দক্ষিণ ভারতীয় চলচ্চিত্র জগতের অত্যন্ত জনপ্রিয় ও প্রভাবশালী সংগীত পরিচালক অনিরুদ্ধ রবিচন্দর। ‘কোলাভেরি ডি’ গানের মাধ্যমে রাতারাতি বিশ্বজুড়ে পরিচিতি পাওয়া এই শিল্পী বর্তমানে একের পর এক বড় বাজেটের সিনেমার কাজ করছেন। ‘জেলার ২’ সহ বেশ কিছু উচ্চাভিলাষী প্রজেক্ট নিয়ে আলোচনার মাঝেই এখন সংবাদমাধ্যমের মূল আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দুতে তাঁর ব্যক্তিগত জীবন। জানা গেছে, সান গ্রুপের চেয়ারম্যান কালানিধি মারানের কন্যা কাব্য মারানের সঙ্গে বিয়ের পিঁড়িতে বসতে যাচ্ছেন অনিরুদ্ধ। ভারতীয় সংবাদমাধ্যমের বিভিন্ন প্রতিবেদন অনুযায়ী, আগামী নভেম্বরেই তাঁদের বিয়ের আয়োজন করা হতে পারে।
বিয়ের এই খবরটি পুনরায় আলোচনায় এসেছে তেলেঙ্গানার মুখ্যমন্ত্রী এ রেভন্ত রেড্ডির একটি প্রকাশ্য সোশ্যাল মিডিয়া পোস্টের পর। গত ১৭ অক্টোবর কালানিধি মারান এবং তাঁর স্ত্রী কাবেরী মারানের সঙ্গে সাক্ষাতের কিছু ছবি ও ভিডিও প্রকাশ করেন মুখ্যমন্ত্রী। সেই পোস্টে তিনি তাঁদের কন্যার বিয়ের সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে আমন্ত্রণ পাওয়ার কথা উল্লেখ করেন। ধারণা করা হচ্ছে, আগামী ২১ নভেম্বর চেন্নাইয়ে এই সংবর্ধনা অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হতে পারে। এছাড়া খবর পাওয়া গেছে যে, মূল বিয়ের অনুষ্ঠানটি ১১ নভেম্বর গ্রিসে অনুষ্ঠিত হবে। তবে বিয়ের তারিখ ও অনুষ্ঠান নিয়ে এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক ঘোষণা আসেনি।
কে এই কাব্য মারান? কাব্য মারান ভারতের অন্যতম প্রভাবশালী গণমাধ্যম ব্যবসায়ী কালানিধি মারানের কন্যা। তাঁর বাবা সান টিভি নেটওয়ার্কের প্রতিষ্ঠাতা ও বর্তমান চেয়ারম্যান। টেলিভিশন সম্প্রচার, বিনোদন এবং সংবাদমাধ্যমসহ বহুমুখী ব্যবসায় বিস্তৃত এই প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম। কাব্যর মা কাবেরী মারানও সান টিভি নেটওয়ার্কের শীর্ষ পর্যায়ের ব্যবস্থাপনার সঙ্গে সক্রিয়ভাবে যুক্ত রয়েছেন।
ভারতীয় সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, কাব্য চেন্নাইয়ের স্টেলা মারিস কলেজে প্রাথমিক পড়াশোনা শেষ করেন। পরবর্তীতে তিনি যুক্তরাজ্যের ওয়ারউইক বিজনেস স্কুল থেকে ব্যবসায় প্রশাসনে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি (এমবিএ) অর্জন করেন। উচ্চশিক্ষা শেষ করার পর তিনি পারিবারিক ব্যবসায় যোগ দেন। বর্তমানে তিনি ইন্ডিয়ান প্রিমিয়ার লিগের (আইপিএল) জনপ্রিয় দল সানরাইজার্স হায়দরাবাদের সিইও হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
ক্রিকেটের মাঠে এবং খেলোয়াড় নিলামের সময় কাব্যর উপস্থিতি প্রায়ই আলোচনার জন্ম দেয়। দল পরিচালনা, খেলোয়াড় নির্বাচন এবং ফ্র্যাঞ্চাইজির গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়ায় যুক্ত থাকায় ক্রিকেটপ্রেমীদের কাছে তিনি বেশ পরিচিত। ফলে তাঁর পরিচয় এখন আর কেবল একজন ধনকুবেরের কন্যা হিসেবে সীমাবদ্ধ নেই, বরং ব্যবসা পরিচালনায় তাঁর নিজস্ব দক্ষতা ও ভূমিকা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।
সম্পদের কথা বলতে গেলে, হুরুন রিচ লিস্ট ২০২৬-এর হিসাব অনুযায়ী কালানিধি মারানের আনুমানিক সম্পদের পরিমাণ বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ২৫ হাজার কোটি টাকা। অন্যদিকে ফোর্বসের হিসাব মতে, তাঁর সম্পদের পরিমাণ ২ দশমিক ৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের বেশি। কালানিধি মারানের এই বিশাল সম্পদের প্রধান উৎস হলো সান টিভি নেটওয়ার্ক। ১৯৯৩ সালে প্রতিষ্ঠিত এই প্রতিষ্ঠানটি দক্ষিণ ভারতের অন্যতম বৃহৎ গণমাধ্যম গোষ্ঠীতে পরিণত হয়েছে। টেলিভিশন চ্যানেলের পাশাপাশি রেডিও, সংবাদপত্র, সরাসরি সম্প্রচার সেবা এবং চলচ্চিত্র সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ও প্রতিষ্ঠানটির ব্যাপক কার্যক্রম রয়েছে। ফোর্বসের তথ্য অনুযায়ী, সান টিভির চ্যানেলগুলো ভারতের প্রায় ১৪ কোটির বেশি পরিবারের কাছে পৌঁছায়।
এই বিশাল ব্যবসায়িক সাম্রাজ্যের সঙ্গে ক্রিকেটের সংযোগও অত্যন্ত গভীর। সান টিভি নেটওয়ার্কের মালিকানাধীন সানরাইজার্স হায়দরাবাদ আইপিএলের অন্যতম পরিচিত দল। ২০১২ সালে ফ্র্যাঞ্চাইজিটির মালিকানা নেওয়ার পর ২০১৩ সালে আইপিএলে যাত্রা শুরু করে এই দলটি। ক্রিকেটের জনপ্রিয়তা এবং সম্প্রচার ব্যবসার মেলবন্ধন মারান পরিবারের ব্যবসায়িক পরিচিতিকে আরও বহুগুণ বিস্তৃত করেছে।
তবে উল্লেখ্য যে, ২৫ হাজার কোটি টাকার এই সম্পদ কালানিধি মারানের আনুমানিক ব্যক্তিগত সম্পদ হিসেবে গণ্য করা হয়। পুরো অর্থকে কাব্যর নিজস্ব সম্পদ বা উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত অর্থ হিসেবে দেখানো সঠিক হবে না। কাব্যর ব্যক্তিগত সম্পদ নিয়ে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে কিছু অনুমানভিত্তিক হিসাব প্রকাশিত হলেও সেগুলোকে কোনো নিরীক্ষিত আর্থিক তথ্য হিসেবে বিবেচনা করা যায় না।
ক্রিকেটের গ্যালারি থেকে আলোচনার কেন্দ্রে আসা কাব্যর উপস্থিতি সানরাইজার্স হায়দরাবাদের খেলা চলাকালীন প্রায়ই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়। দলের প্রতি তাঁর গভীর আগ্রহ, খেলোয়াড় নিলামে সক্রিয় অংশগ্রহণ এবং ফ্র্যাঞ্চাইজির ব্যবস্থাপনায় তাঁর ভূমিকা তাঁকে ক্রীড়া জগতেও জনপ্রিয় করেছে। ভক্তদের আগ্রহের পাশাপাশি তাঁর পোশাক ও অভিব্যক্তিও মাঝেমধ্যে নেট দুনিয়ায় চর্চার বিষয় হয়ে ওঠে। আইপিএলের মতো বড় দল পরিচালনা করা কেবল পারিবারিক পরিচয়ের বিষয় নয়; এর সঙ্গে খেলোয়াড় নির্বাচন, দল গঠন, অর্থনৈতিক পরিকল্পনা ও দীর্ঘমেয়াদি ব্যবস্থাপনার মতো জটিল দায়িত্ব জড়িত। ফলে কাব্যর ক্ষেত্রে ব্যবসায়ী পরিবারের উত্তরসূরি পরিচয়ের পাশাপাশি একজন দক্ষ ক্রীড়া ব্যবস্থাপক হিসেবেও স্বতন্ত্র পরিচিতি তৈরি হয়েছে।
অন্যদিকে, ‘কোলাভেরি ডি’ থেকে দক্ষিণ ভারতের জনপ্রিয় সংগীত পরিচালক হয়ে ওঠা অনিরুদ্ধ রবিচন্দরের জীবনকাহিনীও বেশ আকর্ষণীয়। ২০১২ সালে মুক্তি পাওয়া তামিল সিনেমা ‘থ্রি’-এর ‘হোয়াই দিস কোলাভেরি ডি’ গানটি তাঁকে আন্তর্জাতিক স্তরে পরিচিতি এনে দেয়। ধানুশের গাওয়া এই গানটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক জনপ্রিয় হয়েছিল। সেই সময় থেকেই চলচ্চিত্রের সংগীতে নতুন প্রজন্মের অন্যতম প্রধান মুখ হয়ে ওঠেন অনিরুদ্ধ।
পরবর্তীতে ‘কাইথি’, ‘বেদালাম’, ‘মাস্টার’, ‘বিক্রম’, ‘জেলার’ ও ‘জওয়ান’-এর মতো জনপ্রিয় সিনেমায় সংগীত পরিচালনা করে তিনি নিজের অবস্থান অত্যন্ত শক্ত করেছেন। তামিল সিনেমার গণ্ডি পেরিয়ে বর্তমানে তেলেগু ও হিন্দি চলচ্চিত্রেও তাঁর কাজের পরিধি বিস্তৃত হয়েছে। বড় তারকাদের সিনেমায় সংগীত পরিচালনা এবং তাঁর গানগুলোর ব্যাপক জনপ্রিয়তার কারণে নির্মাতাদের কাছে তিনি বর্তমানে অত্যন্ত চাহিদাসম্পন্ন একজন সংগীত পরিচালক।