সৌদি আরবে বাংলাদেশের দুজন নাগরিকের বিচার হলো, মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হলো, সেই দণ্ড কার্যকরও হয়ে গেল। অথচ বাংলাদেশের কর্তৃপক্ষ বলছে, আগে কিছুই জানত না; সংবাদমাধ্যমে খবর প্রকাশের পর বিষয়টি তাদের নজরে এসেছে।
এমন ঘটনায় সরকারের প্রথম প্রতিক্রিয়া হওয়ার কথা ছিল উদ্বেগ জানানো, ব্যাখ্যা দাবি করা এবং নিজেদের দায়িত্ব পালনে কোথায় ঘাটতি ছিল, তা খতিয়ে দেখার অঙ্গীকার ব্যক্ত করা।
কিন্তু সেটা সঠিকভাবে হয়নি; বরং বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়ার ঘটনায় সরকারের একজন প্রতিমন্ত্রীর ‘উপদেশ’, সরকারি দলের একজন সংসদ সদস্যের অবমাননাকর বক্তব্য এবং বিরোধী দলগুলোর ‘নীরব’ ভূমিকা নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনা হচ্ছে। সব মিলিয়ে প্রশ্ন উঠছে, নাগরিকের জীবন ও মর্যাদা আমাদের সরকার ও রাজনৈতিক দলের কাছে আসলে কতটা গুরুত্ব পায়?
‘পাপের লাশ’ কথাটির মধ্যেই রয়েছে মানুষকে অপবিত্র ও অগ্রহণযোগ্য হিসেবে চিহ্নিত করার মানসিকতা। কোনো অপরাধের দায়ে দণ্ডিত হলেও একজন মানুষের মৃতদেহ অপমান বা অবমাননার বিষয় হয়ে যায় না। তাঁর পরিবারের শোকও তুচ্ছ হয়ে যায় না। তাঁদের স্বজনের মরদেহ দেশে আসবে কি না, সেটি একজন সংসদ সদস্যের ব্যক্তিগত পছন্দের বিষয়ও নয়।
পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম বলেছেন, ‘সৌদিতে দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড আমাদের জন্য বড় শিক্ষা।’ (সৌদিতে দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড আমাদের জন্য শিক্ষা: শামা ওবায়েদ, মুক্তকণ্ঠ অনলাইন ১৭ অক্টোবর ২০২৬)। প্রশ্ন হলো, শিক্ষাটি কার জন্য? প্রবাসীদের জন্য, নাকি তাঁদের আইনি সুরক্ষার দায়িত্বে থাকা সরকারের জন্য?
আইন মেনে চলার পরামর্শ দেওয়া সহজ। কিন্তু দেশের বাইরে একজন নাগরিক গ্রেপ্তার হলে তিনি আইনজীবী পেলেন কি না, অভিযোগ বুঝতে পারলেন কি না, নিজের বক্তব্য জানানোর সুযোগ পেলেন কি না—এসব নিশ্চিত করতে দূতাবাসগুলোকে কাজ করতে হয়। সেই কাজ কতটা হয়েছে, তার হিসাব না দিয়ে মৃত নাগরিকদের ঘটনাকে অন্যদের জন্য ‘সতর্কবার্তা’ বানানো দায়িত্ব এড়িয়ে যাওয়ার শামিল।
অভিযোগ ও বিচারপ্রক্রিয়ার পূর্ণাঙ্গ তথ্য এখনো প্রকাশিত হয়নি। তাই বাংলাদেশের দুই নাগরিক আত্মপক্ষ সমর্থনের পর্যাপ্ত সুযোগ পেয়েছেন কি না—তা নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না। তথ্যের এই অভাবই সরকারের কাছে প্রশ্ন তোলার কারণ। বিচারপ্রক্রিয়া সম্পর্কে না জেনে সেটির ফলকে অন্যদের জন্য ‘শিক্ষা’ হিসেবে হাজির করা কতটা দায়িত্বশীল কাজ?
পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী আরও বলেছেন, ‘তাদের আইনে যখন একটা ঘটনা ঘটে, তখন কিন্তু আমাদের করার খুব একটা কিছু থাকে না।’ (বাংলাদেশকে না জানিয়ে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের বাস্তবতা কতটুকু?, বাংলা ট্রিবিউন, ১৭ অক্টোবর ২০২৬)। এই ‘অসহায় আত্মসমর্পণের’ ভাষা পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর মুখে মানায় না। অন্য দেশের আদালতের রায় বাংলাদেশ বদলে দিতে পারে না। কিন্তু আইনজীবী নিয়োগে সহায়তা, কনস্যুলার যোগাযোগ, আপিলের সুযোগ এবং দণ্ড লঘু করার আবেদন—এসবের জন্য উদ্যোগ নিতে পারে।
সম্প্রতি সৌদি আরবেই ধর্ম অবমাননার মামলায় শ্রীলঙ্কার এক নাগরিককে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছিল। এরপর শ্রীলঙ্কার সরকার কূটনৈতিক ও আইনি উদ্যোগ নেয়। বিশেষ আইনজীবী দল সৌদি আইনজীবীদের সঙ্গে কাজ করে। পরে সৌদি সুপ্রিম কোর্ট সেই মৃত্যুদণ্ড বাতিল করেন।
দুই অভিযোগ বা মামলার পরিস্থিতি এক নয়। বাংলাদেশ উদ্যোগ নিলেও একই ফল হতো, তা-ও বলা যায় না। কিন্তু শ্রীলঙ্কার উদাহরণটি অন্তত ‘করার খুব একটা কিছু থাকে না’ বক্তব্যের দুর্বলতা দেখিয়ে দেয়।
আলোচনা-সমালোচনার মধ্যে ১৮ অক্টোবর সৌদি রাষ্ট্রদূতকে ডেকে বিস্তারিত তথ্য চেয়েছে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। তবে মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা এটিকে ‘তলব’ না বলে বৈঠক হিসেবে উল্লেখ করেছেন। কিন্তু এটি জবাবদিহির উদ্যোগ, নাকি জনমতের চাপ সামলানোর ব্যবস্থা তা বোঝা যাবে পরবর্তী পদক্ষেপে।
এ রকম পরিস্থিতির মধ্যে আরও উদ্বেগজনক হলো বিএনপির সংসদ সদস্য কামরুজ্জামান রতনের বক্তব্য। স্টার নিউজের টক শোতে সৌদি আরবে মৃত্যুদণ্ড পাওয়া বাংলাদেশের দুই নাগরিকের মৃতদেহ বাংলাদেশে আনা সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘...এই পাপের লাশটা বাংলাদেশে আসুক, অন্তত এইটা আমি কখনোই আশা করব না। আমি ব্যক্তিগতভাবে অন এয়ারে—এটা বললাম। এ জন্য আমার যদি শাস্তি হয় বেআইনিভাবে, আপনারা আমাকে শাস্তি দেন—আই মাস্ট অ্যাকসেপ্ট।..’ এ বিষয়ে তিনি কোনো ‘মানবতা দেখাবেন না’ বলেও বক্তব্যে উল্লেখ করেন। তিনি তাঁর বক্তব্যের পক্ষে নিজের মতো করে ধর্মীয় ব্যাখ্যাও দেন।
দুই মৃত ব্যক্তিকে নিয়ে কামরুজ্জামান রতনের অবমাননাকর বক্তব্য সম্পর্কে বিশিষ্ট শিক্ষক, গবেষক ও প্রাবন্ধিক মোরশদ শফিউল হাসান ফেসবুকে এক পোস্টে লিখেছেন, ‘প্রথমে আমিও ভেবেছিলাম ইনি জামায়াত, খেলাফত বা ইসলামী আন্দোলনের সংসদ সদস্য। কিন্তু এখন জানছি যে, না, তিনি সরকারি দল বিএনপি থেকে নির্বাচিত একজন এমপি। তো এমন মন-মানসিকতা, ভাবনা বা দৃষ্টিভঙ্গির অধিকারী নেতা-কর্মী বিএনপিতে অনেকই আছেন বলে মনে হয়। অন্য দল, যেমন, আওয়ামী লীগ ও জাতীয় পার্টিতেও কি নেই?...’
প্রশ্ন হলো, একজন আইনপ্রণেতা প্রকাশ্যে ‘মানবতা দেখাবেন না’ বলছেন—এর চেয়ে হতাশাজনক আর কী হতে পারে? বিবেক, যুক্তি ও মানবিকতা বাদ দিয়ে তিনি জনগণের প্রতিনিধিত্ব করবেন কীভাবে? ধর্মীয় আবেগের দোহাই দিয়ে মৃত মানুষের মর্যাদা অস্বীকার করা কোনো সাহসী অবস্থান নয়। এটি গোঁড়ামিপূর্ণ এবং কুসংস্কারাচ্ছন্ন বক্তব্য।
‘পাপের লাশ’ কথাটির মধ্যেই রয়েছে মানুষকে অপবিত্র ও অগ্রহণযোগ্য হিসেবে চিহ্নিত করার মানসিকতা। কোনো অপরাধের দায়ে দণ্ডিত হলেও একজন মানুষের মৃতদেহ অপমান বা অবমাননার বিষয় হয়ে যায় না। তাঁর পরিবারের শোকও তুচ্ছ হয়ে যায় না। তাঁদের স্বজনের মরদেহ দেশে আসবে কি না, সেটি একজন সংসদ সদস্যের ব্যক্তিগত পছন্দের বিষয়ও নয়।
যাই হোক, কামরুজ্জামান রতন টক শোতে অনেক জোরালোভাবে বক্তব্য দিলেও পরবর্তী সময়ে নিজের অবস্থান পরিবর্তন করেন এবং দুঃখ প্রকাশ করে ক্ষমা চান। ফেসবুকে দেওয়া পোস্টে তিনি লেখেন, ‘সম্প্রতি স্টার নিউজের একটি টক শোতে সৌদি আরবে দুই বাংলাদেশি নাগরিকের শিরশ্ছেদের দুঃখজনক ঘটনাটি নিয়ে, সংকীর্ণভাবে ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে আলোচনা করতে গিয়ে আমি আবেগবশত বলেছিলাম, ‘‘আমি এই পাপের লাশ বাংলাদেশে আসুক তা চাই না।’’’
‘আমার এই মন্তব্যটি করা একেবারেই ঠিক হয়নি এবং আমি তা পূর্ণাঙ্গভাবে প্রত্যাহার করছি। আমার এই মন্তব্যের মাধ্যমে নিহত ব্যক্তিদের পরিবার-পরিজন এবং আমাদের প্রবাসী ভাইবোনদের মনে যে কষ্ট ও আঘাত দিয়েছি, তার জন্য আমি আন্তরিকভাবে দুঃখ প্রকাশ করছি এবং সবার কাছে ক্ষমাপ্রার্থী।
‘মানুষ ভুল করতেই পারে, আর ভুল বুঝতে পেরে ক্ষমা চাওয়ার সুযোগ মহান আল্লাহর এক বিশেষ নিয়ামত। আমার ওই মন্তব্যটি জন্য আমি দুঃখিত ও ক্ষমাপ্রার্থী।’
এই ফেসবুক পোস্টের মাধ্যমে সংসদ সদস্য কামরুজ্জামান রতন খুব অল্প সময়ের মধ্যে তাঁর অবস্থান পরিবর্তনের ঘোষণা দিলেন। এটা তিনি স্বেচ্ছায় করলেন, নাকি সরকার বা দলের পরামর্শ কিংবা চাপে করলেন তা স্পষ্ট নয়; কিন্তু এটা বোধগম্য হলো যে তিনি ‘এক কথার মানুষ’ নন এবং পরিস্থিতি অনুযায়ী তিনি তাঁর অবস্থান পাল্টান।
এ বিষয়টি নিয়ে বিরোধী দলগুলোর ভূমিকাও প্রশ্নের ঊর্ধ্বে নয়। এই লেখা তৈরির সময় পর্যন্ত এটা নিয়ে জামায়াতে ইসলামী কিংবা এনসিপির আনুষ্ঠানিক কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি। প্রভাবশালী বিদেশি রাষ্ট্রের সামনে আমাদের রাজনৈতিক নেতৃত্বের আচরণে আত্মমর্যাদার ঘাটতির বিষয়টি এ থেকে স্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হয়। দেশের সাধারণ মানুষের সঙ্গে কথা বলার সময় তাদের মধ্যে যে ‘দাপট’ দেখা যায়, তাঁদের অধিকার নিয়ে বিদেশি সরকারের কাছে প্রশ্ন তোলার সময় তা যেন কোথায় হারিয়ে যায়।
সৌদি আরবের সঙ্গে বাংলাদেশের কূটনৈতিক, অর্থনৈতিক ও শ্রমবাজারের সম্পর্ক গুরুত্বপূর্ণ। সেই সম্পর্ক বজায় রাখতে হবে। কিন্তু সম্পর্ক রক্ষার নামে নাগরিকের জীবন ও মর্যাদার প্রশ্নে নতজানু থাকা গ্রহণযোগ্য নয়। বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কের মধ্যেই ন্যায্য প্রশ্ন করা যায়; নিজের নাগরিকের ন্যায্য বিচার দাবি করা কোনো বৈরিতা নয়; দায়িত্বশীল কূটনীতি।
নাগরিকের জানমাল রক্ষায় সরকারের দায়িত্ব রয়েছে। সরকার সে দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হলে সরকারের সঙ্গে নাগরিকের বিচ্ছিন্নতা তৈরি হয় এবং জনগণের প্রতি তাদের অঙ্গীকার নিয়েও প্রশ্ন ওঠে। সৌদিতে বাংলাদেশের দুই নাগরিকের মৃত্যুদণ্ডের ঘটনা থেকে সরকার ও রাজনৈতিক দলগুলোকে তাই শিখতে হবে—দেশে এবং বিদেশে থাকা প্রতিটি নাগরিকের জীবন নিয়ে তাদের দায়িত্ব আছে, এমনকি মৃত্যুর পরও আছে। সেই দায়িত্ব পালনের জায়গায় গোঁড়ামি, ভুয়া নৈতিকতার দম্ভ কিংবা কূটনৈতিক আত্মসমর্পণের কোনো স্থান নেই।
মনজুরুল ইসলাম মুক্তকণ্ঠের জ্যেষ্ঠ সহসম্পাদক
*মতামত লেখকের নিজস্ব