চট্টগ্রামের বাঁশখালীতে জন্ম এবং বর্তমানে ঢাকার আশুলিয়ায় বসবাস করেন আব্দুল আলীম নিজামী। নিজের কথা অনুযায়ী, তিনি জীবনে কখনও ঠাকুরগাঁওয়ে পা রাখেননি। এই জেলায় তার কোনো আত্মীয়-স্বজন কিংবা পরিচিত কেউ নেই। তা সত্ত্বেও ঠাকুরগাঁও-১ আসনের উপনির্বাচনে সংসদ সদস্য পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলনের কেন্দ্রীয় মজলিসে শূরার সদস্য এই ব্যক্তি। তার জন্য বরাদ্দ নির্বাচনি প্রতীক হলো বটগাছ।
ঠাকুরগাঁও জেলায় উক্ত দলটির সাংগঠনিক ভিত্তি অত্যন্ত দুর্বল এবং সক্রিয় নেতাকর্মীর সংখ্যাও খুবই সীমিত। আর্থিক সামর্থ্যের সীমাবদ্ধতার কারণে মাত্র চারটি ব্যাটারিচালিত রিকশায় মাইক বসিয়ে প্রচারণা চালাচ্ছেন নিজামী। পাশাপাশি ভোটারদের হাতে লিফলেট বিলির মাধ্যমে তিনি তার ঘোষিত আট দফা কর্মসূচির পক্ষে জনসমর্থন আদায়ের চেষ্টা করছেন।
গত সোমবার (১৯ অক্টোবর) মুক্তকণ্ঠের সাথে আলাপকালে নিজামী জানান, কেন নিজের জন্মস্থান চট্টগ্রাম বা বর্তমান আবাস ঢাকা ছেড়ে ঠাকুরগাঁওয়ে নির্বাচন করতে আগ্রহী হলেন। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “বাংলাদেশের যেখানেই উপনির্বাচন হবে, সেখানেই অংশ নেওয়ার নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছেন আমি।” সেই নীতিগত সিদ্ধান্তেরই ধারাবাহিকতায় ঠাকুরগাঁও-১ আসন শূন্য হওয়ার পর তিনি এখানে প্রার্থী হওয়ার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন।
নিজামীর নির্বাচনি কর্মসূচির অন্যতম প্রধান লক্ষ্য হলো ধর্মীয় অবমাননা ও কটূক্তি বন্ধে একটি শক্তিশালী আইন প্রণয়ন করা। তার মতে, সংসদের বাইরে থেকে এই বিষয়ে দীর্ঘ প্রচেষ্টার পরও কার্যকর কোনো উদ্যোগ নেওয়া কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাই তিনি সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়ে এই কর্মসূচি বাস্তবায়নে সরাসরি ভূমিকা রাখতে চান।
অন্যান্য প্রার্থীদের তুলনায় নিজামীর প্রচার কার্যক্রম বেশ সীমিত। বিশেষ করে প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলে তার প্রচারণা তেমন একটা চোখে পড়ছে না। এই বিষয়ে নিজামী বলেন, “আর্থিক সামর্থ্য সীমিত হওয়ায় বড় পরিসরে প্রচার চালানো সম্ভব হচ্ছে না। চারটি ব্যাটারিচালিত রিকশায় মাইক লাগিয়ে প্রচার করছি।” তিনি স্বীকার করেন যে, বিশাল নির্বাচনি এলাকার প্রতিটি ভোটারের কাছে এভাবে পৌঁছানো কঠিন, তাই লিফলেট বিতরণের মাধ্যমে তিনি তার বক্তব্য পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা করছেন।
ঠাকুরগাঁওয়ে দলের সাংগঠনিক অবস্থা সম্পর্কে আলোচনা করতে গিয়ে নিজামী বলেন, “বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলনের সক্রিয় নেতাকর্মী এখানে প্রায় নেই বললেই চলে।” তবে তিনি জানান, ১৯৮৭ সাল থেকে দলটির প্রতিষ্ঠাতা হাফেজ্জী হুজুরের অনুসারী একজন প্রবীণ ব্যক্তিকে তিনি পাশে পেয়েছেন। প্রচারণার মাধ্যমে স্থানীয়দের সাথে পরিচিত হচ্ছেন তিনি এবং দাবি করেন যে, কিছু মানুষ স্বেচ্ছায় তার পক্ষে কাজ করছেন।
ঠাকুরগাঁওয়ের স্থানীয় উন্নয়নের কোনো সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা আছে কি না, সে বিষয়ে জানতে চাইলে নিজামী জানান, তার কর্মসূচি কেবল এই একটি আসনের জন্য নয়, বরং পুরো দেশের মানুষের জন্য। তার মতে, একজন সংসদ সদস্যের মূল দায়িত্ব হলো জাতীয় পর্যায়ে আইন প্রণয়ন করা এবং জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়ে ভূমিকা রাখা। স্থানীয় সরকারের দায়িত্ব হলো উন্নয়ন কার্যক্রম পরিচালনা করা, আর সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার উদ্দেশ্য কেবল উন্নয়ন বরাদ্দ পাওয়া হওয়া উচিত নয় বলে তিনি মনে করেন। তবে নির্বাচিত হলে তিনি ঠাকুরগাঁওয়ে বাড়ি তৈরি করে সেখানে নিয়মিত অবস্থান করার পরিকল্পনা করেছেন।
ভোটারদের সামনে তিনি তার আট দফা কর্মসূচি তুলে ধরছেন, যেখানে ধর্মীয় অবমাননা ও কটূক্তি রোধে কঠোর আইন এবং সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার বিষয়টিকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তার কথা বলতে গিয়ে নিজামী ২০০৩ সালে চট্টগ্রামের বাঁশখালীর সাধনপুরে হিন্দু শীল পরিবারের ১১ সদস্যকে পুড়িয়ে হত্যার ঘটনার কথা উল্লেখ করেন। তার দাবি, মামলার বিচারপ্রক্রিয়া দীর্ঘায়িত হওয়ার কারণে চূড়ান্ত রায়ের আগেই অনেক আসামির মৃত্যু হয়েছে।
তিনি চান, এ ধরনের ঘটনায় মামলা দায়ের থেকে শুরু করে তদন্ত, বিচার, আপিল এবং রায় কার্যকরের পুরো প্রক্রিয়াটি সর্বোচ্চ এক বছরের মধ্যে সম্পন্ন করার ব্যবস্থা করতে। নিজামীর বিশ্বাস, দ্রুত বিচার নিশ্চিত করে অপরাধীদের শাস্তির আওতায় আনা গেলে এ ধরনের সহিংসতা কমিয়ে আনা সম্ভব। নির্বাচনে জয়ী হয়ে জাতীয় পর্যায়ে অবদান রাখার প্রত্যাশা করছেন আলীম নিজামী এবং আশা করছেন ঠাকুরগাঁওয়ের ভোটাররা তাকেই সংসদে পাঠাবেন।
মুসলিম ভোটারদের প্রতি ঈমানের তাগিদে তাকে ভোট দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন নিজামী। পাশাপাশি সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মানুষের আইনি সুরক্ষা, নিরাপত্তা ও নাগরিক অধিকার নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি দিয়ে তাদেরও বটগাছ প্রতীকে ভোট দেওয়ার অনুরোধ জানিয়েছেন তিনি।
উল্লেখ্য, আগামী ২৯ অক্টোবর ঠাকুরগাঁও-১ আসনের উপনির্বাচনে ভোট গ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে। প্রতীক বরাদ্দ পাওয়া পাঁচ প্রার্থী হলেন— বিএনপির মির্জা ফয়সল আমিন (ধানের শীষ), জামায়াতে ইসলামীর মো. দেলাওয়ার হোসেন (দাঁড়িপাল্লা), বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলনের আব্দুল আলীম নিজামী (বটগাছ), ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের হাফেজ ডা. মো. খাদেমুল ইসলাম (হাতপাখা) এবং বাংলাদেশ কংগ্রেসের হুসাইন মুহাম্মদ ওমর ফারুক (ডাব)।