পর্দার সাহসী উপস্থিতি, ব্যক্তিগত জীবনে একাধিক আলোচিত প্রেম, ভেঙে যাওয়া সংসার এবং তারকাদের মনের গোপন কথা বের করে আনার এক অনন্য দক্ষতা—সব মিলিয়ে সিমি গাড়োয়ালের জীবন যেন কোনো সিনেমার চিত্রনাট্য। ষাট ও সত্তরের দশকে হিন্দি সিনেমার নায়িকাদের পর্দায় উপস্থিতির ক্ষেত্রে যখন নানা সামাজিক বিধিনিষেধ বলবৎ ছিল, ঠিক সেই সময়েই ঘনিষ্ঠ দৃশ্যে অভিনয় করে তিনি আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে চলে এসেছিলেন। পরবর্তীতে তাঁর সঞ্চালনায় টেলিভিশনের পর্দায় বলিউডের বহু তারকা নিজেদের ব্যক্তিগত জীবনের কথা অকপটে খুলে বলতেন। অভিনয়শিল্পী থেকে শুরু করে টেলিভিশনের সঞ্চালক—সিমির এই দীর্ঘ পথচলায় যেমন মিশে আছে সাফল্য, তেমনি রয়েছে বিতর্ক, প্রেম আর বিচ্ছেদের দীর্ঘ সারি। গত ১৭ অক্টোবর ছিল তাঁর জন্মদিন। ১৯৪৭ সালের এই দিনে ভারতের পাঞ্জাবের লুধিয়ানায় জন্ম নেওয়া সিমি পা দিলেন ৭৯ বছরে।
সিমির ক্যারিয়ারের সবচেয়ে আলোচিত অধ্যায়গুলোর একটি হলো রাজ কাপুরের ‘মেরা নাম জোকার’। ১৯৭০ সালে মুক্তি পাওয়া এই ছবিটিতে তিনি মেরি নামের এক শিক্ষিকার চরিত্রে অভিনয় করেন। ছবিতে কিশোর রাজুর ভূমিকায় দেখা গিয়েছিল ঋষি কাপুরকে। শিক্ষিকার প্রতি কিশোরের আকর্ষণ এবং কৈশোর থেকে যৌবনে পদার্পণের মানসিক পরিবর্তন ফুটিয়ে তুলতে একটি দৃশ্যে সিমিকে পোশাক বদলাতে দেখা যায়। দৃশ্যটি তৎকালীন সময়ে ব্যাপক আলোচনা ও বিতর্কের জন্ম দিয়েছিল এবং তাঁর পরিচিতিকে বদলে দিয়েছিল।
তবে কেবল বিতর্কেই সীমাবদ্ধ থাকেনি এই ছবিটিতে তাঁর অভিনয়। পরিচালক রাজ কাপুরের সঙ্গে কাজের অভিজ্ঞতা নিয়ে এক সাক্ষাৎকারে সিমি জানিয়েছিলেন, “মেরি চরিত্রটি নির্মাণের ক্ষেত্রে রাজ কাপুর তাঁকে যথেষ্ট স্বাধীনতা দিয়েছিলেন।” তিনি নিজের পোশাকের নকশা করার পাশাপাশি কয়েকটি দৃশ্যে সংলাপ তৈরির সুযোগও পেয়েছিলেন। যদিও ছবিটি বাণিজ্যিকভাবে শুরুতে প্রত্যাশা পূরণ করতে পারেনি, তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এটি একটি কালজয়ী সিনেমার মর্যাদা লাভ করে এবং দর্শকের স্মৃতিতে মেরি চরিত্রটি অম্লান হয়ে থাকে।
এর দুই বছর পর ১৯৭২ সালে মুক্তি পায় ‘সিদ্ধার্থ’। হারমান হেসের বিখ্যাত উপন্যাস অবলম্বনে নির্মিত ইংরেজি ভাষার এই ছবিতে শশী কাপুরের বিপরীতে অভিনয় করেন সিমি। তাঁর চরিত্রের নাম ছিল কমলা। জীবনের প্রকৃত অর্থ ও আত্মিক উপলব্ধির সন্ধানে থাকা এক তরুণের যাত্রায় প্রেম, কামনা ও জাগতিক অভিজ্ঞতার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল এই ছবিটিতে।
‘সিদ্ধার্থ’ ছবিতে নগ্নতা ও ঘনিষ্ঠ দৃশ্য থাকায় ভারতে তীব্র বিতর্ক তৈরি হয়েছিল। সেন্সর বোর্ডের আপত্তি ও কাটছাঁটের কারণে ছবিটির প্রদর্শনীও বাধার মুখে পড়ে। ফলে অভিনয়ের পাশাপাশি এই বিতর্কও সিমির পরিচিতির অংশ হয়ে ওঠে। দীর্ঘ বছর পর সেই অভিজ্ঞতা নিয়ে নিজের ওয়েবসাইটে লিখেছেন সিমি। তাঁর বক্তব্য, চরিত্রটির ঘনিষ্ঠ দৃশ্যগুলো নিয়ে তিনি প্রথমে কিছুটা দ্বিধায় ছিলেন। পরে নিজেকে চরিত্রের ভেতর স্থাপন করে অভিনয় করেছেন। তাঁর কাছে সেটি ছিল কমলার গল্পের প্রতি বিশ্বস্ত থাকার বিষয়। অর্থাৎ, পর্দায় যা করেছেন, তা চরিত্রের প্রয়োজনে—নিজের ব্যক্তিজীবনের প্রকাশ হিসেবে নয়।
এই অবস্থানটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, ভারতীয় সিনেমায় নারী অভিনয়শিল্পীদের সাহসী দৃশ্যের আলোচনা প্রায়শই তাঁদের অভিনয় দক্ষতাকে ছাপিয়ে যায়। সিমির ক্ষেত্রেও পর্দার সাহসী উপস্থিতি নিয়ে যত আলোচনা হয়েছে, তাঁর অভিনয়ের বৈচিত্র্য নিয়ে ততটা গুরুত্ব দেওয়া হয়নি।
সিমির ক্যারিয়ার শুধু বিতর্কিত দৃশ্যের গল্প নয়; বরং তিনি মূলধারার বাণিজ্যিক সিনেমা এবং শিল্পসম্মত চলচ্চিত্র—উভয় ধারাতেই কাজ করার সুযোগ পেয়েছেন। ১৯৬২ সালে ‘টারজান গোজ টু ইন্ডিয়া’ ছবির মাধ্যমে অভিনয়ে অভিষেক হয় তাঁর। এরপর ‘দো বদন’, ‘সাথী’সহ বেশ কিছু ছবিতে অভিনয় করেন তিনি।
১৯৭০ সালে সত্যজিৎ রায়ের ‘অরণ্যের দিনরাত্রি’ ছবিতে অভিনয় করেন সিমি। বাঙালি এই প্রবাদপ্রতিম পরিচালকের ছবিতে কাজ করা তাঁর ক্যারিয়ারের অন্যতম উল্লেখযোগ্য অভিজ্ঞতা। পরবর্তীতে মৃণাল সেনের ‘পদাতিক’ ছবিতেও তাঁকে দেখা গেছে। অন্যদিকে রাজ কাপুরের ‘মেরা নাম জোকার’, যশ চোপড়ার ‘কাভি কাভি’ এবং সুভাষ ঘাইয়ের ‘কর্জ’-এর মতো ছবিতে কাজ করে বাণিজ্যিক হিন্দি সিনেমাতেও নিজের শক্ত অবস্থান তৈরি করেন তিনি। ১৯৮০ সালের ‘কর্জ’ ছবিতে তাঁর অভিনীত কামিনী চরিত্রটি বিশেষভাবে আলোচিত। ছবিতে ঋষি কাপুরের বিপরীতে তাঁকে দেখা যায় এক উচ্চাকাঙ্ক্ষী, রহস্যময় ও নেতিবাচক প্রবণতার নারী হিসেবে। চরিত্রটির জটিলতা ও পর্দায় উপস্থিতি ছবিটির অন্যতম স্মরণীয় দিক।
নিজের অভিনয়জীবন নিয়ে সিমি একসময় বলেছিলেন, সে সময়ের বলিউডের তুলনায় তিনি কিছুটা ভিন্ন মানসিকতার ছিলেন। বাঁধা চিত্রনাট্য, সময়নিষ্ঠা ও পেশাদার কর্মপরিবেশের প্রতি তাঁর প্রবল আগ্রহ ছিল। নিজের ওয়েবসাইটে তিনি জানিয়েছেন, রাজ কাপুর, সত্যজিৎ রায়, মৃণাল সেন, সুভাষ ঘাই ও রমেশ সিপির মতো পরিচালকদের সঙ্গে কাজ করতে পারা তাঁর সৌভাগ্য। তাঁর অভিনীত ছবির সংখ্যা ৫০-এর বেশি।
কৈশোরে প্রেম এবং জীবনে একাধিক সম্পর্ক সিমির ব্যক্তিগত জীবনকেও দীর্ঘকাল আলোচনায় রেখেছে। ১৭ বছর বয়সে জামনগরের মহারাজা শত্রুশল্যসিংহজির সঙ্গে তাঁর প্রেমের সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল বলে বিভিন্ন সাক্ষাৎকার ও সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। লন্ডনে বসবাসের সময় তাঁদের পরিচয় ও ঘনিষ্ঠতা তৈরি হয়, তবে সেই সম্পর্ক বিয়ে পর্যন্ত গড়ায়নি। পরে ভারতীয় ক্রিকেট দলের সাবেক অধিনায়ক মনসুর আলী খান পতৌদির সঙ্গে সিমির সম্পর্কের কথা আলোচিত হয়। কিন্তু পতৌদির জীবনে পরবর্তীতে শর্মিলা ঠাকুর আসায় সিমির সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক টেকেনি। এছাড়া পাকিস্তানি রাজনীতিক সালমান তাসিরের সঙ্গেও সিমির সম্পর্ক ছিল বলে বিভিন্ন জীবনীমূলক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
১৯৭০ সালে ব্যবসায়ী রবি মোহনের সঙ্গে বিয়ে করেন সিমি। কিন্তু সেই সংসার স্থায়ী হয়নি এবং ১৯৭৯ সালে তাঁদের বিবাহবিচ্ছেদ হয়। এরপর তিনি আর বিয়ে করেননি। সিমির জীবনের এই অধ্যায় নিয়ে কৌতূহল থাকলেও সম্পর্কের প্রতিটি খুঁটিনাটি নিয়ে নিশ্চিত তথ্য পাওয়া যায় না। তাই তাঁর ব্যক্তিগত জীবনকে কেবল প্রেম ও বিচ্ছেদের হিসাব দিয়ে বিচার করা ঠিক হবে না। বরং গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ব্যক্তিগত জীবনের নানা অভিজ্ঞতার মধ্যেও তিনি নিজের পেশাগত পরিচয় ধরে রেখেছেন এবং পর্দার বাইরেও নতুনভাবে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করেছেন।
সিমির ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে কথা উঠলে ভারতের প্রয়াত শিল্পপতি রতন টাটারের প্রসঙ্গও সামনে আসে। বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে তাঁদের ঘনিষ্ঠতা ও সম্পর্কের কথা প্রকাশিত হয়েছে। সিমি নিজেও এক সাক্ষাৎকারে রতন টাটারের সঙ্গে নিজের সম্পর্কের বিষয়ে কথা বলেছিলেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। তবে তাঁদের সম্পর্ক নিয়ে অতিরঞ্জিত গল্পের চেয়ে সিমির নিজের বক্তব্যকে গুরুত্ব দেওয়াই যুক্তিযুক্ত। তারকাদের ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে জনমনে আগ্রহ থাকলেও সব সম্পর্কের পরিণতি বিয়ে হয় না, আর সম্পর্কের সব দিক জনসমক্ষে প্রকাশ করাও বাধ্যতামূলক নয়।
অভিনেত্রী হিসেবে পরিচিতি পাওয়ার পর সিমি নিজেকে নতুনভাবে প্রতিষ্ঠা করেন টেলিভিশনে। তাঁর সঞ্চালনায় ‘রঁদেভু উইথ সিমি গাড়োয়াল’ অনুষ্ঠানটি একসময় ভারতীয় টেলিভিশনের জনপ্রিয় তারকা সাক্ষাৎকার অনুষ্ঠানে পরিণত হয়। সাদা পোশাক, শান্ত উপস্থিতি ও ব্যক্তিগত প্রশ্ন করার স্বতন্ত্র ভঙ্গির জন্য তিনি পরিচিতি পান ‘লেডি ইন হোয়াইট’ নামে।
অনুষ্ঠানটির বিশেষত্ব ছিল, অতিথিদের শুধু কাজের প্রচার বা সাফল্যের গল্পে সীমাবদ্ধ রাখা হতো না। তাঁদের প্রেম, সম্পর্ক, পারিবারিক জীবন, ব্যর্থতা ও ব্যক্তিগত অনুভূতি নিয়েও কথা হতো। অনেক সময় এমন প্রশ্নও করা হতো, যেগুলোর উত্তর তারকারা সাধারণ সাক্ষাৎকারে এড়িয়ে যেতেন।
রেখার সঙ্গে সিমির সাক্ষাৎকারটি এই ক্ষেত্রে বিশেষভাবে আলোচিত। ২০০৪ সালে প্রচারিত সেই পর্বে রেখাকে অমিতাভ বচ্চনের প্রতি তাঁর অনুভূতি নিয়ে প্রশ্ন করেছিলেন সিমি। রেখা অকপটে নিজের মুগ্ধতার কথা বললেও অমিতাভের সঙ্গে ব্যক্তিগত সম্পর্ক থাকার কথা অস্বীকার করেন। সেই সাক্ষাৎকারের নানা অংশ পরবর্তী সময়েও সংবাদমাধ্যমে আলোচনায় এসেছে।
অভিনয় ও সঞ্চালনার পাশাপাশি সিমি নির্মাতা ও প্রযোজক হিসেবেও কাজ করেছেন। নিজের প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার পর টেলিভিশন অনুষ্ঠান, তথ্যচিত্র ও চলচ্চিত্র নির্মাণে যুক্ত হন তিনি। রাজ কাপুরকে নিয়ে তথ্যচিত্র নির্মাণ এবং ভারতের সাবেক প্রধানমন্ত্রী রাজীব গান্ধীকে নিয়ে তথ্যচিত্রের কাজও তাঁর ক্যারিয়ারের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।