শারদীয় দুর্গোৎসব কেবল দেবী দুর্গার আরাধনা নয়; এটি অশুভ শক্তির বিনাশ, শুভশক্তির বিজয় এবং অসাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির এক অনন্য উৎসব। শরতের স্নিগ্ধতায় মণ্ডপে মণ্ডপে যখন দেবী দুর্গার আগমনী বার্তা, তখন ফরিদপুর শহরের বান্ধব পল্লির দুর্গামণ্ডপ সেজেছে প্রকৃতির অনন্য রূপে। পাটখড়ির গাছে বাবুই পাখির বাসা, অরণ্যের আবহে দেব-দেবী ও পরীর উপস্থিতি এবং দোলনায় শিব-পার্বতী সব মিলিয়ে মণ্ডপটি যেন হয়ে উঠেছে এক টুকরা গহিন বন।
‘গাছ লাগান, পরিবেশ বাঁচান, প্রকৃতির ভারসাম্য রক্ষা করুন’ এই বার্তাকে সামনে রেখে ফরিদপুর শহরের আলীপুর মহল্লার হরিজন সম্প্রদায় অধ্যুষিত বান্ধব পল্লিতে ব্যতিক্রমী এই আয়োজন করেছেন একদল তরুণ। গত দুই মাসের নিরলস পরিশ্রমে তাদের নিজস্ব হাতে তৈরি হয়েছে এই প্রকৃতিনির্ভর সাজসজ্জা। বাণিজ্যিক ডেকোরেটরের ওপর নির্ভর না করে নিজেদের শ্রম, সৃজনশীলতা ও ধর্মীয় আবেগকে কাজে লাগিয়ে তারা ফুটিয়ে তুলেছেন এক ভিন্নধর্মী পূজামণ্ডপ।
দুর্গামণ্ডপে গিয়ে দেখা যায়, মূল ফটক থেকে মন্দির পর্যন্ত সারি সারি পাটখড়ির তৈরি গাছ। প্রায় ১০০ মিটার পথজুড়ে তৈরি করা হয়েছে অরণ্যের আবহ। মন্দির প্রাঙ্গণে রয়েছে ১৪টি কৃত্রিম গাছ, যেগুলোতে ব্যবহার করা হয়েছে সবুজ রঙের পাতা। গাছের ডালে ডালে নানা পাখি ও বাবুইয়ের বাসা। কোথাও দেব-দেবীর প্রতিকৃতি, কোথাও-বা উড়ে বেড়াচ্ছে পরীর অবয়ব। মন্দিরের সামনের অংশে গাছের ওপর তৈরি দোলনায় শিব ও পার্বতীর উপস্থিতি পুরো আয়োজনে এনে দিয়েছে পৌরাণিক আবহ।
প্রকৃতি, ধর্মীয় বিশ্বাস ও শিল্পভাবনার এই সমন্বয় দর্শনার্থীদের সামনে তুলে ধরছে এক বিশেষ বার্তা প্রকৃতি রক্ষা করা মানে সৃষ্টির সৌন্দর্য ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায় দায়িত্বশীল হওয়া। গাছ, পাখি ও তাদের আবাস্থলকে কেন্দ্র করে এই সাজসজ্জা কেবল উৎসবের সৌন্দর্য বাড়ায়নি, ছড়িয়ে দিচ্ছে পরিবেশ সংরক্ষণের আহ্বানও।
বান্ধব পল্লির বাসিন্দাদের দাবি, প্রায় দেড়শ বছর ধরে তাদের পূর্বপুরুষেরা এখানে দুর্গাপূজার আয়োজন করে আসছেন। দীর্ঘদিনের সেই ঐতিহ্য ধরে রেখেই প্রতিবছর নতুন নতুন ভাবনায় মণ্ডপ সাজানোর চেষ্টা করেন তারা। তবে তরুণদের নিজেদের উদ্যোগে মণ্ডপ সাজানোর এই ধারাবাহিকতা চলছে প্রায় এক দশক ধরে। প্রতি বছর সামাজিক কোনো না কোনো বিষয়কে উপজীব্য করে তারা মণ্ডপের নকশা ও সাজসজ্জা পরিকল্পনা করেন।
এবারের আয়োজনের দায়িত্বে থাকা পূজা উদ্যাপন কমিটির সভাপতি সজল কুমার দাস বলেন, “আমরা গত দুই মাস ধরে দিনরাত পরিশ্রম করছি। কাজ করতে করতে কখন রাত পেরিয়ে সকাল হয়ে যায়, তা টেরই পাই না। নিজেদের ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দিতে পারার আনন্দই আমাদের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি।”
ডেকোরেটর দিয়ে কাজ না করানোর কারণ ব্যাখ্যা করে তিনি বলেন, “আমরা চেয়েছি নিজেদের ভাবনাটি নিজেদের মতো করে ফুটিয়ে তুলতে। নিজেরা কাজ করায় প্রতিটি সাজসজ্জায় আমাদের আবেগ ও সৃজনশীলতা যুক্ত হয়েছে। ডেকোরেটর দিয়ে করালে অন্তত ১০ লাখ টাকা খরচ হতো। নিজেদের শ্রমে করায় খরচও অনেক কম হয়েছে।”
বান্ধব পল্লির হরিজন কলোনির সভাপতি শ্যামল জমাদার বলেন, “আমাদের পূর্বপুরুষেরা প্রায় দেড়শ বছর ধরে দুর্গাপূজা করে আসছেন। আমরা সেই ঐতিহ্য ধরে রেখেছি। বান্ধব পল্লির পূজা মানেই ব্যতিক্রমী আয়োজন এ পরিচিতি ফরিদপুর ছাড়িয়ে আশপাশের জেলাতেও ছড়িয়ে পড়েছে। প্রতি বছর এখানে প্রচুর দর্শনার্থীর ভিড় হয়। এবারও বিপুল সমাগম হবে বলে আশা করছি।”
হিন্দুধর্মাবলম্বীদের অন্যতম প্রধান ধর্মীয় উৎসব শারদীয় দুর্গাপূজা। হিন্দু পৌরাণিক বিশ্বাস অনুযায়ী, দেবী দুর্গা মহিষাসুরকে বধ করে অশুভ শক্তির বিরুদ্ধে শুভ শক্তির বিজয়ের প্রতীক হয়ে উঠেছেন। দেবী দুর্গার দশভুজা রূপে শক্তি, সাহস ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিরোধের প্রতিফলন দেখা যায়। তার সঙ্গে লক্ষ্মী, সরস্বতী, কার্তিক ও গণেশের উপস্থিতি পূজার ধর্মীয় ও পৌরাণিক তাৎপর্যকে আরও গভীর করে।
দুর্গাপূজার মধ্য দিয়ে ভক্তরা দেবীর কাছে কল্যাণ, শান্তি ও সমৃদ্ধি কামনা করেন। পূজার আচার-অনুষ্ঠান, চণ্ডীপাঠ, অঞ্জলি, আরতি ও প্রসাদ বিতরণের পাশাপাশি মণ্ডপসজ্জাও উৎসবের অন্যতম প্রধান আকর্ষণ। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে অনেক মণ্ডপে ধর্মীয় ভাবনার পাশাপাশি সামাজিক সচেতনতা, পরিবেশ সংরক্ষণ ও মানবিক মূল্যবোধের বিষয়গুলোও তুলে ধরা হচ্ছে।
বান্ধব পল্লির এবারের আয়োজনেও সেই প্রবণতার প্রতিফলন দেখা যায়। প্রকৃতির আদলে সাজানো মণ্ডপের মাধ্যমে আয়োজকেরা ধর্মীয় আবহ অক্ষুণ্ন রেখে পরিবেশ রক্ষার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরার চেষ্টা করেছেন।
বান্ধব পল্লির পাশাপাশি ফরিদপুর শহরের নীলটুলী পূজামণ্ডপ, গোয়ালচামট এলাকার মিনিবাস মালিক সমিতি এবং বাস মালিক গ্রুপের পূজামণ্ডপও বর্ণিল সাজে সেজেছে। আলোকসজ্জা, দৃষ্টিনন্দন তোরণ ও নানা শিল্পসম্মত সাজসজ্জায় শহরের বিভিন্ন এলাকা উৎসবমুখর হয়ে উঠেছে। মণ্ডপ ঘিরে আয়োজক ও ভক্তদের মাঝে চলছে শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতি।
এদিকে ফরিদপুরের আলফাডাঙ্গা উপজেলা সদরের হরিমন্দিরে পৌরাণিক কাহিনিভিত্তিক বৃহৎ পূজার আয়োজন করা হয়েছে। আয়োজকদের তথ্য অনুযায়ী, সেখানে ২৭৭টি প্রতিমা নিয়ে পূজার আয়োজন করা হয়েছে। প্রতিবছরই মন্দিরটিতে বড় পরিসরে দুর্গোৎসবের আয়োজন করা হয়।
ফরিদপুরের জেলা প্রশাসক মাজহারুল ইসলাম জানান, এ বছর জেলায় ৭৮১টি মন্দিরে শারদীয় দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হচ্ছে। শান্তিপূর্ণ ও উৎসবমুখর পরিবেশ নিশ্চিত করতে প্রতিটি মণ্ডপের নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ মণ্ডপগুলো চিহ্নিত করে পর্যাপ্ত পুলিশ, আনসার ও স্বেচ্ছাসেবক মোতায়েন করা হয়েছে। পাশাপাশি মন্দিরগুলো সিসি ক্যামেরার আওতায় আনা, পর্যাপ্ত আলোকসজ্জা এবং অগ্নিনিরাপত্তা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। বিদ্যুৎ সংযোগ, বৈদ্যুতিক তার ও জেনারেটর ব্যবহারে সতর্ক থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
ফরিদপুরের পুলিশ সুপার শাহরীয়ার মো. মিয়াজী বলেন, “চুরি, ছিনতাই, মাদক, ইভটিজিং, নারী ও শিশু হয়রানিসহ বিভিন্ন অপ্রীতিকর ঘটনা প্রতিরোধে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সতর্ক রয়েছে। পূজা উপলক্ষে শহরে অবৈধ মোটরসাইকেলের প্রবেশ নিয়ন্ত্রণে ট্রাফিক পুলিশ কাজ করছে। প্রতিটি মণ্ডপে পুলিশ ও আনসার সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে।”