জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের অস্থায়ী মন্দিরের সন্নিকটে একটি বিভাগের শিক্ষার্থীদের গরুর মাংসের খিচুড়ি রান্না করাকে কেন্দ্র করে সম্প্রতি তীব্র বিতর্ক দানা বেঁধেছিল। স্নাতক শেষ করা উপলক্ষে ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগের শিক্ষার্থীরা এই ভোজের আয়োজন করেছিলেন। তবে মন্দিরের পাশে রান্না করা এবং চুলা তৈরির জন্য মন্দিরের ইট ব্যবহারের অভিযোগ ওঠে। বিষয়টি সামনে আসার পর আয়োজকেরা দ্রুত ইট সরিয়ে নেন এবং নিজেদের অনিচ্ছাকৃত ভুলের জন্য আন্তরিক দুঃখ প্রকাশ করেন। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের দাবি অনুযায়ী, আলোচনার মাধ্যমে এই সমস্যার তাৎক্ষণিক সমাধান করা সম্ভব হয়েছিল।

সাধারণত এখানেই ঘটনার সমাপ্তি হওয়া উচিত ছিল। কিন্তু বিষয়টিকে কৌশলে ‘গরুর মাংস খাওয়ার অধিকার’-এর আন্দোলনে রূপান্তর করা হয়। ইসলামী ছাত্রশিবিরের নেতৃত্বে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় শিক্ষার্থী সংসদ (জকসু) বিক্ষোভ প্রদর্শন করে এবং ক্যাম্পাসে গরু জবাই ও ভোজের ঘোষণা দেয়। যদিও প্রশাসন জনস্বাস্থ্য ও পরিচ্ছন্নতার দোহাই দিয়ে পশু জবাই থেকে বিরত থাকার নির্দেশনা দিয়েছিল, তবে পরবর্তীতে তারা দুঃখ প্রকাশ করে নিজেদের অবস্থান পরিবর্তন করে। শেষ পর্যন্ত শুক্রবার সেই ঘোষিত কর্মসূচি পালিত হয়।

বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের দায়িত্ব ছিল সবার জন্য সমান ও স্পষ্ট নিয়মাবলি নির্ধারণ করা। ক্যাম্পাসের কোথায় পশু জবাই করা যাবে, কোথায় রান্না হবে কিংবা উপাসনালয়ের পবিত্র পরিবেশ কীভাবে রক্ষা করা হবে—এসব বিষয় আলোচনার মাধ্যমে আগেই নির্দিষ্ট করা যেত। কিন্তু অস্পষ্ট নির্দেশনা দিয়ে পরবর্তীতে রাজনৈতিক চাপের মুখে পিছু হটার মাধ্যমে প্রশাসন একটি ভুল বার্তা দিয়েছে: এখানে যুক্তির চেয়ে রাজনৈতিক চাপ অনেক বেশি কার্যকর।

ঘটনা এখানেই শেষ নয়। শনিবার পুনরায় গরু জবাই, ভোজ ও কাওয়ালি অনুষ্ঠানের ঘোষণা দেওয়া হয়। তবে এবারের আয়োজনটি জকসুর নয়, বরং বাংলাদেশ খেলাফত ছাত্র মজলিসের বিশ্ববিদ্যালয় শাখার। প্রক্টরের ভাষ্যমতে, শুরুতে অনুমতি না দিলেও সংগঠনটির একজন নেতা উপাচার্যকে ফোন করার পর শর্তসাপেক্ষে অনুমতি দেওয়া হয়। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের এই অসহায়ত্ব স্পষ্ট। যে নির্দেশনা তারা নিজেরাই দিয়েছিলেন, তা কার্যকর করার বদলে চাপের মুখে তার ব্যাখ্যা বদলাতে হলো। রাজনৈতিক নেতার একটি ফোন কললেই মিলল নতুন আয়োজনের অনুমতি। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ যেন আক্ষরিক অর্থেই ‘ঠুঁটো জগন্নাথ’ হয়ে রইল।

এখানে দুটি ভিন্ন বিষয়কে এক করে ফেলা হয়েছে—গরুর মাংস খাওয়ার স্বাধীনতা এবং মন্দিরের পাশে আয়োজনের প্রতি আপত্তি। কেউ গরুর মাংস খান বলেই তিনি সাম্প্রদায়িক হয়ে যান না। আবার মন্দিরের পাশে রান্না নিয়ে আপত্তি জানালেই ধরে নেওয়া যায় না যে তিনি অন্যের খাদ্যাভ্যাসের স্বাধীনতা কেড়ে নিতে চাইছেন।

আপত্তির কারণ এবং পরিস্থিতি বিবেচনা করা জরুরি। যাঁরা শুরুতে রান্না করেছিলেন, তাঁরা ভুল বুঝতে পেরে দুঃখ প্রকাশ করেছেন। তবে সেই সমাধান মেনে না নিয়ে বারবার গরু জবাইয়ের কর্মসূচি ঘোষণার প্রয়োজনীয়তা কোথায়? প্রশ্নটি তখন আর খাবারের থাকে না; বরং কার ইচ্ছায় ক্যাম্পাস চলবে, সেই ক্ষমতা প্রদর্শনের লড়াই হয়ে দাঁড়ায়।

বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের দায়িত্ব ছিল স্পষ্ট ও সমানভাবে প্রযোজ্য নিয়ম নির্ধারণ করা। ক্যাম্পাসে কোথায় পশু জবাই করা যাবে, কোথায় রান্না হবে, উপাসনাস্থলের পরিবেশ কীভাবে বজায় রাখা হবে—এসব আলোচনার মাধ্যমে ঠিক করা যেত। কিন্তু অস্পষ্ট নির্দেশনা দিয়ে পরে রাজনৈতিক চাপে পিছু হটা সবাইকে ভুল বার্তা দেয়: যুক্তির চেয়ে চাপ বেশি কার্যকর।

২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পরবর্তী সময়ে ‘জিয়াফত’ নামে গরু জবাইয়ের কর্মসূচি আমরা আগেও প্রত্যক্ষ করেছি। ২০২৪ সালের নভেম্বরে মুক্তকণ্ঠ কার্যালয়ের সামনেই এমন একটি কর্মসূচি পালিত হয়েছিল। সেখানে সংবাদমাধ্যমের বিরুদ্ধে অভিযোগ বা প্রতিবাদের পরিবর্তে গরু জবাইকে রাজনৈতিক কর্মসূচিতে রূপ দেওয়া হয়। বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়েও এই প্রবণতা দেখা গেছে। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে রাকসুর সাধারণ সম্পাদক সালাহউদ্দিন আম্মারের নেতৃত্বে ‘বাকশাল’ নাম দেওয়া গরু জবাই করে ‘জুলাই জিয়াফত’ পালন করা হয়েছে।

প্রতিটি গরু জবাইয়ের উদ্দেশ্য এক নয়। তবে প্রতিপক্ষকে চিহ্নিত করে উত্তেজনার মধ্যে গরু জবাইকে রাজনৈতিক প্রতীকে পরিণত করার এই প্রবণতাকে নিছক খাওয়াদাওয়া বা নিরীহ প্রতিবাদ বলা যায় না। এর মাধ্যমে বিদ্বেষ ও বিভক্তি তৈরি করে রাজনৈতিক ফায়দা নেওয়ার পথ প্রশস্ত হয়। এখানে খাবার কেবল একটি উপলক্ষ; মূল লক্ষ্য হলো ক্ষমতা ও আধিপত্য প্রদর্শন করা।

সম্প্রতি রবীন্দ্রনাথের ছবিতে কালি দেওয়ার ঘটনা নিয়ে বিতর্ক, সাতক্ষীরায় ধর্ম অবমাননার অভিযোগে পিটিয়ে মানুষ হত্যা এবং দুর্গাপূজার সময়ে একের পর এক গরু জবাইয়ের কর্মসূচি—এই ঘটনাগুলো এক নয় এবং এর সাথে জড়িত ব্যক্তিরাও ভিন্ন। তবে এই ঘটনাগুলোর মধ্যে একটি সাধারণ মিল লক্ষণীয়: আমাদের সামাজিক ও রাজনৈতিক মূল্যবোধ দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে, অসহিষ্ণুতা বাড়ছে এবং ভিন্নতা ও বৈচিত্র্যের সাথে সহাবস্থানের যে সংস্কৃতি ছিল, তা সংকুচিত হয়ে আসছে।

কয়েক বছর আগে কলকাতায় পশ্চিমবঙ্গের প্রবীণ বামপন্থী নেতা বিকাশরঞ্জন ভট্টাচার্যসহ কয়েকজন বিশিষ্ট ব্যক্তি প্রকাশ্যে গরুর মাংস খেয়েছিলেন। একজন ব্রাহ্মণের গরুর মাংস খাওয়ার ঘটনাটি সেখানে ব্যাপক বিতর্কের সৃষ্টি করেছিল। বিকাশরঞ্জন ভট্টাচার্য পরে একাধিকবার বলেছেন, “ধর্মীয় অসহিষ্ণুতা ও সংখ্যালঘু মুসলমানদের খাদ্যাভ্যাসে হস্তক্ষেপের বিরুদ্ধে এটা ছিল একটি প্রতিবাদী কর্মসূচি।” হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠ ভারতে তাঁর এই প্রতিবাদকে ‘সাহসী’ ও ‘প্রথাবিরোধী’ না বলে উপায় নেই।

কিন্তু বাংলাদেশের পরিস্থিতি ভারতের ঠিক বিপরীত। এখানে সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ মুসলমান। বাজারে, সুপার শপে দেদার গরুর মাংস বিক্রি হয়। হোটেল, রেস্তোরাঁ ও ক্যানটিনে প্রতিদিন গরুর মাংস খাওয়া হয়। গরুর মাংস খাওয়া নিয়ে এখানে কোনো বাধা নেই। সামান্য যে সংবেদনশীলতা থাকে, তা মূলত অন্য ধর্মাবলম্বীদের প্রতি সম্মান ও সহনশীলতা থেকে তৈরি। সংখ্যালঘুদের প্রতি সহনশীলতার ক্ষেত্রে ভারতের সাথে বাংলাদেশের এই মৌলিক পার্থক্যটি ছিল।

তবে আমাদের দেশের কিছু রাজনৈতিক গোষ্ঠী ধর্মীয় আবেগকে পুঁজি করে এই সহনশীলতা বা বিবেচনাবোধ মুছে ফেলতে চাইছে। তারা সংখ্যাগরিষ্ঠের স্বাভাবিক খাদ্যাভ্যাসকে ‘বিপন্ন অধিকার’ হিসেবে উপস্থাপন করছে এবং সেই কাল্পনিক বিপদের বিরুদ্ধে শক্তি প্রদর্শন করছে।

এই প্রেক্ষাপটে ভারতের ‘গোরক্ষকদের’ রাজনীতির উল্টো পিঠ হয়ে উঠছেন জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকাশ্যে গরু জবাইকারীরা। ভারতে গোরক্ষকেরা গরুর মাংস খেতে বাধা দেয়, আর বাংলাদেশে এই গরু জবাইকারীরা বিশেষ পরিস্থিতিতে গরু খাওয়ার প্রদর্শনী করে। কাজের ধরন বিপরীত হলেও সংখ্যাগরিষ্ঠের ধর্মীয় আবেগ ব্যবহার করে সংখ্যালঘুকে চাপে রাখার রাজনৈতিক কৌশলে দারুণ মিল রয়েছে।

নিজের ধর্মকে শ্রেষ্ঠ মনে করা ব্যক্তিগত বিশ্বাসের বিষয়। কিন্তু সেই বিশ্বাস দিয়ে অন্যের মর্যাদা, নিরাপত্তা ও সমান অধিকার খর্ব করা যায় না। কেউ যদি ভারতে হিন্দুত্ববাদীদের বিদ্বেষ ও বিভাজনের রাজনীতির সত্যিকারের বিরোধী হন, তবে তাঁকে বাংলাদেশেও একই ধরনের রাজনীতির বিরোধিতা করতে হবে। সীমান্তের ওপারের সংখ্যালঘুদের জন্য সমান অধিকার চাওয়া এবং নিজের দেশের সংখ্যালঘুদের অস্বস্তিতে ও চাপে রাখা—এটি অত্যন্ত স্ববিরোধী ও অসৎ অবস্থান।

সম্প্রতি রবীন্দ্রনাথের ছবিতে কালি দেওয়ার ঘটনা নিয়ে সৃষ্ট বিতর্ক, সাতক্ষীরায় ধর্ম অবমাননার অভিযোগে মানুষ পিটিয়ে হত্যা এবং দুর্গাপূজার সময় একের পর এক গরু জবাইয়ের কর্মসূচি—এ ঘটনাগুলো একই রকম নয়, দায়ী ব্যক্তিরাও একই নন। কিন্তু এ ঘটনাগুলোর মধ্যে যে মিল লক্ষণীয় তা হলো: আমাদের সামাজিক–রাজনৈতিক মূল্যবোধ খুব দ্রুত পাল্টাচ্ছে, অসহিষ্ণুতা বাড়ছে এবং ভিন্নতা ও বৈচিত্র্যসহ সহাবস্থানের যে সংস্কৃতি ছিল, তা দারুণভাবে সংকুচিত হচ্ছে।

— মনজুরুল ইসলাম, মুক্তকণ্ঠ-র জ্যেষ্ঠ সহসম্পাদক। (মতামত লেখকের নিজস্ব)