টেসলার নতুন চমক ‘রোডস্টার’ কেবল একটি দ্রুতগতির বৈদ্যুতিক গাড়ি নয়, বরং বিশেষ প্রযুক্তির সমন্বয়ে এটি এখন বাতাসে ভেসে থাকার সক্ষমতা অর্জন করেছে। গাড়িটির সর্বোচ্চ গতি ঘণ্টায় ২৩০ মাইলেরও বেশি। এর ত্বরণ ক্ষমতা এতটাই প্রবল যে, শূন্য থেকে ঘণ্টায় ৬০ মাইল (প্রায় ৯৭ কিলোমিটার) গতিতে পৌঁছাতে গাড়িটির এক সেকেন্ডেরও কম সময় লাগে। বিশেষ সাকশন প্রযুক্তির কারণে গাড়িটি উল্টো হয়েও চলার ক্ষমতা রাখে। তবে সবচেয়ে বেশি আলোচনার জন্ম দিয়েছে এর রকেট থ্রাস্টার প্রযুক্তি, যার মাধ্যমে রোডস্টার মাটি ছেড়ে ওপরে উঠে বাতাসে ভেসে থাকতে পারে। সম্প্রতি এই উড্ডয়নক্ষমতার প্রদর্শনী অনুষ্ঠিত হওয়ার পর থেকেই বাংলাদেশসহ বিশ্বজুড়ে প্রযুক্তিপ্রেমীদের মধ্যে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়েছে। তবে এই উড়ন্ত গাড়িটি রাস্তায় চলাচলকারী মানুষ বা অন্যান্য যানবাহনের জন্য চরম বিপদের কারণ হতে পারে বলে সমালোচনা করছেন অনেকে।

টেসলার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, স্পেসএক্সের প্রযুক্তির আদলে তৈরি এই থ্রাস্টারগুলো গাড়িটির ‘রকেট’ সংস্করণে যুক্ত করা হবে, যেখানে সর্বোচ্চ ১০টি থ্রাস্টার থাকবে। তবে এই বিশেষ সংস্করণটি সাধারণ মানুষের জন্য সরাসরি বিক্রি করা হবে না। ২০২৮ সালে উৎপাদন শুরু হলে এটি কেবল নির্দিষ্ট কিছু নির্বাচিত ব্যক্তির কাছেই বিক্রি করা হবে। প্রদর্শনী চলাকালীন রোডস্টারের থ্রাস্টারগুলোর কার্যকারিতা দেখাতে প্রথমে গাড়িটিকে উল্টো করে আবার সোজা করা হয়। এরপর গাড়িটি সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে থাকা কয়েকটি গাড়ির ওপর দিয়ে লাফিয়ে যাওয়ার দৃশ্য দেখানো হয়। দর্শকদের মুগ্ধ করলেও এই প্রদর্শনী প্রযুক্তিটির বাস্তব কার্যকারিতা এবং নিরাপত্তা নিয়ে বড় ধরনের প্রশ্ন তুলেছে।

রোডস্টারের রকেট থ্রাস্টার পরিচালনার জন্য বিশেষ ধরনের ট্যাংক ব্যবহার করা হয়েছে, যাকে কার্বন ফাইবার ওভারর‍্যাপড প্রেসার ভেসেল (সিওপিভি) বলা হয়। এই ট্যাংকগুলোতে অত্যন্ত উচ্চচাপে বাতাস জমা রাখা হয়। যখন থ্রাস্টারের মাধ্যমে সেই বাতাস দ্রুত বাইরে বের করে দেওয়া হয়, তখন বিপরীত দিকে একটি বল বা ধাক্কা তৈরি হয়। এই বলের প্রভাবেই গাড়িটি বিপরীত দিকে এগিয়ে যায়। যখন থ্রাস্টার থেকে ওপরের দিকে বল প্রয়োগ করা হয়, তখন গাড়িটি মাটি ছেড়ে ওপরে উঠতে পারে। রোডস্টারের সিওপিভি ট্যাংকগুলো কোল্ড-গ্যাস থ্রাস্টারের সঙ্গে যুক্ত থাকে। নামের মধ্যে ‘কোল্ড’ বা ঠান্ডা শব্দটি থাকলেও এর অর্থ বাতাস শীতল করা নয়। বরং প্রচলিত রকেটের মতো জ্বালানি পুড়িয়ে শক্তি উৎপন্ন করার পদ্ধতি থেকে এই প্রযুক্তির পার্থক্য বোঝাতেই এই নামকরণ করা হয়েছে।

কোল্ড-গ্যাস থ্রাস্টারে কোনো জ্বালানি পোড়ানোর প্রয়োজন হয় না; বরং উচ্চচাপে সঞ্চিত বাতাস দ্রুত নির্গত করে প্রয়োজনীয় ধাক্কা তৈরি করা হয়। স্পেসএক্স দীর্ঘ বছর ধরে এই ধরনের থ্রাস্টার ব্যবহার করে আসছে। প্রতিষ্ঠানটির ফ্যালকন ৯ রকেটের বুস্টারকে নিরাপদে পৃথিবীতে ফিরিয়ে আনার ক্ষেত্রেও এই প্রযুক্তির ব্যবহার দেখা যায়।

তবে রোডস্টার কতক্ষণ ধরে বাতাসে উড়তে পারবে, সে বিষয়ে টেসলা এখনো বিস্তারিত কোনো তথ্য প্রকাশ করেনি। প্রদর্শনীতে গাড়িটিকে লাফ দিতে, মাঝ-আকাশে ভারসাম্য রক্ষা করতে এবং অবতরণ করতে দেখা গেলেও, দীর্ঘ সময় ধরে উড়তে পারবে কি না তা স্পষ্ট নয়। ফলে শহরের যানজট এড়িয়ে উড়ে গন্তব্যে পৌঁছানোর স্বপ্নটি আপাতত বাস্তবসম্মত মনে হচ্ছে না।

উড্ডয়নক্ষমতা চমকপ্রদ হলেও রকেট থ্রাস্টারযুক্ত এই গাড়িটি খুব শীঘ্রই সাধারণ সড়কে চলাচলের অনুমতি পাবে, এমন সম্ভাবনা ক্ষীণ। টেসলার প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ইলন মাস্ক জানিয়েছেন, গাড়িটি তৈরির ক্ষেত্রে আপাতত নিরাপত্তাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হয়নি। গাড়িটি সড়কে চলাচলের উপযোগী কি না, এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি জানান, “বিষয়টি নির্ভর করছে কোন সড়কে এটি চালানো হচ্ছে তার ওপর।”

টেসলার নিজস্ব ওয়েবসাইটে ‘রকেট’ সংস্করণটিকে জনসাধারণের ব্যবহারের সড়কে চলাচলের জন্য একটি অননুমোদিত সংস্করণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। এই সংস্করণে থাকবে মাত্র একটি আসন এবং ১০টি থ্রাস্টার। অন্যদিকে, দুই আসনবিশিষ্ট ‘থ্রাস্ট’ সংস্করণে তুলনামূলক কমসংখ্যক থ্রাস্টার থাকবে এবং এটি সীমিত পরিসরে বাজারজাত করা হবে। আর ‘পারফরম্যান্স’ সংস্করণটি হবে সাধারণ সড়কে চলাচলের উপযোগী, যাতে কোনো রকেট থ্রাস্টার থাকবে না।

রকেট সংস্করণের গাড়ির পেছনে থাকা চারটি থ্রাস্টার একসঙ্গে ৮০ কিলো নিউটনের বেশি বল তৈরি করতে সক্ষম। এই শক্তির পরিমাণ প্রায় ৯ টন ওজনের কোনো বস্তুর আঘাতের সমান। ফলে থ্রাস্টারের প্রবল বাতাসের ধাক্কায় পাশে থাকা মানুষের একাধিক হাড় ভেঙে যেতে পারে এবং শরীরের অভ্যন্তরীণ অঙ্গপ্রত্যঙ্গ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। ট্রাফিক সিগন্যাল সবুজ হওয়ার সাথে সাথে চালক যদি থ্রাস্টার চালু করেন, তবে পেছনে থাকা গাড়িগুলো মারাত্মক ক্ষতির মুখে পড়তে পারে। ঝুঁকি কেবল বাতাসের ধাক্কাতেই সীমাবদ্ধ নয়; থ্রাস্টার থেকে নির্গত গ্যাসের প্রচণ্ড গতির কারণে রাস্তার ধুলাবালু, পাথরের টুকরো বা ছোট কোনো বস্তু বুলেটের মতো দ্রুতগতিতে ছিটকে গিয়ে মানুষ ও যানবাহনের বড় ক্ষতি করতে পারে।

থ্রাস্টারের সাহায্যে উড়ন্ত গাড়িটি নিয়ন্ত্রিতভাবে অবতরণ করলেও নিচে থাকা ব্যক্তির নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে না। এমনকি গাড়ির ভেতরে থাকা চালকের সুরক্ষা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। মাঝ-আকাশে গাড়িটি উল্টে গেলে বা ডিগবাজি খেলে চালককে আসনের সাথে শক্তভাবে ধরে রাখার জন্য বিশেষ সুরক্ষাব্যবস্থা প্রয়োজন হতে পারে। এক্ষেত্রে সাধারণ গাড়ির সিটের বদলে রোলার কোস্টারে ব্যবহৃত বেল্ট বা সুরক্ষাব্যবস্থার মতো কিছু যুক্ত করার প্রয়োজন হতে পারে।

সামগ্রিকভাবে, টেসলার নতুন রোডস্টারের উড্ডয়নপ্রযুক্তি বিস্ময়কর হলেও এর সাথে জড়িয়ে আছে গুরুতর নিরাপত্তাঝুঁকি। থ্রাস্টারের বিপুল শক্তি, গ্যাসের তীব্র প্রবাহ এবং অবতরণের সময় সম্ভাব্য বিপদের কারণে এই গাড়িটি সাধারণ সড়কে চলাচলের অনুমতি পাবে কি না, তা নিয়ে যথেষ্ট সংশয় রয়েছে। সূত্র: টেক রাডার