জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে পশু জবাই নিষিদ্ধ করে প্রশাসনের দেওয়া এক বিজ্ঞপ্তির প্রতিবাদ জানাতে গরু জবাই করে ভোজের আয়োজন করেছেন একদল শিক্ষার্থী। আজ শুক্রবার সকালে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের ভবন এবং গণিত বিভাগের মধ্যবর্তী সড়কে পূর্বঘোষিত ‘জবিয়ানদের গরুভোজ’ কর্মসূচির অংশ হিসেবে এই গরু জবাই করা হয়। আয়োজকদের দেওয়া ঘোষণা অনুযায়ী, দুপুরের পর থেকে শিক্ষার্থীদের মাঝে খিচুড়ি ও গরুর মাংস বিতরণ করা হবে।

ঘটনার সূত্রপাত হয় ক্যাম্পাসের মুক্তমঞ্চের নিকটবর্তী স্থানে গরুর মাংসের খিচুড়ি রান্না করাকে কেন্দ্র করে তৈরি হওয়া এক বিতর্কের পর। ওই ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ক্যাম্পাসে পশু জবাই থেকে বিরত থাকার বিষয়ে একটি বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে। প্রশাসনের এই সিদ্ধান্তের পর শিক্ষার্থীদের একটি অংশ ক্ষোভ প্রকাশ করেন। এর প্রতিবাদে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় শিক্ষার্থী সংসদ (জকসু) বিক্ষোভ ও সমাবেশের আয়োজন করে। এরই ধারাবাহিকতায় শুক্রবার গরু জবাই করে ভোজের কর্মসূচি ঘোষণা করেন শিক্ষার্থীরা। উল্লেখ্য, জকসুর নির্বাচিত কমিটির ভিপি, জিএসসহ অধিকাংশ সদস্য ইসলামী ছাত্রশিবিরের নেতা।

এই ‘গরুভোজ’ কর্মসূচির জন্য গতকাল বৃহস্পতিবার এক লাখ ২৫ হাজার টাকা দিয়ে একটি গরু কেনা হয়। কর্মসূচিতে সবাইকে উপস্থিত থাকার আমন্ত্রণ জানান জকসুর সহসাধারণ সম্পাদক (এজিএস) মাসুদ রানা। তিনি জানান, শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে নেওয়া নিবন্ধন ফি এবং দেশ-বিদেশের বিভিন্ন ব্যক্তির অনুদানের অর্থ দিয়ে গরুটি কেনা হয়েছে।

বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় যখন গরুটি ক্যাম্পাসে আনা হয়, তখন আয়োজকেরা আনন্দমিছিল করেন। এসময় গরু খাওয়ার অধিকার এবং প্রশাসনের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে বিভিন্ন স্লোগান দেওয়া হয়। শিক্ষার্থীরা এই পুরো আয়োজনকে প্রশাসনের পূর্ববর্তী বিজ্ঞপ্তির একটি প্রতিবাদ হিসেবে বর্ণনা করেছেন।

বিষয়টি জানতে চাওয়া হলে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর (অতিরিক্ত দায়িত্ব) অধ্যাপক আজম খান বলেন, ‘আমরা শান্তি-শৃঙ্খলা রক্ষার জন্য গরু জবাই নিয়ে সিটি করপোরেশনের বিজ্ঞপ্তিটা নোটিশ আকারে দিয়েছিলাম। প্রশাসনের অনুমতি নিয়ে মার্জিত ও সুশৃঙ্খলভাবে গরুভোজ কর্মসূচি আয়োজন করা হলে কোনো আপত্তি থাকবে না।’

পুরো ঘটনার সূত্রপাত হয় ১২ অক্টোবর রাতে। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগের ২০২১-২২ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থীরা তাদের অনার্স শেষ করার উপলক্ষ হিসেবে ক্যাম্পাসের মুক্তমঞ্চের কাছে গরুর মাংসের খিচুড়ি রান্নার আয়োজন করেন। ওই স্থানের খুব কাছেই বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মন্দির অবস্থিত। রান্নার এই আয়োজন নিয়ে আপত্তি জানান কয়েকজন সনাতন ধর্মাবলম্বী শিক্ষার্থী। তাঁদের অভিযোগ ছিল, মন্দিরের সামনে গরুর মাংস রান্না করায় তাঁদের ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত লেগেছে। পাশাপাশি রান্নার চুলা তৈরির জন্য মন্দিরের ইট ব্যবহার করার অভিযোগও ওঠে। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে সনাতন ধর্মাবলম্বী শিক্ষার্থীরা ক্যাম্পাসে বিক্ষোভ প্রদর্শন করেন।

অন্যদিকে, আয়োজক শিক্ষার্থীরা দাবি করেন যে, প্রথমে তাঁদের রান্নার পরিকল্পনা ছিল বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাফেটেরিয়ায়। কিন্তু গ্যাসের চাপ কম থাকায় তাঁরা বিকল্প হিসেবে কাঠের চুলায় রান্নার উদ্যোগ নেন। পরবর্তীতে ইটগুলো মন্দিরের বলে জানতে পেরে সেগুলো সরিয়ে ফেলেন এবং ক্যাফেটেরিয়া থেকে লোহার চুলা নিয়ে আসেন। তাঁরা এই অনিচ্ছাকৃত ভুলের জন্য দুঃখ প্রকাশও করেন।

বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, প্রক্টরের হস্তক্ষেপে তাৎক্ষণিকভাবে বিষয়টির সমাধান করা হয়েছিল এবং পরদিন সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর মধ্যে আলোচনাও হয়। তবে ঘটনাটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর এ নিয়ে ব্যাপক আলোচনা ও পাল্টাপাল্টি বক্তব্য সামনে আসে।

এরই পরিপ্রেক্ষিতে ১৪ অক্টোবর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর দপ্তর থেকে ক্যাম্পাসে পশু জবাই থেকে বিরত থাকার নির্দেশনা দিয়ে একটি বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়। বিজ্ঞপ্তিতে জনস্বাস্থ্য সুরক্ষা, পরিচ্ছন্নতা ও স্বাস্থ্যসম্মত পরিবেশ বজায় রাখার কথা উল্লেখ করা হয়। পাশাপাশি নির্দেশনা অমান্য করলে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের গণবিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলা হয়।

প্রশাসনের এই বিজ্ঞপ্তির পর অনেক শিক্ষার্থী অভিযোগ করেন যে, পশু জবাই বন্ধের নির্দেশনার মাধ্যমে প্রশাসন শিক্ষার্থীদের খাদ্যাভ্যাস ও সাংস্কৃতিক চর্চার অধিকারে হস্তক্ষেপ করেছে। এই বিজ্ঞপ্তির প্রতিবাদে বুধবার রাতে ক্যাম্পাসে বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ করে জকসু। ওই সমাবেশ থেকে বিজ্ঞপ্তি প্রত্যাহার, প্রকাশ্যে দুঃখ প্রকাশ, ঘটনার তদন্ত, ক্যাফেটেরিয়ায় গরু ও খাসির মাংসের ব্যবস্থা এবং ক্যাম্পাসে ধর্মীয় সম্প্রীতি নিশ্চিত করার চার দফা দাবি জানানো হয়।

জকসুর নেতারা প্রশাসনকে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে দুঃখ প্রকাশের আহ্বান জানান এবং একই সঙ্গে শুক্রবার গরু জবাই করে ভোজের আয়োজন করার ঘোষণা দেন। এই কর্মসূচিতে অংশ নেওয়ার জন্য শিক্ষার্থীদের ৭০ টাকা নিবন্ধন ফি নির্ধারণ করা হয়েছিল।

বিজ্ঞপ্তি নিয়ে সমালোচনার পর বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন তাদের অবস্থান স্পষ্ট করে। জনসংযোগ, তথ্য ও প্রকাশনা দপ্তরের মাধ্যমে দেওয়া এক বিবৃতিতে প্রশাসন জানায়, ক্যাম্পাসে পশু জবাইসহ যেকোনো অনুষ্ঠান আয়োজনের অধিকার সবার রয়েছে। তবে কোনো আয়োজন যেন অন্যের অনুষ্ঠান বা কার্যক্রমে বাধা সৃষ্টি না করে, সে বিষয়ে সবাইকে সচেতন থাকতে হবে। বিবৃতিতে আরও বলা হয়, সাম্প্রতিক পরিস্থিতিতে অনাকাঙ্ক্ষিত উত্তেজনা ও ধর্মীয় সম্প্রীতির অবনতি এড়ানোর উদ্দেশ্যে প্রক্টরের পক্ষ থেকে পশু জবাই থেকে বিরত থাকার অনুরোধ জানানো হয়েছিল। ওই অনুরোধের ফলে ভুল–বোঝাবুঝি তৈরি হওয়ায় প্রশাসন দুঃখ প্রকাশ করে। তবে প্রশাসনের এই ব্যাখ্যার পরও জকসু তাদের ঘোষিত ‘গরুভোজ’ কর্মসূচি অব্যাহত রাখে।