প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সফর ঘিরে রাজশাহী বইছে উৎসবের আমেজ। তাকে বরণ করে নিতে সব ধরনের প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। নগরীর সৌন্দর্যবর্ধন, সড়ক সংস্কার ও মঞ্চ নির্মাণসহ চলছে শেষ মুহূর্তের ব্যাপক আয়োজন। প্রশাসনের পক্ষ থেকেও নিরাপত্তা, পরিচ্ছন্নতা ও সার্বিক প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। রাজশাহীবাসীর প্রত্যাশা, সফরটি যেন কেবল রাজনৈতিক জনসভায় সীমাবদ্ধ না থেকে উত্তরাঞ্চলের উন্নয়ন, কর্মসংস্থান, কৃষি ও নাগরিক সমস্যার সমাধানে নতুন দিকনির্দেশনা নিয়ে আসে।

প্রধানমন্ত্রীর সফরসূচি অনুযায়ী, মঙ্গলবার (২০ অক্টোবর) বেলা দেড়টায় রাজশাহী ধর্মসভা মন্দিরের দুর্গাপূজা মণ্ডপ পরিদর্শনের কথা রয়েছে তারেক রহমানের। সেখানে ধর্মসভা কমপ্লেক্স নির্মাণের জন্য আর্থিক অনুদান প্রদানের পাশাপাশি সনাতন ধর্মের নেতৃবৃন্দ ও স্থানীয় হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের সাথে শুভেচ্ছা বিনিময় করবেন তিনি। এরপর সার্কিট হাউসে কিছু সময় অবস্থান শেষে বিকেল ৩টায় ঐতিহাসিক মাদরাসা মাঠের মহাসমাবেশে প্রধান অতিথির ভাষণ দেবেন প্রধানমন্ত্রী।

সফরে তারেক রহমানের পক্ষ থেকে প্রায় ১৩ হাজার ক্ষতিগ্রস্ত আখচাষিকে প্রণোদনা দেওয়ার কথা রয়েছে। সরকারের এ উদ্যোগকে ঘিরে আখচাষি ও চিনিকলসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মধ্যে নতুন আশার সঞ্চার হয়েছে। তাদের প্রত্যাশা, আর্থিক সহায়তা পেলে আখচাষে কৃষকদের আগ্রহ বাড়বে, উৎপাদন বৃদ্ধি পাবে এবং সংকটে থাকা চিনিশিল্প পুনরুজ্জীবনের পথ তৈরি হবে।

এছাড়া রাজশাহীকে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কৃষি, ব্যবসা-বাণিজ্য ও পর্যটনের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে আরও এগিয়ে নেওয়ার প্রত্যাশা দীর্ঘদিনের। সেই প্রত্যাশা থেকেই প্রধানমন্ত্রীর এই সফরকে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখছেন নগরবাসী। বিশেষ করে নগরীর যানজট, সড়ক অবকাঠামো, জলাবদ্ধতা, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, কর্মসংস্থানের সংকট এবং তরুণদের জন্য নতুন সুযোগ সৃষ্টির বিষয়গুলো আলোচনায় আসুক এমন প্রত্যাশা তাদের।

রাজশাহী সিটি করপোরেশনের প্রশাসক ও মহানগর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মাহফুজুর রহমান রিটন জানিয়েছেন, নগরীর উন্নয়নে কয়েকটি পরিকল্পনা প্রধানমন্ত্রীর সামনে তুলে ধরার উদ্যোগ রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে বিমান চত্বর থেকে কাশিয়াডাঙ্গা পর্যন্ত চার লেনের সড়ক নির্মাণ, কুমারপাড়া থেকে বড়কুঠি ও বরেন্দ্র জাদুঘর হয়ে ফায়ার ব্রিগেড মোড় পর্যন্ত সড়ক উন্নয়ন ও প্রশস্তকরণ, ৩০টি ওয়ার্ডে খেলার মাঠের উন্নয়ন এবং জ্যেষ্ঠ নাগরিকদের জন্য পার্ক স্থাপনের পরিকল্পনা। এসব প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে নগরীর যোগাযোগব্যবস্থা, নাগরিক সুবিধা ও জীবনযাত্রার মান উন্নয়নে ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।

তবে নগর উন্নয়নের পাশাপাশি রাজশাহী অঞ্চলের গ্রামীণ অর্থনীতি ও কৃষি খাতও গুরুত্বপূর্ণ। আম, ধান, সবজি, পান ও অন্যান্য কৃষিপণ্যের উৎপাদন এবং বিপণনের সঙ্গে এ অঞ্চলের বিপুলসংখ্যক মানুষের জীবিকা জড়িত। কৃষিপণ্যের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা, সংরক্ষণাগার ও প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্প গড়ে তোলা, সহজ পরিবহনব্যবস্থা এবং বাজার সম্প্রসারণে কার্যকর উদ্যোগের প্রত্যাশা করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। জনসভায় কৃষি ও কৃষকের স্বার্থে কোনো সুনির্দিষ্ট ঘোষণা আসে কি না, সেদিকেও নজর থাকবে তাদের।

রাজশাহীতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও শিক্ষিত তরুণের সংখ্যা উল্লেখযোগ্য হলেও মানসম্মত কর্মসংস্থান সৃষ্টি একটি গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ। অনেক তরুণকে চাকরির জন্য ঢাকা কিংবা দেশের অন্যান্য অঞ্চলে যেতে হয়। ফলে স্থানীয়ভাবে শিল্পকারখানা স্থাপন, প্রযুক্তিনির্ভর কর্মসংস্থান সৃষ্টি, ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের সহায়তা এবং কারিগরি প্রশিক্ষণের সুযোগ বাড়ানোর দাবি দীর্ঘদিনের। বিশেষ করে বন্ধ বা স্থবির শিল্পপ্রতিষ্ঠানের সম্ভাবনা যাচাই, কৃষিভিত্তিক শিল্প স্থাপন, তথ্যপ্রযুক্তি খাতের সম্প্রসারণ এবং উদ্যোক্তাদের জন্য সহজ শর্তে অর্থায়নের মতো বিষয় গুরুত্ব পেতে পারে।

এদিকে তারেক রহমানের আগমন বিএনপির নেতাকর্মীদের কাছেও রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ। দীর্ঘদিনের সাংগঠনিক কার্যক্রম, তৃণমূলের সঙ্গে কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের যোগাযোগ এবং ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক কর্মপরিকল্পনা নিয়ে নতুন উদ্দীপনা তৈরির সুযোগ হিসেবে দেখা হচ্ছে এই সফরকে। জনসভায় মহানগর ও জেলা পর্যায়ের নেতাকর্মীদের অংশগ্রহণ, সাংগঠনিক সমন্বয় এবং শৃঙ্খলা বজায় রাখার বিষয়েও দলীয় নেতৃত্বের মনোযোগ থাকবে।

দলীয় নেতাকর্মীদের প্রত্যাশা, প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যে তৃণমূলের ভূমিকা, জনগণের সঙ্গে সম্পৃক্ততা, দলীয় ঐক্য ও দায়িত্বশীল রাজনৈতিক চর্চার বিষয়ে দিকনির্দেশনা আসবে। একই সঙ্গে সরকারের উন্নয়ন পরিকল্পনা বাস্তবায়নে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও দলীয় সংগঠনের ভূমিকা কী হবে, তা নিয়েও আগ্রহ রয়েছে তাদের। এই সফরকে কেন্দ্র করে নেতাকর্মীদের মধ্যে যে উৎসাহ তৈরি হয়েছে, তা জনসভা-পরবর্তী সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডেও কতটা প্রতিফলিত হয়, সেটিই হবে বড় বিষয়।

শুধু তা-ই নয়, রাজশাহী ঐতিহ্যগতভাবে শিক্ষা, সংস্কৃতি ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির জন্য পরিচিত। প্রধানমন্ত্রীর সফরে দুর্গাপূজার মণ্ডপ পরিদর্শনের কর্মসূচি থাকায় ধর্মীয় সম্প্রীতি, সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের নিরাপত্তা এবং সব নাগরিকের সমান অধিকার নিশ্চিত করার বার্তাও গুরুত্ব পেতে পারে। নগরবাসীর প্রত্যাশা, রাজনৈতিক পরিচয় বা ধর্মীয় বিশ্বাসের ঊর্ধ্বে উঠে রাজশাহীর সব মানুষের নিরাপত্তা, মর্যাদা ও নাগরিক অধিকার নিশ্চিত করার বিষয়ে ইতিবাচক বার্তা আসবে।

সব মিলিয়ে তারেক রহমানের রাজশাহী সফর ঘিরে প্রত্যাশার কেন্দ্রে রয়েছে উন্নয়ন, কর্মসংস্থান, কৃষকের স্বার্থ, নাগরিক সুবিধা ও রাজনৈতিক সংগঠনের গতিশীলতা।

রাজশাহী মহানগর যুবদলের আহ্বায়ক শরিফুল ইসলাম জনি বলেন, তারেক রহমানের আগমন তরুণ নেতাকর্মীদের মধ্যে নতুন উদ্দীপনা তৈরি করেছে। আমরা চাই, তরুণদের জন্য কর্মসংস্থান, দক্ষতা উন্নয়ন ও উদ্যোক্তা হওয়ার সুযোগ বাড়ুক। রাজশাহীর শিক্ষিত তরুণেরা যেন নিজ এলাকাতেই কাজের সুযোগ পান, সেটি আমাদের বড় প্রত্যাশা।

রাজশাহী জেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের সাধারণ সম্পাদক শাহরিয়ার আমিন বিপুল বলেন, এই সফরকে ঘিরে নেতাকর্মীদের মধ্যে ব্যাপক উৎসাহ তৈরি হয়েছে। আমরা চাই, জনসভা শান্তিপূর্ণ ও সুশৃঙ্খলভাবে সম্পন্ন হোক। জনগণের সঙ্গে সম্পৃক্ততা বাড়িয়ে রাজশাহীর মানুষের সমস্যা সমাধানে সবাইকে দায়িত্বশীল ভূমিকা রাখতে হবে।

রাজশাহী মহানগর ছাত্রদলের আহ্বায়ক রাকিন রায়হান রবিন বলেন, রাজশাহী শিক্ষানগরী হিসেবে পরিচিত। এখানকার শিক্ষার্থীদের জন্য মানসম্মত শিক্ষা, গবেষণা, প্রযুক্তিনির্ভর দক্ষতা অর্জন ও কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়ানো জরুরি। প্রধানমন্ত্রীর সফরে শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ নিয়ে ইতিবাচক দিকনির্দেশনা পাব—এমন প্রত্যাশা করছি।

সার্বিক প্রস্তুতি নিয়ে রাজশাহী জেলা বিএনপির আহ্বায়ক ও সাংসদ আবু সাঈদ চাঁদ বলেন, তারেক রহমানের সফর ঘিরে পুরো রাজশাহীজুড়ে উৎসবের আমেজ বইছে। ইতোমধ্যে জনসভাস্থলের সব কাজ প্রায় সম্পন্ন করা হয়েছে।

তিনি আরও বলেন, প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তারেক রহমানের রাজশাহীতে এটি প্রথম সফর। তাই রাজশাহীবাসীর প্রত্যাশাও অনেক বেশি। রাজশাহীবাসীর প্রত্যেকটি প্রত্যাশা তারেক রহমানের কাছে গুরুত্বপূর্ণ। নিশ্চয়ই রাজশাহীর উন্নয়ন ও কর্মসংস্থান নিয়ে নতুন কোনো বার্তা দেবেন প্রধানমন্ত্রী।