চেয়ারে আরাম করে বসে নিজের হাতে তৈরি একটি ‘কাঠের ক্রেনের’ হাতল ঘোরাচ্ছেন মো. হাতেম আলী (৫২)। তিনি হাতল ঘোরাতেই ক্রেনটিতে ঝোলানো থালার মতো পাত্রটি দোকানের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে থাকা ক্রেতার কাছে পৌঁছে দিচ্ছে চা ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় পণ্য। এই বিশেষ ব্যবস্থার ফলে ক্রেতাদের হাতে পণ্য পৌঁছে দিতে তাঁকে বারবার নিজের আসন ছেড়ে উঠতে হয় না। ক্রেতারা হাতেম আলীর এই উদ্ভাবনী যন্ত্রটির নাম দিয়েছেন ‘ক্রেন’।

নেত্রকোনার পূর্বধলা উপজেলার শ্যামগঞ্জ-বিরিশিরি সড়কের পাশে জারিয়া ইউনিয়ন পরিষদ-সংলগ্ন বারহা বোর্ডবাজারে হাতেম আলীর এই দোকানটি অবস্থিত। কাঠ, তার এবং বিয়ারিং ব্যবহার করে তিনি নিজেই এই বিশেষ যন্ত্রটি তৈরি করেছেন। তাঁর দাবি অনুযায়ী, এই যন্ত্রটি নির্মাণ করতে তাঁর প্রায় সাড়ে পাঁচ হাজার টাকার মতো খরচ হয়েছে।

পেশায় কাঠমিস্ত্রি হাতেম আলী বারহা উত্তরপাড়া গ্রামের একজন বাসিন্দা। গ্রামের একটি প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে তিনি পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশোনা করেছেন। কাঠের কাজের অভিজ্ঞতার পাশাপাশি দীর্ঘ প্রায় তিন দশক ধরে তিনি একটি চায়ের দোকান পরিচালনা করছেন।

হাতেম আলী মুক্তকণ্ঠকে বলেন, ‘এখন কাজের লোক পাওয়া যায় না। একজন কর্মচারী রাখলেও বেতন ও খাওয়া মিলিয়ে মাসে প্রায় ২০ হাজার টাকা খরচ। তাই নিজেই একটা ব্যবস্থা করার কথা ভাবি। পরে ক্রেনটি তৈরি করি। এখন চেয়ারে বসেই হাতল ঘুরিয়ে দোকানের ভেতর ও বাইরের ক্রেতাদের কাছে চা ও অন্যান্য পণ্য পৌঁছে দিতে পারি।’

উদ্ভাবনী কাজের এই প্রচেষ্টা হাতেম আলীর জন্য প্রথম নয়। তিনি জানান, প্রায় ৩০ বছর আগে রেললাইনে মালামাল পরিবহনের উদ্দেশ্যে বিয়ারিং ব্যবহার করে বিশেষ ধরনের গাড়ি তৈরি করেছিলেন তিনি। এছাড়া কাঠ খোদাই করে মানুষের অবয়ব তৈরি করতেও তিনি পারদর্শী।

আজ রোববার দুপুরে হাতেম আলীর দোকানে গিয়ে দেখা যায়, ১০ থেকে ১২ জন ক্রেতা দোকানের বেঞ্চ ও চেয়ারে বসে আছেন। তিনি চা তৈরি করে ক্রেনে ঝোলানো সিলভারের থালায় কাপগুলো রাখছেন এবং হাতল ঘোরাচ্ছেন। মাত্র কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই কাপগুলো ক্রেতাদের কাছে পৌঁছে যাচ্ছে। শুধু চা নয়, পান, সিগারেট, বিস্কুট এবং এমনকি টাকা আদান-প্রদানও তিনি এই ক্রেনের মাধ্যমেই করছেন।

চা ও পান খেতে আসা তুতিরপাড়া গ্রামের বাসিন্দা কুদ্দুস মিয়া বলেন, ‘হাতেম আলী সব সময়ই ব্যতিক্রমী কিছু করার চেষ্টা করেন। এর আগেও তাঁর তৈরি নানা জিনিস এলাকায় সাড়া ফেলেছিল।’ অন্যদিকে বারহা গ্রামের বাসিন্দা মো. আবদুল মালেক জানান, এসব সৃজনশীল কাজের জন্য এলাকার মানুষের কাছে হাতেম আলী অত্যন্ত পরিচিত এবং তাঁর দোকানে অনেকেই চা খেতে আসেন।

স্থানীয় বাসিন্দাদের মতে, হাতেম আলী সব সময়ই ব্যতিক্রমী কিছু করতে পছন্দ করেন। যথাযথ পৃষ্ঠপোষকতা পেলে তিনি আরও উন্নত ও বড় কিছু করতে সক্ষম হবেন। স্থানীয় জারিয়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আমিনুল ইসলাম বলেন, হাতেম আলী একজন সৃষ্টিশীল মানুষ। শুধু এটি নয়, এর আগেও তিনি ব্যতিক্রমী বিভিন্ন উপকরণ তৈরি করেছেন।