জুলাই সনদের ৫ হাজার ৬৯০টি শব্দের মধ্যে বর্তমান সরকার কতটুকু বাস্তবায়ন করেছে, তার সঠিক হিসাব জানতে চায় সাধারণ জনগণ। আমার বাংলাদেশ পার্টির (এবি পার্টি) চেয়ারম্যান মজিবুর রহমান মঞ্জুর এমন দাবি। তিনি স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেন, “জুলাই সনদের একটি অক্ষরও বাস্তবায়ন করা হয়নি।” তাঁর মতে, গণভোটের রায় বাস্তবায়ন করতে ব্যর্থ হলে সরকারকে জনগণের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতার দায়ে একদিন রাজনৈতিক ও আইনগত বিচারের মুখোমুখি হতে হবে।
বুধবার (২৮ অক্টোবর) জাতীয় প্রেসক্লাবের তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া হলে ‘বছর পেরিয়ে জুলাই সনদ: প্রতিশ্রুতি বনাম বাস্তবতা’ শীর্ষক এক মতবিনিময় সভায় সভাপতির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। উক্ত সভায় আমন্ত্রিত অতিথি হিসেবে বক্তব্য প্রদান করেন বিশিষ্ট রাষ্ট্রবিজ্ঞানী প্রফেসর ড. দিলারা চৌধুরী, ভয়েস অব রিফর্মের সংগঠক মাশরুর ফাহিম, এনসিপির যুগ্ম আহ্বায়ক সরোয়ার তুষার, এবি পার্টির সাধারণ সম্পাদক ব্যারিস্টার আসাদুজ্জামান ফুয়াদ এবং মানবাধিকার কর্মী ও কলামিস্ট আমাতুল্লাহ রুবী।
সভায় মজিবুর রহমান মঞ্জু বলেন, “কোনো ভাষায় সমালোচনা করলে কিংবা কী ধরনের কর্মসূচি দিলে সরকারি দলের নেতাকর্মীরা ক্ষুব্ধ হবেন না, গালাগালি করবেন না, মারতে উদ্যত হবেন না কিংবা ক্রসফায়ারে দেওয়ার চিন্তা করবেন না, তা আমাদের জানা নেই।” তিনি আরও যোগ করেন, “আবার আমাদের প্রতিবাদ যেন কুসুম-কুসুম বিরোধিতা মনে না হয়, কার্যকর বিরোধী দল হিসেবে আমাদের ভূমিকা ও রাজনৈতিক অবস্থানও যেন প্রশ্নবিদ্ধ না হয়। এমন ভাষা ও কর্মসূচি কারও জানা থাকলে আমাদের জানাবেন।”
ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট টেনে তিনি বলেন, ১৯৭০ সালের নির্বাচনে জনগণের রায় অস্বীকার করার পরিণাম হিসেবেই মুক্তিযুদ্ধ সংঘটিত হয়েছিল। বর্তমান সরকার যদি গণভোটের রায় বাস্তবায়ন না করে, তবে তারা ইতিহাসে জুলফিকার আলী ভুট্টো ও ইয়াহিয়া খানের মতো নেতিবাচক চরিত্রে পরিণত হতে পারে। তিনি সতর্ক করে বলেন, এবার আগে সনদ তৈরি হবে, তারপর গণ-অভ্যুত্থান হবে, আগামী গণ-অভ্যুত্থান সেই বাস্তবতার ভিত্তিতেই গড়ে উঠবে।
সরকারের সমালোচনা করে মজিবুর রহমান মঞ্জু প্রশ্ন তোলেন, প্রধানমন্ত্রী বা সরকারকে কটূক্তি করার অভিযোগে নির্দিষ্ট কিছু মানুষকে গ্রেপ্তার করা হলেও অন্যদের ক্ষেত্রে একই ধরনের অভিযোগে কেন ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না? এই প্রশ্নের জবাব দিতে হবে সরকারকে। এছাড়া স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে প্রভাবিত করতে বরাদ্দসহ বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে বলেও তিনি অভিযোগ করেন।
অনুষ্ঠানে বিশিষ্ট রাষ্ট্রবিজ্ঞানী অধ্যাপক ড. দিলারা চৌধুরী মন্তব্য করেন যে, সরকার বর্তমানে উল্টোপথে হাঁটছে এবং বাক্স্বাধীনতা হরণের প্রবণতা প্রকট হয়ে উঠছে। মেজর আক্তারুজ্জামানের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রবিরোধী মামলা দায়েরের যৌক্তিকতা নিয়েও তিনি প্রশ্ন তোলেন। তিনি লক্ষ্য করেন, সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠন না করে কেবল একটি সংবিধান সংশোধনী কমিটি গঠন করা হয়েছে। তাঁর মতে, সংসদে সরকারি ও বিরোধী দল উভয়ই এখন সরকারের অংশ। বিরোধী দল যদি কঠোর অবস্থান নেয়, তবে সরকার আরও আগ্রাসী হয়ে উঠবে—এমন আশঙ্কায় তারা কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারছে না।
আইজিপির আইনবিরোধী বক্তব্যের সমালোচনা করে ড. দিলারা বলেন, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীও এখন সেই বক্তব্যের সাফাই গাইছেন। তিনি সতর্ক করে বলেন, বিরোধী দল যদি কেবল পাঁচ বছর পর ক্ষমতায় আসার অপেক্ষায় থেকে কুসুম-কুসুম বিরোধিতা করে, তবে তা হবে একটি ভুল সিদ্ধান্ত। এছাড়া উচ্চকক্ষের মেয়াদ ছয় বছর করার প্রস্তাবের সমালোচনা করে তিনি বলেন, এ ধরনের ব্যবস্থায় ভবিষ্যৎ তত্ত্বাবধায়ক সরকার পক্ষপাতদুষ্ট হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হতে পারে, যা অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনকে বাধাগ্রস্ত করবে।
ভয়েস অব রিফর্মের সংগঠক মাশরুর ফাহিম দেশের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিকে বর্ণনা করতে গিয়ে বলেন, এটি যেন ‘বানরের তৈলাক্ত বাঁশে ওঠার’ মতো। জুলাইয়ের গণ-অভ্যুত্থানকে একটি জনযুদ্ধ হিসেবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, সেই জনযুদ্ধে জনগণ বিজয়ী হয়েছে। তাই তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা ও সাইবার সুরক্ষার মতো বিষয়গুলো নিয়ে নতুন করে বিতর্ক সৃষ্টি না করে দ্রুত বাস্তবায়নের দিকে এগোতে হবে।
তিনি আরও বলেন, সাইবার আইন প্রণয়নের আগেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মন্তব্যের কারণে গ্রেপ্তারের ঘটনা ঘটছে। আইনটি কার্যকর হলে পরিস্থিতি আরও খারাপ হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তাঁর মতে, সরকার সীমারেখা অতিক্রম করে ফ্যাসিবাদের দিকে ধাবিত হচ্ছে। পিএসসি, দুদক ও বিচার বিভাগের স্বাধীনতার মতো সংস্কার সাধারণ মানুষের স্বার্থেই প্রয়োজন। রাজনৈতিক দলগুলোর নেতৃত্বের বাইরে থেকেও ভবিষ্যতে আরেকটি গণ-অভ্যুত্থান ঘটতে পারে বলে তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন।
এবি পার্টির সাধারণ সম্পাদক ব্যারিস্টার আসাদুজ্জামান ফুয়াদ বলেন, “জুলাই সনদের কথা বললেই সরকারি দলের পক্ষ থেকে বলা হয়, জনগণ জুলাই সনদ বোঝে না।” অথচ জনগণ বিচার ও সংস্কার চায়। তিনি জোর দিয়ে বলেন, সরকার চাইলেও কোনো আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড বা ক্রসফায়ারের অনুমতি দিতে পারে না। অতীতের ক্রসফায়ার ও গুমের ঘটনাগুলো দেশের মানুষকে গভীরভাবে ক্ষতবিক্ষত করেছে। এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঠেকানো এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানে জবাবদিহি নিশ্চিত করতেই জুলাই সনদের প্রয়োজন। জুলাই গণহত্যার বিচারপ্রক্রিয়া দুর্বল হয়ে পড়ছে বলেও তিনি উদ্বেগ প্রকাশ করেন।
ফুয়াদ আরও বলেন, সাংবিধানিক ও সংবিধিবদ্ধ প্রতিষ্ঠানগুলোতে দলীয় ব্যক্তিদের নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। দেশের ভেঙে পড়া শিক্ষাব্যবস্থার উত্তরণ, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা এবং রাষ্ট্রীয় সংস্কার নিশ্চিত করতে জুলাই সনদ বাস্তবায়ন জরুরি। তাঁর মতে, তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা একটি মীমাংসিত বিষয় এবং সেটি নিয়ে নতুন করে বিতর্ক সৃষ্টি করা উচিত নয়। গুম, মানবাধিকার ও সাইবার আইনসংক্রান্ত বিভিন্ন উদ্যোগের সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগীদের মধ্যে বিএনপিও রয়েছে। অতীতের ভুলের পুনরাবৃত্তি না করে সরকারকে প্রতিশ্রুতি রক্ষা ও জনগণের সঙ্গে ওয়াদা বরখেলাপ না করার আহ্বান জানান তিনি।
এনসিপির যুগ্ম আহ্বায়ক সরোয়ার তুষার বলেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মন্তব্যের কারণে গ্রেপ্তারের ঘটনা মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিয়ে গভীর উদ্বেগ তৈরি করছে। তিনি অভিযোগ করেন, তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা নিয়ে নতুন করে বিতর্ক সৃষ্টি করা হচ্ছে, যা অতীতের রাজনৈতিক সংকটের পুনরাবৃত্তির আশঙ্কা তৈরি করছে। বিচারপতিদের অবসরের বয়স বাড়ানোকে কেন্দ্র করে অতীতে যে রাজনৈতিক সংকট তৈরি হয়েছিল, তার পরিণতি শুধু রাজনৈতিক দল নয়, পুরো জাতিকে ভোগ করতে হয়েছে। জুলাই সনদ নিয়ে বিএনপির বক্তব্য ও বাস্তব অবস্থানের মধ্যে অসংগতি রয়েছে বলেও তিনি মন্তব্য করেন। তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা নিয়ে কোনো কুমতলব থাকলে তা সফল হবে না বলে তিনি সতর্ক করেন।
মানবাধিকারকর্মী ও কলামিস্ট আমাতুল্লাহ রুবী বলেন, রাজনৈতিক দলগুলো জুলাই সনদ অক্ষরে অক্ষরে বাস্তবায়নের অঙ্গীকার করেছিল। গণভোটে জনগণ সংস্কারের পক্ষে রায় দিয়েছে। সেই রায় উপেক্ষা করা হলে তা গণতান্ত্রিক আকাঙ্ক্ষার পরিপন্থি হবে। তিনি আরও বলেন, অর্থনৈতিক সংকট ও বিনিয়োগে অনাগ্রহের পেছনে রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা এবং কার্যকর সংস্কারের অভাব গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। অর্থবহ সংস্কার ছাড়া অর্থনীতিতে অগ্রগতি সম্ভব নয় এবং সংস্কার ছাড়া নির্বাচন হলে দেশ আরও পিছিয়ে পড়বে।
সভায় আরও বক্তব্য রাখেন এবি যুব পার্টির সদস্য সচিব হাদীউজ্জামান খোকন, ছাত্রপক্ষের সভাপতি মোহাম্মদ প্রিন্স এবং ঢাকা মহানগর দক্ষিণ এবি পার্টির আহ্বায়ক আব্দুল হালিম খোকন।
এবি পার্টির নেতৃবৃন্দের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন ঢাকা মহানগর দক্ষিণের আহ্বায়ক আব্দুল হালিম খোকন, স্বেচ্ছাসেবক পার্টির আহ্বায়ক কেফায়েত হোসাইন তানভীর, ঢাকা মহানগর দক্ষিণের সদস্যসচিব বারকাজ নাসির আহমদ, ছাত্র পক্ষের সাধারণ সম্পাদক রাফিউর রহমান ফাত্তাহ, সহকারী প্রচার সম্পাদক আজাদুল ইসলাম আজাদ, রিপন মাহমুদ, সহকারী অর্থ সম্পাদক আবু বকর সিদ্দিক, নারী উন্নয়নবিষয়ক সহসম্পাদক শাহিনুর আক্তার শিলা, উদ্যোক্তা ও কর্মসংস্থানবিষয়ক সহসম্পাদক সুমাইয়া শারমিন ফারহানা, সহকারী দপ্তর সম্পাদক মশিউর রহমান মিলু, মোহসীনুল হক চৌধুরী, কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য আবু রাইয়ান আশয়ারী রছী এবং হাতিরঝিল থানার আহ্বায়ক রিয়াজ উদ্দিনসহ দলের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতৃবৃন্দ।