সৌদি আরবের মক্কায় প্রবাসী যুবক নজরুল ইসলামের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়ার খবরে গভীর শোকের ছায়া নেমে এসেছে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বিরামপুর গ্রামে। চার ভাইবোনের মধ্যে বড় নজরুলকে হারিয়ে দিশেহারা হয়ে পড়েছেন তার পরিবারের সদস্যরা। স্বজনদের গুরুতর অভিযোগ, মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের আগে তাদের কোনো কিছুই জানানো হয়নি। বর্তমানে নজরুলের বাবা-মা তাদের সন্তানের মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনার জন্য আকুতি জানাচ্ছেন।

নজরুলের মৃত্যুর সংবাদ শুনে শোকের মাত্রা আরও বেড়েছে ওই পরিবারে। একই দিনে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন নজরুলের ফুফু আবেদা বেগম। একদিকে প্রিয়জনকে হারানোর বেদনা, অন্যদিকে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের প্রকৃত পরিস্থিতি সম্পর্কে স্পষ্ট তথ্যের অভাব—সব মিলিয়ে চরম অনিশ্চয়তা ও শোকের মধ্যে দিন কাটাচ্ছে পরিবারটি।

পরিবারের সদস্যদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, পরিবারের আর্থিক সচ্ছলতা ফিরিয়ে আনার স্বপ্ন নিয়ে ২০২২ সালের ১০ নভেম্বর সৌদি আরবে পাড়ি জমান ২০ বছর বয়সী নজরুল ইসলাম। সেখানে যাওয়ার প্রায় ছয় মাস পর মক্কার একটি মসজিদে এক তরুণীর সঙ্গে অনৈতিক কর্মকাণ্ডে লিপ্ত থাকার অভিযোগে নজরুলসহ দুজনকে গ্রেপ্তার করে সৌদি পুলিশ। নজরুলের গ্রেপ্তারের খবর পরিবার জানতে পারলেও, ঠিক কী অভিযোগে তাকে আটক করা হয়েছিল, তা তারা জানতে পারেননি বলে দাবি করেছেন স্বজনরা। পরিবারের ভাষ্যমতে, তিন বছর তিন মাস কারাগারে দীর্ঘ সময় কাটানোর পর গত বুধবার (১৪ অক্টোবর) নজরুলের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়।

নজরুলের মা রহিমা বেগম জানান, কারাগারে থাকাকালীন প্রতি রোববার পরিবারের সঙ্গে কথা বলতেন নজরুল। কিন্তু তার মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের বিষয়ে পরিবারকে আগে থেকে কিছু জানানো হয়নি। বুধবার গণমাধ্যমে খবর দেখার পর তারা প্রথম জানতে পারেন যে তাদের ছেলে আর বেঁচে নেই।

নজরুলের বাবা আব্দুল বাছির বলেন, ‘আমার ছেলে কী কারণে জেলে ছিল, তা আমি এখনও জানি না। হঠাৎ ফেসবুকে তার মৃত্যুর সংবাদ দেখতে পেলাম। নজরুলের মৃত্যুদণ্ডের খবর শুনে তার ফুফু আবেদা বেগম বুধবার রাতে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যান।’

তিনি আরও বলেন, ‘আমার ছেলেকে সাত লাখ টাকা ঋণ করে পরিবারের হাল ধরতে প্রবাসে পাঠিয়েছিলাম। যাওয়ার ছয় মাস পর থেকেই সে জেলে ছিল। এর মধ্যে দেড় লাখ টাকা পাঠিয়েছিল। ঋণদাতারাও আমাকে চাপ দিচ্ছেন। আমি আমার ছেলের মরদেহ দেশের মাটিতে ফিরে পেতে চাই। আমার ছেলেকে যদি বিনা কারণে মৃত্যুদণ্ড দিয়ে থাকে, এর বিচার আমি চাই।’

নজরুলের মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের খবর ছড়িয়ে পড়ার পর থেকে বিরামপুর গ্রামের বাসিন্দারা নিয়মিত তাদের বাড়িতে গিয়ে খোঁজখবর নিচ্ছেন এবং শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানাচ্ছেন।

ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা শাখার জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি ও স্থানীয় বাসিন্দা গাজী নিয়াজুল করিম বলেন, ‘নজরুলকে যে শাস্তি দেওয়া হয়েছে, এমন কোনো অপরাধ সে করেছে বলে মনে করছি না। সরকারের কাছে আবেদন, ওই দেশের সঙ্গে যোগাযোগ করে সঠিক তথ্য উদ্‌ঘাটন করা হোক। এখন পর্যন্ত যা দেখছি, বাংলাদেশ দূতাবাসের যথেষ্ট অবহেলা রয়েছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘তারা যদি যোগাযোগ করত, তাহলে এই পরিস্থিতি হতো না। কিছুদিন আগে শ্রীলঙ্কার এক নাগরিকের এমন সাজা হয়েছিল, কিন্তু তাদের দেশের দূতাবাস ব্যবস্থা নিয়ে ওই নাগরিককে দেশে নিয়ে গিয়েছিল। এখন পর্যন্ত নজরুলের পরিবারের সঙ্গেও যোগাযোগ করেনি কেউ।’

গ্রামের বাসিন্দা রাহাত ও মাইনুদ্দিনও নজরুলের মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের ঘটনায় তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন। তাদের দাবি, নজরুলকে আত্মপক্ষ সমর্থনের যথাযথ সুযোগ দেওয়া হয়েছিল কি না এবং সেই সুযোগ ছাড়াই শাস্তি কার্যকর করা হয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। নজরুলের পরিবারের পাশে দাঁড়ানোর জন্য তারা দুই দেশের সরকারের প্রতি আহ্বান জানান।

সামাজিক সংগঠক শামীম আহমেদ এই ঘটনায় প্রশ্ন তুলে বলেন, ‘তিন বছরেরও বেশি সময় ধরে বাংলাদেশের দুজন নাগরিক এভাবে কারাগারে ছিলেন। দীর্ঘ বিচারপ্রক্রিয়া শেষে তাদের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়েছে। অথচ বাংলাদেশ দূতাবাস বিষয়টি জানত না—এটা কীভাবে সম্ভব? তাদের মূল কাজ কী, তা নিয়েও নানা প্রশ্ন রয়েছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘শুধু এই বিচার নয়, সৌদি আরবে নারী কর্মীদের যৌন হয়রানি থেকে শুরু করে অমানবিক নির্যাতনের খবরও বিভিন্ন গণমাধ্যমে উঠে এসেছে। এসব ঘটনা বন্ধে এখন পর্যন্ত কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেওয়ার কথা শুনিনি।’

এই পুরো বিষয়টি নিয়ে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার জেলা প্রশাসক মো. আবু সাঈদ জানান, ‘প্রশাসনের পক্ষ থেকে আমাদের কোনো নির্দেশনা দেওয়া হয়নি। পরিবারের পক্ষ থেকেও কোনো আবেদন করা হয়নি। মরদেহ দেশে এলে, যেহেতু তিনি ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বাসিন্দা, নিয়ম অনুযায়ী সহায়তা করা হবে।’