এক ম্যাচে সাতটি গোলের লড়াই! কখনো চোখের পলকে ড্রিবলিং, কখনো অবিশ্বাস্য গোল, আবার কখনো গোল করার পর অদ্ভুত হতাশা। এর সাথে যুক্ত হয়েছে লাল কার্ডের নাটকীয়তা। ফুটবলপ্রেমীদের জন্য যেন রোমাঞ্চের এক পূর্ণাঙ্গ প্যাকেজ ছিল এই ম্যাচ। আর সেই রোমাঞ্চের চূড়ান্ত হাসিটি হাসল বার্সেলোনা।

রিয়াল বেতিসকে ৫–২ গোলের বিশাল ব্যবধানে পরাজিত করে লা লিগায় নিজেদের জয়যাত্রাকে আরও বেগবান করেছে হান্সি ফ্লিকের শিষ্যরা। এই জয়টি কেবল পয়েন্ট টেবিলের লড়াই নয়, বরং ৫৮ বছর আগের এক অনন্য কীর্তিকে স্পর্শ করার সমান। লা লিগার দীর্ঘ ইতিহাসে মাত্র দ্বিতীয় দল হিসেবে মৌসুমের প্রথম ৯টি ম্যাচের সবকটিতেই জয়লাভ করল বার্সেলোনা। এর আগে ঠিক ৫৮ বছর আগে এমন এক অনন্য রেকর্ড গড়েছিল তাদের চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী ক্লাব রিয়াল মাদ্রিদ।

বর্তমান সময়ে বার্সেলোনার ফুটবল যেন এক লাগামহীন আনন্দের বহিঃপ্রকাশ। তারা গোল করছে ঠিকই, পাশাপাশি গোল হজমও করছে। তবে প্রতিপক্ষের চেয়ে বেশি গোল করার ব্যাপারে তাদের আত্মবিশ্বাসে কোনো ঘাটতি নেই। রিয়াল বেতিসের বিপক্ষে ম্যাচেও সেই একই চিত্র ফুটে উঠেছে।

খেলার মাত্র ১০ মিনিট পার হতেই জাদুর ঝলক দেখালেন তরুণ তুর্কি লামিনে ইয়ামাল। বেতিসের ফাকুন্দো বের্নালকে পায়ের কারুকাজে এমনভাবে বোকা বানালেন তিনি, যেন প্রতিপক্ষের খেলোয়াড়টিকে নিয়ে কিছুটা খেলা করছিলেন। এরপর বক্সের প্রান্ত থেকে একটি নিখুঁত বাঁকানো শটে বলটি পাঠালেন জালের ওপরের কোণায়। গোলটি যতটা সুন্দর ছিল, তার চেয়েও বেশি চোখধাঁধানো ছিল ইয়ামালের পায়ের কারুকাজ।

তবে রিয়াল বেতিস যে এত সহজে আত্মসমর্পণ করবে না, তা দ্রুতই প্রমাণিত হয়। স্বাগতিক দলের হয়ে ভালেন্তিন গোমেজ গোল করে ম্যাচটি সমতায় ফিরিয়ে আনেন।

এরপরই বার্সেলোনা তাদের আক্রমণের ঝড় তোলে এবং ৩–১ ব্যবধানে এগিয়ে যায়। এই ম্যাচে ক্লাবের হয়ে নিজের প্রথম গোলটি করার কৃতিত্ব অর্জন করেন রদ্রি। এরপর স্কোরবোর্ডে নিজের নাম লেখান গ্যাব্রিয়েল জেসুস।

কিন্তু ম্যাচের নাটকীয়তা এখানেই শেষ ছিল না। একসময় বার্সেলোনার হয়ে খেলা এজ আবদে গোল করে ব্যবধান কমিয়ে আনেন ৩–২-এ। এই গোলের পর বেতিস সমর্থকদের মনে নতুন করে আশার আলো জাগে। দুই দলের আক্রমণ ও পাল্টা আক্রমণে ম্যাচের উত্তেজনা পৌঁছে যায় তুঙ্গে।

তবে বিরতির পর বেতিসের সেই আশার আলো নিভে যায়। সরাসরি লাল কার্ড দেখে মাঠ ছাড়েন বের্নাল। ফলে স্বাগতিক দল ১০ জনের দলে পরিণত হয়। আর এমন সুযোগ হাতছাড়া করার মতো দল যে হান্সি ফ্লিকের বার্সেলোনা নয়, তা খুব দ্রুতই বোঝা গেল।

বদলি খেলোয়াড় হিসেবে মাঠে নেমে গোল করেন এরিক গার্সিয়া ও দানি ওলমো। এই দুই গোলের পর বেতিসের ঘুরে দাঁড়ানোর শেষ আশাটুকুও শেষ হয়ে যায়। শেষ পর্যন্ত ৫–২ গোলের বড় জয় নিয়ে মাঠ ছাড়ে বার্সেলোনা।

এত বড় জয়ের মাঝেও কোচ হান্সি ফ্লিকের জন্য চিন্তার একটি বড় কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে দলের রক্ষণভাগ। আক্রমণে বার্সেলোনা যতটা ভয়ংকর হয়ে উঠেছে, রক্ষণে তারা মাঝেমধ্যেই নড়বড়ে হয়ে পড়ছে। বেতিসের বিপক্ষেও তাদের দুই গোল হজম করতে হয়েছে। শক্তিশালী প্রতিপক্ষের সামনে এই রক্ষণাত্মক দুর্বলতা যে বড় বিপদ ডেকে আনতে পারে, তা নিশ্চয়ই কোচ ফ্লিকের অজানা নয়।

তবে আপাতত এই সব দুশ্চিন্তাকে আড়াল করে দিচ্ছে বার্সেলোনার বিধ্বংসী আক্রমণভাগ। মৌসুমের প্রথম ৯টি ম্যাচে তারা ৯টি জয়ই পেয়েছে এবং অবিশ্বাস্যভাবে ৩৯টি গোল করেছে। অর্থাৎ ম্যাচপ্রতি গড়ে ৪টিরও বেশি গোল করার অনন্য রেকর্ড গড়েছে তারা।

টানা তৃতীয়বারের মতো লা লিগার শিরোপা জয়ের লক্ষ্যে এখন তীব্র লড়াই করছে বার্সেলোনা। এখন প্রশ্ন উঠেছে, তাদের এই দুরন্ত ছুটে চলা থামাবে কে?

এখন পর্যন্ত মাঠের পারফরম্যান্স যা বলছে, তাতে এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজে পাওয়া কঠিন। বরং মনে হচ্ছে, বার্সেলোনাকে থামানোর চেয়ে তাদের করা গোলের হিসাব রাখাই প্রতিপক্ষের জন্য এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।