সৌদি আরবের পবিত্র মক্কায় মসজিদ এলাকায় ‘অনৈতিক’ কর্মকাণ্ডে লিপ্ত থাকার অভিযোগে দুই বাংলাদেশি নাগরিকের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছে। তবে অত্যন্ত আশ্চর্যজনক বিষয় হলো, মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার আগ পর্যন্ত বাংলাদেশ সরকার এই বিষয়ে অবগত ছিল না। গণমাধ্যমে খবর প্রকাশের পর বিষয়টি নজরে আসায় বিস্তারিত তথ্যের জন্য সৌদি আরবের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে বৃহস্পতিবার (১৫ অক্টোবর) চিঠি পাঠিয়েছে জেদ্দায় অবস্থিত বাংলাদেশ কনস্যুলেট।
জেদ্দায় বাংলাদেশ কনস্যুলেট এবং ঢাকায় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সূত্র থেকে এই তথ্যের সত্যতা নিশ্চিত করা হয়েছে। মুক্তকণ্ঠের এক প্রতিবেদনে এই পুরো বিষয়টি উঠে এসেছে।
শুক্রবার (১৬ অক্টোবর) বিকেলে জেদ্দায় বাংলাদেশ কনস্যুলেটের একটি সূত্র থেকে জানা গেছে, মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার আগে সৌদি কর্তৃপক্ষ বাংলাদেশকে আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো ধরনের তথ্য প্রদান করেনি। সংবাদমাধ্যমে খবর আসার পর বিষয়টি তাদের সামনে আসে। এরপরই গতকাল জেদ্দার কনস্যুলেট থেকে সৌদি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে চিঠি পাঠিয়ে ঘটনার বিস্তারিত বিবরণ জানতে অনুরোধ করা হয়েছে।
এর আগে গত বুধবার (১৪ অক্টোবর) সৌদি প্রেস এজেন্সি (এসপিএ) দেশটির স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বরাত দিয়ে দুজনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার বিষয়টি নিশ্চিত করে। মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত ওই দুই বাংলাদেশির নাম নজরুল ইসলাম ও সুইটি আখতার বলে জানানো হয়েছে।
মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক সংবাদমাধ্যম গালফ নিউজের প্রতিবেদন অনুযায়ী, মক্কার একটি মসজিদে অনৈতিক ও অশালীন কাজে লিপ্ত থাকার অভিযোগে সৌদি নিরাপত্তা বাহিনী তাদের আটক করেছিল।
প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়, আটকের পর প্রাথমিক তদন্ত শেষে ওই দুজনের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ গঠন করে গ্রেপ্তার দেখিয়ে আদালতে পাঠানো হয়। শরিয়াহ আইনের অধীনে ‘তাআজির’ অর্থাৎ বিচারকের স্বেচ্ছাধীন শাস্তির বিধানে আদালত তাদের মৃত্যুদণ্ডের আদেশ দেন। মসজিদের পবিত্রতা ক্ষুণ্ন করা এবং অপরাধটি যে পরিস্থিতিতে সংঘটিত হয়েছে, তা বিবেচনা করে বিচারক এই কঠোর শাস্তি প্রদান করেন। পরবর্তীতে উচ্চতর বিচারিক কর্তৃপক্ষ রায় বহাল রাখলে তা চূড়ান্ত হয় এবং রাজকীয় আদেশে দণ্ড কার্যকর করার নির্দেশ জারি করা হয়।
এই ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে সৌদি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে পবিত্র মসজিদের নিরাপত্তা রক্ষা, ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা এবং ধর্মীয় পবিত্রতা লঙ্ঘনকারীদের বিরুদ্ধে শরিয়াহ আইন কার্যকর করার বিষয়ে সরকারের দৃঢ় অবস্থানের কথা পুনর্ব্যক্ত করেছে। একই সঙ্গে পবিত্র স্থানে এ ধরনের অপরাধের পুনরাবৃত্তি হলে কঠোর শাস্তির মুখোমুখি হতে হবে বলে সতর্ক করা হয়েছে।
সৌদি আরব থেকে প্রাপ্ত বেসরকারি সূত্রে জানা গেছে, গত কয়েক মাস ধরে জেদ্দার আদালতে এই বিচারপ্রক্রিয়া চলছিল। আর এই বিচার চলাকালীন বাংলাদেশের দুজন বিশিষ্ট নাগরিক দোভাষী হিসেবে সহযোগিতা প্রদান করেছেন।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কনস্যুলার সম্পর্ক-বিষয়ক ভিয়েনা সনদে বাংলাদেশ ও সৌদি আরব উভয় দেশই স্বাক্ষরকারী। এই সনদের ৩৬ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, কোনো দেশের নাগরিক বিদেশে গ্রেপ্তার হলে বন্দির অনুরোধে আটককারী দেশকে অবিলম্বে সংশ্লিষ্ট দেশের কনস্যুলেটকে জানাতে হয় এবং কনস্যুলার সহায়তার সুযোগ দিতে হয়। তবে এই ক্ষেত্রে দণ্ডিত ব্যক্তিরা কনস্যুলেটকে জানানোর অনুরোধ করেছিলেন কি না, তা এখনও স্পষ্ট নয়।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একাধিক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, সৌদি কর্তৃপক্ষ দুই বাংলাদেশিকে আটক করার পর অত্যন্ত দ্রুত মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করেছে, যা সাধারণত হওয়ার কথা নয়। এছাড়া আটক দুজনের পক্ষে কেউ কেন মিশনে যোগাযোগ করল না, সেটিও রহস্যজনক বলে মনে করছেন তারা।
পাশাপাশি দণ্ডপ্রাপ্ত দুজনের সৌদি আরবে অবস্থানের ধরন ও মেয়াদ এবং বিচারে কোনো আইনি সহায়তা বা আপিলের সুযোগ নেওয়া হয়েছিল কি না, সে বিষয়েও এখন পর্যন্ত কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি বলে প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে।