মুসলিম রেনেসাঁর অগ্রদূত হিসেবে পরিচিত প্রথিতযশা কবি ফররুখ আহমদের ৫২তম মৃত্যুবার্ষিকী আজ ১৯ অক্টোবর। ১৯৭৪ সালের এই দিনে রাজধানী ঢাকার ইস্কাটন গার্ডেনে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি।
আধুনিক বাংলা কবিতার ইতিহাসে ফররুখ আহমদ অন্যতম প্রধান ব্যক্তিত্ব। বিংশ শতাব্দীতে ইসলামী ভাবধারার শক্তিশালী বাহক হয়ে উঠলেও তার কবিতার শব্দচয়ন এবং প্রকরণকৌশল ছিল অনন্য ও উজ্জ্বল। আধুনিকতার নানা নন্দনতত্ত্ব তার কাব্যকর্মে পরিব্যাপ্ত ছিল। রোমান্টিকতা থেকে আধুনিকতার দিকে উত্তরণের যে ধারাবাহিক প্রক্রিয়া, তাতে ফররুখ আহমদের সৃষ্টিশীলতা অত্যন্ত মৌলিক বলে অনেক সমালোচকেরই অভিমত।
তার কবিতার মূল সুর ছিল বাংলার অধঃপতিত মুসলিম সমাজের পুনর্জাগরণ এবং সেই জাগরণের অনুপ্রেরণা ফুটিয়ে তোলা।
কবি ফররুখ ছিলেন অত্যন্ত স্বাধীনচেতা, আত্মমর্যাদাবান এবং উচ্চমানের একজন আধুনিক কবি। পশ্চিমা আধুনিক কবিদের রচনার আঙ্গিক ও বিশুদ্ধতার প্রভাব তার কবিতায় স্পষ্টভাবে দৃশ্যমান ছিল। তিনি ছিলেন শোষণের বিরুদ্ধে এক বলিষ্ঠ কণ্ঠস্বর। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন, ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ এবং আইয়ুব শাহীর শাসন against গণআন্দোলনসহ প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ সময়ে তিনি সোচ্চার ভূমিকা পালন করেছেন। কবির কলম সবসময়ই অত্যাচার ও নিপীড়নের বিরুদ্ধে লড়াই করেছে। জাতি, ধর্ম ও বর্ণ নির্বিশেষে তিনি মানবতা এবং সাম্যের জয়গান গেয়েছেন তার লেখনীতে।
১৯১৮ সালের ১০ জুন মাগুরার মাঝআইল গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন কবি ফররুখ আহমদ। তার পিতার নাম সৈয়দ হাতেম আলী এবং মাতার নাম বেগম রওশন আখতার।
শিক্ষাজীবনের কথা বলতে গেলে, তিনি ১৯৩৭ সালে খুলনা জিলা স্কুল থেকে ম্যাট্রিক এবং ১৯৩৯ সালে কলকাতার রিপন কলেজ থেকে আইএ পাস করেন। পরবর্তীতে স্কটিশ চার্চ কলেজে দর্শন ও ইংরেজি সাহিত্যে ভর্তি হলেও পরীক্ষা না দিয়েই তিনি কর্মজীবনে প্রবেশ করেন।
১৯৪৫ সালে মাসিক ‘মোহাম্মাদী’র ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করলেও তার স্থায়ী কর্মস্থল ছিল ঢাকা বেতার। ব্যক্তিগত জীবনে ১৯৪২ সালের নভেম্বরে খালাতো বোন সৈয়দা তৈয়বা খাতুন লিলিকে বিয়ে করেন কবি।
সাহিত্যের বিভিন্ন শাখায় তার বিচরণ থাকলেও কবি হিসেবেই তিনি সবচেয়ে বেশি পরিচিতি লাভ করেন। তার উল্লেখযোগ্য কাব্যগ্রন্থগুলোর মধ্যে রয়েছে ‘সাত সাগরের মাঝি’ (১৯৪৪), ‘সিরাজাম মুনিরা’ (১৯৫২), ‘নৌফেল ও হাতেম’ (১৯৬১) এবং ‘হাতেমতায়ী’ (১৯৬৬)। এছাড়া শিশুতোষ রচনার মধ্যে ‘পাখির বাসা’ (১৯৬৫), ‘হরফের ছড়া’ (১৯৭০) ও ‘ছড়ার আসর’ (১৯৭০) উল্লেখযোগ্য।
সাহিত্যে ও সংস্কৃতিতে তার অনন্য অবদানের জন্য তিনি ১৯৬০ সালে বাংলা একাডেমি পুরস্কার, ১৯৬১ সালে প্রেসিডেন্ট পুরস্কার প্রাইড অব পারফরম্যান্স, ১৯৬৬ সালে আদমজী পুরস্কার এবং ইউনেসকো পুরস্কার লাভ করেন। এছাড়া মরণোত্তর সম্মাননা হিসেবে তিনি ১৯৭৭ সালে একুশে পদক এবং ১৯৮০ সালে স্বাধীনতা পুরস্কারে ভূষিত হন।