়েছে শেরপুরের এক দুর্গাপূজা মণ্ডপে। প্লাস্টিক বোতলের পাশাপাশি তুলা ও নেটের নিখুঁত ব্যবহার করে সেখানে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে মেঘের আবহ। আলো-আঁধারির চমৎকার খেলায় মণ্ডপটি এক মায়াবী রূপ নিয়েছে। পরিবেশবান্ধব চিন্তা এবং শৈল্পিকতার এমন মেলবন্ধন দেখতে এখন দর্শনার্থীদের উপচে পড়া ভিড় লক্ষ্য করা যাচ্ছে।

শেরপুর শহরের নয়ানী বাজার কালীর বাজার মা ভবতারা মন্দিরে দুর্গাপূজার ৫৩ বছর পূর্তি উপলক্ষে এই বর্ণিল আয়োজনটি করেছে স্থানীয় মার্চেন্ট ক্লাব। এবারের মণ্ডপসজ্জার মূল উপাদানে প্রাধান্য পেয়েছে ফেলে দেওয়া প্লাস্টিকের বোতল। প্রায় ছয় হাজারের বেশি বোতল ব্যবহার করে এই ব্যতিক্রমী সাজসজ্জাটি সম্পন্ন করা হয়েছে। এর সাথে তুলা ও নেটের সমন্বয়ে মেঘের দৃশ্য তৈরি করা হয়েছে, যা মণ্ডপের সামগ্রিক সৌন্দর্যে এক নতুন মাত্রা যোগ করেছে।

প্লাস্টিক বোতলের এই অভিনব রূপায়ণ যেমন দর্শনার্থীদের দৃষ্টি আকর্ষণ করছে, তেমনি পরিবেশ সচেতনতার এক শক্তিশালী বার্তাও পৌঁছে দিচ্ছে। বর্জ্য হিসেবে বিবেচিত প্লাস্টিক বোতলকে কাজে লাগিয়ে এমন সৃজনশীল উদ্যোগ সর্বমহলে প্রশংসিত হচ্ছে। ফলে সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত এই মণ্ডপটি পরিদর্শনে ভিড় করছেন সব বয়সের মানুষ।

মণ্ডপে আসা দর্শনার্থী অজয় কুমার বলেন, “আগেরবার এখানে পাখির আদলে সাজানো হয়েছিল, আর এবার করা হয়েছে বোতল দিয়ে। বিগত বছরের চেয়ে এবার এটি আরও বেশি সুন্দর লাগছে। প্রতি বছরই নতুন নতুন থিমে মণ্ডপ সাজানো হয়, যা দেখতে আমাদের খুব ভালো লাগে। তাই পরিবার নিয়ে ঘুরতে আসলাম এবং স্মৃতি হিসেবে কিছু ছবিও তুলে রাখলাম।”

অন্যদিকে, ঐশী পাল নামের অপর এক দর্শনার্থী বলেন, “এই উদ্যোগ থেকে আমরা বড় অনুপ্রেরণা পেতে পারি। প্লাস্টিক যত্রতত্র না ফেলে যদি পুনর্ব্যবহারের (রিসাইকেল) মাধ্যমে দরকারি বা নান্দনিক কিছু তৈরি করি, তবে তা সবার জন্যই কল্যাণকর হবে। প্লাস্টিক বোতল দিয়ে অনেক ধরনের শিল্পকর্ম তৈরি সম্ভব। এটি একদিকে যেমন মেধার চর্চা বাড়াবে, অন্যদিকে ঘরের সৌন্দর্যও বৃদ্ধি করবে।”

এই মণ্ডপের পুরো সাজসজ্জার কাজটি করেছেন শহরের নয়ানী বাজার এলাকার দুই ভাই গৌর মালাকার ও নিতাই মালাকার। তাদের মতে, প্লাস্টিক প্রতিনিয়ত পরিবেশের মারাত্মক ক্ষতি করছে। সেই প্লাস্টিক দিয়েই যে সুন্দর ডেকোরেশন বা শিল্পকর্ম তৈরি করা সম্ভব—পরিবেশ রক্ষার সেই বার্তাটিই দিতে চেয়েছেন তারা। চারজন সহকারীর সহায়তায় দীর্ঘ দেড় মাসেরও বেশি সময় ধরে তারা এই কাজ সম্পন্ন করেছেন। ছয় হাজারের বেশি প্লাস্টিক বোতল, তুলা ও নেটের সমন্বয়ে মেঘের আবহের ওপর চমৎকার আলোকসজ্জা করে মণ্ডপটিকে আকর্ষণীয় রূপ দেওয়া হয়েছে।

আয়োজক কমিটির সদস্যরা জানান, অনিয়ন্ত্রিত প্লাস্টিক ব্যবহারের অপকারিতা সম্পর্কে মানুষকে সচেতন করতেই এই বিশেষ প্রয়াস। পূজা শেষ হওয়ার পর মণ্ডপে ব্যবহৃত সব বোতল পরিবেশসম্মত উপায়ে অপসারণ করা হবে বলেও তারা আশ্বাস দিয়েছেন।

মার্চেন্ট ক্লাবের সভাপতি মিহির কুমার দত্ত মুকুল বলেন, “প্লাস্টিকের ক্ষতিকর প্রভাব সম্পর্কে সচেতনতা সৃষ্টির পাশাপাশি সৃজনশীল উপায়ে মণ্ডপ সাজানোর চেষ্টা করেছি। এই ব্যতিক্রমী আয়োজনের মূল উদ্দেশ্যই হলো মানুষের কাছে পরিবেশ রক্ষার একটি শক্ত বার্তা পৌঁছে দেওয়া।”

উল্লেখ্য যে, গত বছর মার্চেন্ট ক্লাবের আয়োজনে পাখি থিমে সাজানো পূজা মণ্ডপটি জেলাজুড়ে ব্যাপক সাড়া ফেলেছিল। এবার ফেলে দেওয়া প্লাস্টিক বোতলের সমন্বয়ে তৈরি এই ব্যতিক্রমী মণ্ডপটিও একইভাবে দর্শনার্থীদের দারুণভাবে আকৃষ্ট করছে।