সরকারের মুখে জুলাই সনদ অক্ষরে অক্ষরে বাস্তবায়নের আশ্বাস শুনতে শুনতে এখন জাতি বিরক্ত হয়ে পড়েছে বলে দাবি করেছেন আমার বাংলাদেশ পার্টির (এবি পার্টি) চেয়ারম্যান মজিবুর রহমান মঞ্জু।

রোববার (১৮ অক্টোবর) ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির (ডিআরইউ) শফিকুল কবির মিলনায়তনে এবি পার্টির আয়োজনে ‘জুলাই সনদের এক বছর: প্রতিশ্রুতি ও প্রত্যাশার সালতামামি’ শীর্ষক একটি মুক্ত আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়। ওই অনুষ্ঠানেই তিনি এই মন্তব্য করেন।

সভাপতির বক্তব্যে মজিবুর রহমান মঞ্জু আক্ষেপ করে বলেন, “সরকার এত দ্রুত প্রতিশ্রুতি থেকে সরে আসবে, আমরা তা কল্পনাও করিনি।” তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, বিএনপি নিজেই দাবি করেছে জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থানে তাদের ৮৪৮ জন কর্মী শহীদ হয়েছেন। সেই শহীদদের রক্ত ও জীবনের প্রতি দায়বদ্ধতা থেকেই সরকারের উচিত জুলাই সনদ বাস্তবায়ন করা।

সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, শেখ হাসিনা জাতির সঙ্গে প্রতিশ্রুতি রক্ষা না করার পরিণতি ভোগ করেছেন। বিএনপিরও সেই একই ভুল করা উচিত হবে না বলে তিনি সতর্ক করেন। মজিবুর রহমান মঞ্জুর মতে, জুলাই সনদে ৮৪টি সংস্কার প্রস্তাব ও সাত দফা অঙ্গীকার রয়েছে, যার অনেকগুলোই বিএনপির ঘোষিত ৩১ দফার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। তা সত্ত্বেও ক্ষমতায় আসার পর বিএনপির আচরণ এমন, যেন জুলাই সনদটি তাদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে।

অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির capacity-তে বক্তব্য রাখেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ও বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান। তিনি বলেন, “বিএনপি ৫ আগস্ট পর্যন্ত মজলুম ছিল, কিন্তু এরপর তারা দ্রুত অতীতের কথা ভুলে গেছে।” জুলাই সনদ ও গণভোটের রায় বাস্তবায়ন না করে সরকার জনগণের সঙ্গে প্রতারণা করছে বলেও তিনি অভিযোগ করেন।

তিনি আরও বলেন, “বিএনপি বদলে গেলেও আমরা বদলাব না। জুলাই সনদ ও গণভোট বাস্তবায়ন করেই ছাড়ব।” বর্তমান সরকার বিরোধী দলের সহযোগিতা পাওয়ার যোগ্য নয় বলে মনে করেন তিনি। ডা. শফিকুর রহমানের দাবি, আজ থেকে বিরোধী দল সরকারকে নয়, বরং ১৮ কোটি মানুষকে সহযোগিতা করবে।

সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে সম্পূর্ণ দলীয় প্রভাবমুক্ত রাখার প্রয়োজনীয়তা উল্লেখ করে জামায়াত আমির বলেন, বিরোধী দলের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের উন্নয়নমূলক কাজ থেকে বঞ্চিত করা রাষ্ট্রের জন্য অপরাধ। তার মতে, এই আন্দোলন কেবল ১১ দলের নয়, বরং ফ্যাসিবাদের পথ রুদ্ধ করে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি ন্যায়ভিত্তিক বাংলাদেশ গড়ার লড়াই।

বিশেষ অতিথির বক্তব্যে লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির (এলডিপি) চেয়ারম্যান ড. কর্নেল (অব.) অলি আহমদ বীর বিক্রম বলেন, জনগণকে কী প্রয়োজন তা সরকারকে বুঝতে হবে। প্রধানমন্ত্রী একাধিকবার জুলাই সনদ অক্ষরে অক্ষরে বাস্তবায়নের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন এবং এই প্রতিশ্রুতি রক্ষা করা রাজনৈতিক নেতৃত্বের নৈতিক দায়িত্ব। তিনি আরও মন্তব্য করেন যে, নির্বাচনের আগে বিভিন্ন কার্ড বিতরণের মাধ্যমে নির্বাচনে প্রভাব বিস্তারের আশঙ্কা তৈরি হচ্ছে, কিন্তু নির্বাচন কমিশন এ বিষয়ে কার্যকর ভূমিকা পালন করছে না।

বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির আল্লামা মামুনুল হক জুলাই সনদকে বাংলাদেশের ইতিহাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক দলিল এবং রাষ্ট্র মেরামতের রূপরেখা হিসেবে অভিহিত করেন। তিনি বলেন, রাষ্ট্র সংস্কারে ব্যর্থতার কারণেই ছাত্র-জনতা গণ-অভ্যুত্থানে এগিয়ে এসেছিল। তিনি অভিযোগ করেন, বিএনপি জুলাই সনদ ও গণভোটের রায়ের ক্ষেত্রে দ্বৈত অবস্থান নিয়েছে। সরকার গঠনের ফলাফল মেনে নিলেও তারা গণভোটের রায় উপেক্ষা করছে। আল্লামা মামুনুল হকের মতে, জুলাই সনদ কার্যকর করতেই হবে, অন্যথায় সংবিধান সংস্কার নিয়ে সংকট আরও ঘনীভূত হবে।

জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) দক্ষিণাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক হাসনাত আব্দুল্লাহ বলেন, জুলাই সনদ নিয়ে বিএনপি জাতির সঙ্গে প্রতারণা করেছে এবং সনদের একাধিক ধারা লঙ্ঘন করেছে। তার মতে, সংস্কার পরিষদ গঠনের দাবি ছিল সংস্কারের ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করা এবং গণভোটের রায় বাস্তবায়নের লক্ষ্যে। তিনি বলেন, “জুলাই সনদবিহীন চলা মানে ফিটনেসবিহীন গাড়িতে ওঠা।” জুলাই সনদের মৌলিক চেতনা উপেক্ষা করে রাষ্ট্র পরিচালনা করলে নতুন রাজনৈতিক সংকট তৈরি হবে এবং সরকার রাষ্ট্রকে জনকল্যাণের পরিবর্তে ব্যবসায়িক স্বার্থের দিকে ঠেলে দিচ্ছে বলে তিনি দাবি করেন।

এবি পার্টির সাধারণ সম্পাদক ব্যারিস্টার আসাদুজ্জামান ফুয়াদ বলেন, ২০২৪ সালের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ লিখিত রাজনৈতিক দলিল হলো জুলাই সনদ। রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানগুলো পুনর্গঠন এবং জবাবদিহিতা নিশ্চিত করাই এর মূল উদ্দেশ্য। তিনি বলেন, জুলাই সনদে স্বাক্ষর ও গণভোটের মাধ্যমে সংস্কারের প্রশ্নে রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত হয়েছে; এখন প্রধান দায়িত্ব হচ্ছে তা বাস্তবায়ন করা। সনদের বাস্তবায়ন নিয়ে প্রশ্ন তুললেই সংবিধানের দোহাই দেওয়া গ্রহণযোগ্য নয় বলে তিনি মনে করেন। রাজনৈতিক সংকটের সমাধান রাজনৈতিকভাবেই করতে হবে এবং এ ক্ষেত্রে এবি পার্টি প্রস্তুত বলে জানান তিনি।

এবি পার্টির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ব্যারিস্টার যোবায়ের আহমেদ ভূইয়ার সঞ্চালনায় সভায় আরও বক্তব্য রাখেন এবি পার্টির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ব্যারিস্টার আব্বাস ইসলাম খান নোমান।

সভায় আরও উপস্থিত ছিলেন এবি পার্টির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট আবদুল্লাহ আল মামুন রানা, এবিএম খালিদ হাসান, মো. আলতাফ হোসাইন, শাহাদাতুল্লাহ টুটুল, আমিনুল ইসলাম, বরিশাল সাংগঠনিক সম্পাদক গাজী নাসির, ঢাকা মহানগর দক্ষিণের আহ্বায়ক আব্দুল হালিম খোকন, ঢাকা মহানগর উত্তরের আহ্বায়ক সেলিম খান, শ্রমবিষয়ক সম্পাদক শাহ আব্দুর রহমান, স্বেচ্ছাসেবক পার্টির আহ্বায়ক কেফায়েত হোসাইন তানভীর, ছাত্রপক্ষের সভাপতি মোহাম্মদ প্রিন্স, ত্রাণ ও পুনর্বাসনবিষয়ক সম্পাদক রাজিয়া সুলতানা, গণপরিবহনবিষয়ক সম্পাদক অ্যাডভোকেট মতিয়ার রহমান, সড়ক ও যোগাযোগবিষয়ক সম্পাদক প্রকৌশলী এম শাহেদুল ইসলাম, কর্মসংস্থানবিষয়ক সম্পাদক সফিউল বাশার, সমাজকল্যাণ সম্পাদক অধ্যাপক আবু হেলাল, গাজীপুর মহানগরের আহ্বায়ক ইঞ্জিনিয়ার আলমগীর হোসাইন, ঢাকা মহানগর দক্ষিণের সদস্যসচিব বারকাজ নাসির আহমদ, ঢাকা মহানগর উত্তরের সদস্যসচিব সামিউল ইসলাম সবুজ, সহকারী প্রচার সম্পাদক আজাদুল ইসলাম আজাদ, সহকারী অর্থ সম্পাদক আবু বকর সিদ্দিক ও শাব্বির আহমেদ তামিম, সহকারী দপ্তর সম্পাদক মশিউর রহমান মিলু ও মোহসীনুল হক চৌধুরী, সহসাংস্কৃতিক সম্পাদক আব্দুর রব জামিল, নারী উন্নয়নবিষয়ক সহসম্পাদক শাহিনুর আক্তার শিলা ও আমেনা বেগম, উদ্যোক্তা ও কর্মসংস্থানবিষয়ক সম্পাদক সুমাইয়া শারমিন ফারহানা, সহ-প্রকাশনা সম্পাদক ফিরোজ কবির, গাজীপুর মহানগরের সদস্যসচিব মাসুদ জমাদ্দার রানা এবং প্রবাসীবিষয়ক সহসম্পাদক নুরুন্নবী নয়ন, গাইবান্ধা জেলা আহ্বায়ক খাইরুল ইসলাম, নরসিংদী সমন্বয়ক কাজল মিয়া, রমনা থানার আহ্বায়ক আব্দুল কাদের মুন্সী, যাত্রাবাড়ী থানার আহ্বায়ক মিয়া সুলতান আরিফ প্রমুখ।