জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে পরপর দুই দিন ‘গরুভোজের’ আয়োজন করা হয়েছে, যা নিয়ে ক্যাম্পাস ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ব্যাপক আলোচনা ও বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। প্রথম দিনের আয়োজনের পর দ্বিতীয় দিনে বাংলাদেশ খেলাফত ছাত্র মজলিসের জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় শাখা এই কর্মসূচির আয়োজন করে। আজ শনিবার সকালে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের ভবন ও গণিত বিভাগের মধ্যবর্তী সড়কে গরু জবাই করা হয়। এরপর বেলা সাড়ে তিনটার দিকে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের সামনে গরুর মাংসের তেহারি বিতরণ করা হয়। এছাড়া রাতে ক্যাম্পাসে একটি কাওয়ালি অনুষ্ঠানের পরিকল্পনা করেছে এই ছাত্রসংগঠনটি।
তবে দুর্গাপূজার মতো সনাতন ধর্মাবলম্বীদের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব চলাকালীন এভাবে পর পর দুই দিন ঘটা করে ‘গরুভোজের’ আয়োজন করার যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন অনেকে। বিশেষ করে ধর্মীয় সংবেদনশীলতার কথা বিবেচনা করে এই ধরনের আয়োজনের timing নিয়ে সমালোচনা করা হচ্ছে।
শনিবারের আয়োজনের বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন প্রথমে অনুমতি দিতে রাজি হয়নি। তবে পরবর্তীতে কিছু শর্ত সাপেক্ষে তাদের অনুমতি দেওয়া হয়। গরুভোজের আয়োজকদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, এই কর্মসূচিতে অংশ নিতে শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে জনপ্রতি ৪০ টাকা করে নিবন্ধন ফি নেওয়া হয়েছে। মোট ৮৫ হাজার টাকা দিয়ে একটি গরু কেনা হয়। আজ বেলা সাড়ে তিনটা থেকে সাড়ে পাঁচটা পর্যন্ত তারা খাবার বিতরণ করেন। আয়োজকদের দাবি, সনাতন ধর্মাবলম্বী শিক্ষার্থীদের জন্য আলাদাভাবে খাসির মাংসের কাচ্চির ব্যবস্থাও করা হয়েছিল।
এর আগে গতকাল শুক্রবার সকালে একই স্থানে অর্থাৎ উপাচার্যের ভবন ও গণিত বিভাগের মধ্যবর্তী সড়কে ‘জবিয়ানদের গরুভোজ’ কর্মসূচির অংশ হিসেবে গরু জবাই করা হয়। এরপর শিক্ষার্থীদের মধ্যে খিচুড়ি ও গরুর মাংস বিতরণ করা হয়। এই আয়োজনের দায়িত্বে ছিল জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় শিক্ষার্থী সংসদ (জকসু)। উল্লেখ্য, জকসুর নির্বাচিত কমিটির ভিপি, জিএসসহ অধিকাংশ সদস্য ইসলামী ছাত্রশিবিরের নেতা। জকসুর একদিন পরেই ইসলামপন্থী দল বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের ছাত্রসংগঠন পুনরায় এই আয়োজন করে।
খেলাফত ছাত্র মজলিসের জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সদস্যসচিব ওবায়দুল ইসলাম মুক্তকণ্ঠকে জানান, তারা ছয় শতাধিক মানুষের জন্য এই আয়োজন করেছেন। তিনি দাবি করেন, “এটি প্রতিবাদী আন্দোলন। বিশ্ববিদ্যালয়ের সব ধর্ম ও মতের শিক্ষার্থীর সৌহার্দ্য ও সম্প্রীতি বজায় রাখার লক্ষ্যে গরুভোজ ও কাওয়ালির আয়োজন করা হয়েছে।”
বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক আজম খান মুক্তকণ্ঠকে বলেন, “শুক্রবারের আয়োজনে আপত্তি থাকলেও সেদিনের পরিবেশ যথেষ্ট ভালো ছিল। সবকিছু সুন্দরভাবে সম্পন্ন হয়েছে। খেলাফত ছাত্র মজলিসকে শনিবারের আয়োজনের বিষয়ে প্রথমে অনুমতি দিতে চায়নি প্রশাসন। পরে শর্ত সাপেক্ষে অনুমতি দেওয়া হয়েছে।”
এদিকে শুক্রবারের ‘গরুভোজ’ আয়োজনের পর শনিবার সকালে লেখক ও গবেষক মহিউদ্দিন আহমদ ফেসবুকে ব্যঙ্গাত্মক পোস্ট করেন। তিনি লেখেন, “জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে ঘটা করে গরু জবাইয়ের তাৎপর্য অপরিসীম। শিগগিরই জাতি এটা বুঝতে পারবে।”
এই আয়োজনের মাধ্যমে কী কী অর্জন হলো—তা তিনি তিনটি পয়েন্টে ব্যঙ্গ করে তুলে ধরেন। প্রথমত, তিনি বলেন, “এটি আমাদের ইতিহাসের সেরা একাডেমিক অর্জন, যা আন্তর্জাতিক র্যাংকিংয়ে এই বিশ্ববিদ্যালয়কে সেরা পাঁচের মধ্যে নিয়ে যাবে। সারা দুনিয়া আমাদের চিনবে। গর্বে আমার বুক ফুলে উঠছে।” দ্বিতীয়ত, “খোলাফায়ে রাশেদিনের পর বিশ্বে ইসলামের ঝান্ডা এমনভাবে আর কেউ তুলে ধরেনি। ইসলামের এত বড় বিজয়ে মুসলিম উম্মা উজ্জীবিত হবে।” তৃতীয়ত, “আমরা যে একটি স্বাধীন দেশ, গরু জবাইয়ের মাধ্যমে আবারও প্রমাণিত হলো। এত দিন আমরা সত্যিকার স্বাধীনতার স্বাদ পাইনি। বিশ্ববিদ্যালয়ে গরু জবাই করতে না পারলে আবার কিসের স্বাধীনতা!”
বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক নাসির উদ্দীন আহমেদ মুক্তকণ্ঠকে বলেন, অতীতে এই ক্যাম্পাসে গরু জবাই, কোরবানির কাজ এবং পূজাও অনুষ্ঠিত হয়েছে। তাঁর মতে, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন বিজ্ঞপ্তি দেওয়াতেই মূল সমস্যা তৈরি হয়েছে। তিনি মনে করেন, অহেতুক সাম্প্রদায়িক ভাবনা বা উত্তেজনা তৈরির কোনো কারণ নেই।
অন্যদিকে, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদলের সদস্যসচিব শামসুল আরেফিন মুক্তকণ্ঠকে বলেন, কোনো উসকানি না দিয়ে সবার সহমত ও সহযোগিতার মাধ্যমে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। তিনি মনে করেন, সনাতন ধর্মাবলম্বীদের সবচেয়ে বড় উৎসবের সময় এমন আয়োজন করার আগে সবার ভাবা উচিত ছিল, কারণ সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তার বিষয়ে সবার দায়িত্ব রয়েছে।
সমাজতান্ত্রিক ছাত্র ফ্রন্টের জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় শাখা সভাপতি ইভান তাহসীভ মুক্তকণ্ঠকে বলেন, ঈদে গরু জবাই করা স্বাভাবিক। কিন্তু অন্য একটি ধর্মের উৎসবের সময় গরু জবাই করে নিজেদের প্রশ্নবিদ্ধ করা হয়েছে। তিনি মনে করেন, ব্যক্তিস্বাধীনতার দোহাই দিয়ে ক্যাম্পাসে উত্তেজনা সৃষ্টি করে রাজনীতি করা কাম্য নয়।
উল্লেখ্য, গত ১২ অক্টোবর রাতে বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগের ২০২১-২২ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থীরা ক্যাম্পাসের মুক্তমঞ্চের কাছে গরুর মাংসের খিচুড়ি রান্নার আয়োজন করেছিলেন। ওই স্থানের খুব কাছেই বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মন্দির অবস্থিত। রান্নার এই আয়োজন নিয়ে আপত্তি জানান কয়েকজন সনাতন ধর্মাবলম্বী শিক্ষার্থী। তাঁদের অভিযোগ, মন্দিরের সামনে গরুর মাংস রান্না করায় তাঁদের ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত লেগেছে এবং রান্নার চুলা তৈরিতে মন্দিরের ইট ব্যবহার করা হয়েছে। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে সনাতন ধর্মাবলম্বী শিক্ষার্থীরা ক্যাম্পাসে বিক্ষোভ করেন।
এর পরিপ্রেক্ষিতে ১৪ অক্টোবর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর দপ্তর থেকে জনস্বাস্থ্য সুরক্ষা ও পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখার কথা বলে ক্যাম্পাসে পশু জবাই থেকে বিরত থাকার নির্দেশনা দিয়ে একটি বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়। এতে বলা হয়, নির্দেশনা অমান্য করলে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের গণবিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এই বিজ্ঞপ্তির প্রতিবাদে গত বুধবার রাতে জকসু ক্যাম্পাসে বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ করে। তারা বিজ্ঞপ্তি প্রত্যাহার, প্রকাশ্যে দুঃখ প্রকাশ, ঘটনার তদন্ত, ক্যাফেটেরিয়ায় গরু ও খাসির মাংসের ব্যবস্থা এবং ক্যাম্পাসে ধর্মীয় সম্প্রীতি নিশ্চিত করার চার দফা দাবি জানায়।
পরবর্তীতে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন একটি আনুষ্ঠানিক বিবৃতির মাধ্যমে জানায়, ক্যাম্পাসে পশু জবাইসহ যেকোনো অনুষ্ঠান আয়োজনের অধিকার সবার রয়েছে। তবে কোনো আয়োজন যেন অন্যের কার্যক্রমে বাধা সৃষ্টি না করে, সে বিষয়ে সবাইকে সচেতন থাকতে হবে। বিবৃতিতে আরও বলা হয়, সাম্প্রতিক পরিস্থিতিতে অনাকাঙ্ক্ষিত উত্তেজনা ও ধর্মীয় সম্প্রীতির অবনতি এড়ানোর উদ্দেশ্যে প্রক্টরের পক্ষ থেকে পশু জবাই থেকে বিরত থাকার অনুরোধ জানানো হয়েছিল। ওই অনুরোধের ফলে ভুল-বোঝাবুঝি তৈরি হওয়ায় প্রশাসন দুঃখ প্রকাশ করে।