সারি সারি পাটখড়ির তৈরি গাছ, ডালে ডালে বাবুই পাখির বাসা আর গাছের আড়ালে উঁকি দিচ্ছে দেব-দেবীর প্রতিমা। মন্দিরের সামনে একটি গাছে বাঁধা দোলনায় দুলছেন শিব ও পার্বতী। পুরো দৃশ্যটি দেখলে মনে হবে যেন এক টুকরো গহিন অরণ্য। তবে এটি কোনো প্রাকৃতিক বন নয়, বরং ফরিদপুর শহরের আলীপুর মহল্লার বান্ধবপল্লিতে অবস্থিত একটি দুর্গামন্দির।

‘গাছ লাগান, পরিবেশ বাঁচান, প্রকৃতির ভারসাম্য রক্ষা করুন’—পরিবেশ রক্ষার এই বিশেষ বার্তা পৌঁছে দিতেই মন্দিরটি এমনভাবে সাজিয়েছেন হরিজন সম্প্রদায়ের আবাসস্থল বান্ধবপল্লির তরুণেরা। শারদীয় দুর্গোৎসব উপলক্ষে গত দুই মাস ধরে পল্লির অন্তত ৪০ জন তরুণ নিজেদের হাতে এই অনন্য মণ্ডপটি তৈরি করেছেন। বিশেষ বিষয় হলো, এই পুরো কাজে কোনো পেশাদার ডেকোরেটর নিয়োগ করা হয়নি। উল্লেখ্য, এই স্থানে দীর্ঘ দেড় শ বছর ধরে দুর্গাপূজার আয়োজন করা হয়ে আসছে।

শুক্রবার দুপুরে মন্দিরে পরিদর্শনে গিয়ে দেখা যায়, মূল ফটক থেকে মন্দিরের প্রবেশপথ পর্যন্ত প্রায় ১০০ মিটার রাস্তার দুই পাশে পাটখড়ি দিয়ে অসংখ্য কৃত্রিম গাছ তৈরি করা হয়েছে। শুধু রাস্তার পাশে নয়, মন্দির প্রাঙ্গণেও ১৪টি গাছের আদল ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। এই গাছগুলোতে সবুজ রঙের কৃত্রিম পাতা লাগানো হয়েছে এবং ডালে ডালে বিভিন্ন পাখি ও তাদের বাসার প্রতিকৃতি রাখা হয়েছে। গাছের ফাঁকে ফাঁকে দেব-দেবী ও পরিদের অবয়ব পুরো আয়োজনটিকে একটি প্রকৃত অরণ্যের রূপ দিয়েছে।

মণ্ডপ প্রাঙ্গণে কথা হয় বান্ধবপল্লির পূজা উদ্‌যাপন কমিটির সভাপতি সজল কুমার দাসের সঙ্গে। নিজেদের হাতে মণ্ডপ সাজানোর কারণ ব্যাখ্যা করে সজল দাস মুক্তকণ্ঠকে বলেন, “ডেকোরেটরদের থিম সাধারণত একই ধরনের হয়। তাঁদের থেকে সৃজনশীলতা আশা করা যায় না। তাঁরা মনের মাধুরী মিশিয়ে যে ভাবনা মূর্ত করেছেন, কোনো ডেকোরেটরের কাছে তা পাওয়া যেত না। তা ছাড়া ডেকোরেটরদের দিয়ে করালে অন্তত ১০ লাখ টাকা বিল দিতে হতো। নিজেরা করায় এত টাকা খরচ হয়নি।”

গত দেড় শ বছর ধরে বান্ধবপল্লিতে শারদীয় দুর্গোৎসবের আয়োজন করে আসছেন হরিজন সম্প্রদায়ের মানুষ। এই ব্যতিক্রমী আয়োজনের কথা ফরিদপুর শহরসহ আশপাশের এলাকায় ছড়িয়ে পড়েছে, যার ফলে প্রতিবছর এখানে দর্শনার্থীদের উপচে পড়া ভিড় হয়।

বান্ধবপল্লির হরিজন কলোনির সভাপতি শ্যামল জমাদার মুক্তকণ্ঠকে বলেন, “দেড় শ বছর ধরে আমাদের পূর্বপুরুষেরা এ দুর্গোৎসবের আয়োজন করে আসছেন। আমরা তার ধারাবাহিকতা বজায় রাখছি। প্রতিবছর এই মন্দিরে দর্শনার্থীদের উপচে পড়া ভিড় হয়। এবার ব্যতিক্রম হবে না।”

ফরিদপুর শহরে শুধু বান্ধবপল্লির মণ্ডপ নয়; নীলটুলী পূজা মন্দির, গোয়ালচামট এলাকার মিনিবাস মালিক সমিতি ও বাসমালিক গ্রুপের পূজা মন্দিরগুলোও অপরূপ সাজে সজ্জিত করা হয়েছে। চমৎকার আলোকসজ্জা ও তোরণের কারণে পুরো ফরিদপুর শহর এখন উৎসবের নগরীতে পরিণত হয়েছে। এবার জেলার মধ্যে সবচেয়ে বড় মণ্ডপ তৈরি করা হয়েছে আলফাডাঙ্গা উপজেলার সদরের হরিমন্দিরে, যেখানে পৌরাণিক কাহিনি অবলম্বনে ২৭৭টি প্রতিমা দিয়ে মণ্ডপ সাজানো হয়েছে।

জেলা প্রশাসক মাজহারুল ইসলাম জানিয়েছেন, ফরিদপুর জেলায় এবার মোট ৭৮১টি মণ্ডপে শারদীয় দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হচ্ছে। তিনি মুক্তকণ্ঠকে বলেন, “শান্তিপূর্ণ ও উৎসবমুখর পরিবেশে পূজা উদ্‌যাপনের জন্য প্রতিটি মণ্ডপ সিসিটিভি ক্যামেরার আওতায় আনা হয়েছে। আলোকসজ্জা ও অগ্নিনিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি বিদ্যুৎ সংযোগ, বৈদ্যুতিক তার ও জেনারেটর ব্যবহারে সতর্ক থাকার আহ্বান জানানো হয়েছে।”

অন্যদিকে, ফরিদপুরের পুলিশ সুপার শাহরিয়ার মোহাম্মদ মিয়াজী মুক্তকণ্ঠকে বলেন, “চুরি, ছিনতাই, মাদক, নারী-শিশুকে হয়রানিসহ অপ্রীতিকর ঘটনা প্রতিরোধে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সতর্ক আছে। পূজা উপলক্ষে শহরে অবৈধ মোটরসাইকেলের প্রবেশ নিয়ন্ত্রণে ট্রাফিক পুলিশ দায়িত্ব পালন শুরু করেছে। প্রতিটি মন্দিরে আনসার ও পুলিশ সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে।”