২০০৫ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি মুক্তকণ্ঠের সাহিত্য সাময়িকীতে কবি আল মাহমুদের এই বিশেষ সাক্ষাৎকারটি প্রথম প্রকাশিত হয়েছিল। দীর্ঘকাল কেবল ছাপা কাগজের পাতায় সীমাবদ্ধ থাকা এই আলাপচারিতাটি এখন অনলাইন পাঠকদের জন্য পুনরায় উপস্থাপন করা হলো। সাক্ষাৎকারটি গ্রহণ করেছিলেন কামরুজ্জামান কামু।

কথোপকথনের শুরুতে বিরামপুরের যাত্রীর কবিতাগুলোর কথা উল্লেখ করে বলা হয় যে, আল মাহমুদের কবিতায় নতুন এক বাঁক লক্ষ্য করা যাচ্ছে। মাঝখানের সময়ে প্রকাশিত ‘বখতিয়ারের ঘোড়া’ জাতীয় কবিতার চেয়ে বরং ‘সোনালী কাবিন’–এর সঙ্গে এই নতুন কবিতার মিল বেশি।

এর জবাবে আল মাহমুদ বলেন, “আমি একটা বই দুবার লিখিনি। বখতিয়ারের ঘোড়াকে যে যেভাবেই দেখাক, এটা নতুন কবিতার বই একদম। কতগুলো উপমা, উৎপ্রেক্ষা, প্রতিতুলনা ওতে তুলে ধরা হয়েছে, যেগুলো মুসলমান সমাজের কাছে খুবই চেনা। এর মধ্যে কোনো বিদ্বেষ নেই, দার্শনিকতা আছে।”

বখতিয়ারের ঘোড়ার উপমা, উৎপ্রেক্ষা বা ভাবমণ্ডল যে আমাদের ঐতিহ্যের অংশ, তা জানতে চাওয়া হলে তিনি ব্যাখ্যা করেন, “আমাদের ভাষায় অনেকগুলো তুর্কি শব্দ আছে। যেমন বাবা, কাকা—এগুলো তুর্কি শব্দ। আমাদের ভাষার ওপর প্রভাব বিস্তার করেছে তুর্কি ভাষা। বখতিয়ার খিলজির আগমনের পরই এটা সম্ভবত হয়েছে। তো এ দেশের এই কোটি কোটি মুসলমান, তারা তাদের ঐতিহ্যগত যে বীরত্বের কাহিনি, তা জানবে না? আর বখতিয়ার খিলজি যে এ দেশ আক্রমণ করেছিলেন, তাঁকে ডেকে এনেছিল রাজা লক্ষ্মণ সেনের সৈন্যবাহিনী।”

ঔপনিবেশিক মানসিকতা ও আধুনিকতা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “একটা সময়ে আমরা সবাই ইউরোপীয় হয়ে উঠতে চেয়েছি। আমরা ইংরেজ উপনিবেশে ছিলাম। চলনে-বলনে, বাঁচার প্রক্রিয়ায় ইউরোপীয়, মানে ইংরেজ হতে চেয়েছি। ঔপনিবেশিক দাসত্বটাকে আমরা গৌরবের মনে করেছি ; আর এটার নাম হলো আধুনিকতা। এখন যে কবিতা লেখা হচ্ছে, তা যথেষ্ট আধুনিক নয়। কারণ, তারা সেই ঔপনিবেশিক আধুনিকতাকে এখন পর্যন্ত আধুনিকতা মনে করছে। আমি সেটা করছি না।”

এর কারণ জানতে চাওয়া হলে তিনি বলেন, “এসব অঞ্চলে একটা কৌম সমাজ ছিল, অনেকটা প্রাইমারি সোশ্যালিজমের মতো। এই সমাজকে ভেঙে ক্ষত্রিয়, ব্রাহ্মণ ও শূদ্র—নানা ভাগে ভাগ করেছিলেন লক্ষ্মণ সেন! বাঙালি সমাজের শিকড়টাই তিনি মুচড়ে দিয়েছিলেন ; কিন্তু তাঁর সেনাসদস্যরা ছিলেন কৈবর্ত সম্প্রদায়ের, দুর্ধর্ষ সেনাবাহিনী। এরা ছিল নিপীড়িত-নির্যাতিত। এরাই বখতিয়ার খিলজিকে ডেকে এনেছিল। এই প্রতীকটা যদি আমি ব্যবহার করি।”

সাক্ষাৎকারকার যখন প্রশ্ন করেন যে তিনি কি সাম্প্রদায়িক কিছু বোঝাতে চেয়েছেন, তখন আল মাহমুদ বলেন, “এই বইয়ের খুব সমালোচনা করেছেন আমার বন্ধু শহীদ কাদরী। আমি এসবের জবাব দিতে চাই না। আমি মনে করি, ‘বখতিয়ারের ঘোড়া’ আমাদের কবিতায় একটা অত্যন্ত উল্লেখযোগ্য বই। এর ইমেজারি চিত্রকল্প খুব সহজভাবে আমাদের আকৃষ্ট করে। বইটা বেরোবার সময়ই এটা আমি বুঝতে পেরেছিলাম।”

সমকালীন কবিদের কবিতায় নেতিবোধ, অন্ধকার ও নাগরিক যন্ত্রণার কথা উঠে এলে আল মাহমুদ জানান, “আমার কবিতায়ও দুঃখ, বেদনা, হতাশা আছে ; কিন্তু আমার আত্মবিশ্বাস প্রবল। আমি নেগেটিভ কবি নই, নঞর্থক বিষয় আমি উপস্থাপন করিনি। আমার যা ভালো লেগেছে, আমি সে বিষয় নিয়ে কবিতা লিখেছি ; আর যে বিষয়ে আমার জ্ঞান নেই, আমি কম জানি, সে বিষয়ে আমি কোনো কবিতা লিখিনি।”

কবিতার মূল উপাদানের বিষয়ে তিনি বলেন, “চিত্রকল্পই যে কবিতা, এটা আমি এই বইয়ে খুব বেশি করে দেখাতে চেষ্টা করেছি। আগে তো আমরা বলতাম, শব্দই কবিতা, এটা আমরা ফরাসিদের কাছে শিখেছিলাম। মালার্মে বলতেন এসব কথা। কিন্তু আমার নিজের অভিজ্ঞতায় বুঝেছি, চিত্রকল্পই কবিতা। ইউরোপ ভ্রমণ করে, বিভিন্ন দেশের কবিদের সঙ্গে মিশে, দিল্লিতে গিয়ে তামিল, মালয়ালামসহ বিভিন্ন ভাষার কবিদের সঙ্গে যে ভাববিনিময় করে দেখলাম, তাঁরাও ভাবছেন, কবিতা আসলে চিত্রকল্প।”

বাংলার প্রকৃতি ও নারীর প্রভাব নিয়ে কথা বলে তিনি জানান, “আমি তো প্রকৃতপক্ষে গ্রামের লোক। সে প্রভাব আমার মধ্যে সব সময় কাজ করেছে। যেটাকে বলে আরবানিটি, নগরযন্ত্রণা, এটা নিউইয়র্ক, লন্ডন, প্যারিস—পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ শহরগুলোতে হয়তো আছে। আমি ঢাকায় এটা দেখিনি। কলকাতা, দিল্লি, বেঙ্গালুরু—আমি কোথাও আরবানিটি বা নাগরিকতা প্রত্যক্ষ করিনি। আমেরিকান বা ইউরোপীয় কবিরা যে নাগরিক যন্ত্রণার কথা বর্ণনা করেন, তা আমার মধ্যে নেই। আমরা এখনো পাশের ফ্ল্যাটে কে অসুস্থ হলো খবর নিচ্ছি। ইউরোপে পাশের ফ্ল্যাটে একজন লোক মরে পড়ে আছে। পচে দুর্গন্ধ না বেরোনো পর্যন্ত পাশের ফ্ল্যাটের লোকজন জানতে পারেন না। এই পেইন অ্যাগোনি আমার নেই।”

সামাজিক কাঠামোর কথা বলে তিনি আরও বলেন, “আমাদের জীবনে এখনো অবসর আছে। লন্ডন ও প্যারিসের মতো শহরে ভোর হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সবাই যার যার কাজে ছুটছে ; কিন্তু আমাদের এখানে তো তা না। একটি পরিবারের একজন সকালে চাকরি করতে বেরিয়ে যাচ্ছে, আরেকজন হয়তো বেকার, ঘরে বসে টিভি দেখছে। মানে অবসর এখনো নষ্ট হয়নি। কারণ, এখনো আমাদের যৌথ পরিবার আছে। পরিবার ছোট হয়ে এসেছে ; কিন্তু এখনো একজন আরেকজনকে সাহায্য করে। যেটা নেই, সেটা আমি কোত্থেকে আনব। আর যেটুকু আছে তা আমার কবিতাতেও আছে।”

ত্রিশের দশকের কবিদের বিষয়ে তাঁর পর্যবেক্ষণ ছিল স্পষ্ট। তিনি বলেন, “ত্রিশের কবিরা সবাই ছিলেন বাংলা ভাষার ইংরেজ লেখক বা ফরাসি লেখক। তাঁরা বাংলা ভাষায় লিখেছেন ; কিন্তু জীবনাচরণে ছিলেন প্রকৃতপক্ষে ইউরোপিয়ান। তারা প্রায় সবাই ইংরেজি ভাষার অধ্যাপক ছিলেন এবং তাঁরা ইউরোপীয় হয়ে উঠতে চেয়েছিলেন। তাঁরা শুধু কবিতা, ইউরোপীয় বা ফরাসি কবিতাই অনুবাদ করেছেন। একটা বিশাল উপন্যাস অনুবাদ করে বিশাল একটা দরজা খুলে দেওয়া ; সেটা কিন্তু তাঁরা করেননি। বলা হয়, জীবনানন্দে বেশি দেশজ বিষয় এসেছে। আমি মনে করি, তা–ও ইংরেজি কবিতা পড়ারই ফল। তার অসাধারণ কবিতা ‘বনলতা সেন’—এটিতেও বিদেশি প্রভাব আছে। ‘বনলতা সেন’-এর ‘চুল তার কবেকার অন্ধকার বিদিশার নিশা’, ‘হাল ভেঙে যে নাবিক হারায়েছে দিশা’—এ রকম লাইন অ্যাডগার অ্যালেন পোর ‘হেলেন’, কবিতায়ও আছে। ত্রিশের কবিদের মধ্যে ইউরোপিয়ানই বেশি ছিল। দেশ তাঁদের ছিল না। দেশ না থাকার ফলে তাঁরা শুধু ভাষাটাকে ব্যবহার করেছেন বাংলা ভাষাটাকে।”

তাঁরা কি বাংলা ভাষায় ইউরোপীয় অনুভূতি প্রকাশ করতে চেয়েছিলেন? এই প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, “হ্যাঁ, তুমি যদি প্রমাণ চাও, তাহলে আমি বলতে পারি যে বুদ্ধদেব বসু যখন ৬০ পেরিয়ে গেলেন, তখন তিনি উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন যে কবির একটা দেশ লাগে। তখন তিনি ফিরলেন অবশ্য দেশে। কোন দেশে ফিরলেন? ‘মহাভারত’। ষাটের পর তাঁর সব কাজ হলো ‘মহাভারত’ নিয়ে। বিষ্ণু দে এক জায়গায় লিখেছেন, ‘আমরা খুঁজেছি হরেক বইয়ে আপন দেশ/ দেশের মানুষ ঘুরিয়েছি শুধু ডাইনে-বাঁয়ে।’ তিনি বলছেন, এখন আমি হয়রান হয়ে খুঁজছি—ফিরব মোড়ল সে কোন গাঁয়ে। তিনি সত্য উচ্চারণ করেছেন। তিনি ফিরলেন উপনিষদে। তো আমার ধারণা, এই বাংলায় সম্ভবত আমি এবং পশ্চিমবঙ্গে শক্তি চট্টোপাধ্যায়—ত্রিশের পরে আমরা প্রথম বাঙালি কবি। শক্তি চট্টোপাধ্যায় রাঢ় অঞ্চলের ব্রাহ্মণ ছিলেন। তাঁর কবিতায় সেই বৈষ্ণবীয় ভাব, বৈষ্ণবীয় প্রত্যাখ্যান, টান এগুলো আছে ; আর রবীন্দ্রনাথ তো অসাধারণ ব্যাপার।”

‘বিরামপুরের যাত্রী’ বইটিকে তিনি দেখেন অত্যন্ত আধুনিক হিসেবে। তিনি বলেন, “‘বিরামপুরের যাত্রী’ অত্যন্ত আধুনিক কবিতার বই। সমকালীন আধুনিক কবিতার চূড়ান্ত একটা জায়গায় এসে এ বই লেখা হয়েছে। বিরামপুরের যাত্রীতে আছে কী? ইতিহাসচেতনা আছে, প্রকৃতিচেতনা আছে, নারীচেতনা-প্রত্নচিন্তা আছে। সর্বোপরি যেটা আছে, সেটা হলো যে মৃত্যু সম্পর্কে নিশ্চিত থাকা। মৃত্যুকে খুব দূর মনে করি না। এই যে নিশ্বাস টানছি, যেকোনো মুহূর্তে এটা বন্ধ হয়ে যেতে পারে। যতক্ষণ নিশ্বাস বইছে, ততক্ষণ তুমি আমাকে আল মাহমুদ বলছ। যখন আর নিশ্বাস বইছে না, বলছ আল মাহমুদের লাশ। কথাটা কিন্তু খুব ডিফারেন্ট হয়ে যায়। কী জিনিস না থাকলে আমি লাশ হয়ে যাই? আমাকে আর ওপরে রাখা যায় না? তাড়াতাড়ি কবর দিয়ে দিতে হয়? আধ্যাত্মিকতা দিয়ে, ধর্ম দিয়ে, সব ঐতিহ্যগত বিষয় উপস্থাপন করে, ইতিহাসের অভিজ্ঞতা থেকে এই জিনিসটা আমি বুঝতে চেষ্টা করেছি।”

ছন্দের বিষয়ে তিনি জানান, “অ্যাকচুয়ালি ‘বিরামপুরের যাত্রী’র কবিতাগুলো আমি গদ্যেই লিখেছি, দু-একটি ছন্দের চাল আছে। একটা মিশ্রছন্দে লিখতে চেয়েছিলাম। বাংলা কবিতায় পয়ার থেকে বেরিয়ে আসার চেষ্টা তো আমরা সবাই করছি। চালটা পয়ারে চলে আসে। তুমি যদি এমন বিষয়বস্তু আনতে পারো যে পয়ারে চিড় ধরে যাবে, সেটা আমি গদ্যে করার চেষ্টা করেছি। আমার গদ্যকবিতা সমর সেনের গদ্যকবিতা নয়। একটু ডিফারেন্ট। আমি অবশ্য রবীন্দ্রনাথের শেষ দিকের কবিতা জন্মদিনে পড়ে স্তম্ভিত হয়ে গিয়েছিলাম। যে রবীন্দ্রনাথ আমাদের ছন্দ শেখালেন—তাঁর এত ছন্দের খেলা, এত বড় লিরিক্যাল কবি তিনি, এত গীতের রচয়িতা, মৃত্যুর কিছুদিন আগে তিনি হঠাৎ প্লেন গদ্যে নেমে এলেন কেন? প্রশ্নটা আমার মনে জেগেছিল। তো এ রকমই একটা কাজ ‘আমি বিরামপুরের যাত্রী’ এবং এ বইমেলায় প্রকাশিত ‘না কোন শূন্যতা মানি না’ বই দুটিতে করতে চেয়েছি। আমি তো আর এখানে বসে থাকব না, সঙ্গে সঙ্গে আমি আবার ফিরে এসেছি ছন্দে। আমার ধারণা যে কবির কাজ সহজাত ছন্দে চলে যাওয়া।”

‘বেলা শেষে কে বালক’ কবিতায় কৈশোরের হাহাকারের কথা উঠলে তিনি বলেন, “হ্যাঁ, আছে। আমরা কেউ বাড়িতে নেই। আমাদের একটা বাড়ি আছে, কোথায় যেন একটা আছে, সেখানে ফিরে যেতে চাই। আমার ধরো কবরই এখন বাড়ি। আমি সেদিকেই ফিরে যেতে চাই। এই ফিরে যাওয়ার কথাটাই বলতে চেয়েছি এ কবিতায়। খেললাম তো বহু, মেলা থেকে, বাজার থেকে কিনলাম নানা পুতুল, এই খেলাধুলার শেষে এখন বলছি, চলো বাবা বাড়ি ফিরে যাই।”

বইটির নস্টালজিক দিক এবং ‘বিরামপুরের যাত্রী’র অর্থ ব্যাখ্যা করে তিনি বলেন, “হ্যাঁ, এই বইটা এ রকমই। একটু নস্টালজিক কবিতা। প্রত্যেক মানুষই ব্যাক করে, এক জায়গায় চলে যায়। আমার আগে যারা—তসবিহ ঘোরাতে ঘোরাতে অন্তর্হিত হয়ে গেছে। এখন আমার পালা, এখন আমিও যাচ্ছি। ‘বিরামপুরের যাত্রী’ কথাটার মধ্য দিয়ে এটাই বলতে চেয়েছি।”

নারীর প্রভাব ও সম্পর্কের বিষয়ে তিনি বলেন, “দেখো, আমি নারীনির্ভর মানুষ। অল্প বয়সে বিয়ে করার কারণে আমার নারীনির্ভরতা একটু বেশি। আমি কবি মানুষ, একটু উদাসীন—সবটাই আমার স্ত্রীর ঘাড়ে চেপে যায়। আমার পরিচর্যা করা, আমার সুখসুবিধা দেখা...আমি যে কবি, এটা সে জেনেই এসেছে, আমার লেখাপড়া ইত্যাদি, এসব মিলিয়ে আমার ওপর সে একটা গভীর প্রভাব বিস্তার করে আছে। ঋণও আছে। নারীর কাছে তো পুরুষ শুধু আসঙ্গলিপ্সাই কামনা করে না। এটা হচ্ছে জীবনের সামান্য একটা অংশ। তার কাছে পুরুষ দয়া, মায়া, শুশ্রূষা কামনা করে। যৌনতৃপ্তির পর সে এগুলোর জন্য কাতর হয়ে যায়। এটা একধরনের কৃতজ্ঞতা থেকে আসে, এটার নামই আসলে প্রেম। তুমি যেটা জানতে চাও, সেটা আমি বুঝি। কারণ, আমারও তো তোমার মতো বয়স ছিল ; কিন্তু আমি সংযত থেকেছি। সংযত থেকেছি সাহিত্যের জন্য, কবিতার জন্য। না হলে ওলট-পালট হয়ে যেত, কোথায় থেকে কোথায় চলে যেত।”

নারীর স্মৃতি নিয়ে একটি কবিতার কথা উঠলে তিনি বলেন, “...নারীর স্মৃতি শেষ।/ নারী বড় অনাহারি, সাততাড়াতাড়ি/ চোখের আগুনে ভস্ম করে ঘর-বাড়ি।” এটি কোনো আক্ষেপ থেকে এসেছে কি না জানতে চাওয়া হলে তিনি বলেন, “এ তো স্বাভাবিক। বিতৃষ্ণাও সৃষ্টি হয় অনেক সময়, তাই না?”

নাজিম হিকমতকে নিয়ে লেখা কবিতার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “নাজিম হিকমত ল্যুভর মিউজিয়ামের সামনে একটা জায়গায় বসতেন, আমি সেখানে গিয়ে একটু বসলাম। তখন নাজিম হিকমতের একটি ডায়েরি পড়েছিলাম। সেখানে কিছু ঠাট্টা-মশকরা, যা উনি করতেন আর কি, এই যে আর্টফার্ট নিয়ে, ভেনাসকে নিয়ে—এগুলোর কথা মনে পড়ল, তখন এ কবিতাটা লিখেছি। উনি আত্মা, পরকাল—এসব বিশ্বাস করতেন না। তো কোথায় ঢুকবে আত্মা, ঘুরছে পেঁজা তুলার মতো। খুব বড় কবি ছিলেন তিনি। তুর্কিরা তাঁকে শ্রদ্ধা করতেন।”

পরিশেষে, তাঁর কবিতার কোন দিকটি গুরুত্ব পাবে বলে তিনি মনে করেন, তা জানতে চাওয়া হলে তিনি পুনরায় জোর দিয়ে বলেন, “চিত্রকল্পই যে কবিতা, এটা আমি এই বইয়ে খুব বেশি করে দেখাতে চেষ্টা করেছি। আগে তো আমরা বলতাম, শব্দই কবিতা, এটা আমরা ফরাসিদের কাছে শিখেছিলাম। মালার্মে বলতেন এসব কথা। কিন্তু আমার নিজের অভিজ্ঞতায় বুঝেছি, চিত্রকল্পই কবিতা। ইউরোপ ভ্রমণ করে, বিভিন্ন দেশের কবিদের সঙ্গে মিশে, দিল্লিতে গিয়ে তামিল, মালয়ালামসহ বিভিন্ন ভাষার কবিদের সঙ্গে যে ভাববিনিময় করে দেখলাম, তাঁরাও ভাবছেন, কবিতা আসলে চিত্রকল্প।”

ইতিহাস ও ঐতিহ্যের কথা বলে তিনি শেষ করেন, “‘বিরামপুরের যাত্রী’ এবং এর পরের ‘না কোন শূন্যতা মানি না’ বই দুটিতে আমি চিত্রকল্পের কাজটা বেশি করে করতে চেয়েছি। তরুণদের এটা হয়তো ভালো লাগবে।”