কক্সবাজারের উখিয়া উপজেলার ইনানী এলাকার পাটুয়ারটেক সৈকতে অবস্থিত টুপটুপ রিসোর্টে এক ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে অন্তত ১০ জনের মৃত্যু হয়েছে। তিনতলা বিশিষ্ট এই কাঠের স্থাপনাটিতে আগুন অত্যন্ত দ্রুত ছড়িয়ে পড়েছিল। ফায়ার সার্ভিসের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, রিসোর্টটি আগে থেকেই অগ্নিঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছিল এবং প্রতিষ্ঠানটির প্রয়োজনীয় অগ্নিনিরাপত্তা সনদও ছিল না। এই মর্মান্তিক ঘটনাটি পর্যটনকেন্দ্রের রিসোর্টসহ বিভিন্ন স্থাপনায় অগ্নিনিরাপত্তার গুরুত্বের বিষয়টি নতুন করে সামনে নিয়ে এসেছে।

বর্তমানে দেশের বিভিন্ন পর্যটন এলাকায় কাঠ, বাঁশ এবং খড়ের মতো প্রাকৃতিক উপকরণ ব্যবহার করে ইকো রিসোর্ট তৈরির প্রবণতা বেড়েছে। প্রাকৃতিক উপাদানে তৈরি এই স্থাপনাগুলো পরিবেশবান্ধব হলেও যথাযথ অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা না থাকলে তা মারাত্মক ঝুঁকির কারণ হতে পারে। কেবল স্থাপনার মূল কাঠামোই নয়, ঘরের ভেতরে ব্যবহৃত আসবাবপত্র, পর্দা, কার্পেট এবং অন্দরসজ্জার বিভিন্ন উপকরণও আগুন দ্রুত ছড়িয়ে দেওয়ার জন্য দায়ী হতে পারে।

সাধারণত যেসব পদার্থ আগুনের সংস্পর্শে এলে জ্বলতে পারে, সেগুলোকে দাহ্য পদার্থ বলা হয়। যেমন—কাঠ, কাগজ, কাপড়, শুকনো পাতা, খড়, প্লাস্টিক ও ফোম। এ ছাড়া পেট্রল, কেরোসিন, অ্যালকোহল এবং নির্দিষ্ট কিছু রাসায়নিক পদার্থও দাহ্য হিসেবে গণ্য হয়। তবে সব দাহ্য পদার্থের বৈশিষ্ট্য এক নয়; কোনোটিতে খুব দ্রুত আগুন ধরে, কোনোটি ধীরে জ্বলে, আবার কোনোটি আগুনের তীব্রতাকে বহুগুণ বাড়িয়ে দিতে পারে।

আগুন জ্বলতে সাধারণত তিনটি উপাদানের প্রয়োজন হয়—জ্বালানি, অক্সিজেন ও তাপ। কোনো স্থাপনায় দাহ্য উপকরণের আধিক্য থাকলে আগুন এক বস্তু থেকে অন্য বস্তুতে ছড়িয়ে পড়ার সুযোগ অনেক বেড়ে যায়। তাপের বিকিরণ, উত্তপ্ত ধোঁয়া এবং আগুনের শিখার মাধ্যমে আশপাশের উপকরণগুলো দ্রুত উত্তপ্ত হয়ে জ্বলতে শুরু করে।

নির্মাণকাজে কাঠ ও বাঁশ বহুল ব্যবহৃত উপকরণ। সঠিক নকশা এবং অগ্নিনিরাপত্তার ব্যবস্থা থাকলে এগুলো ব্যবহার করা সম্ভব। কিন্তু কাঠের দেয়াল, বাঁশের বেড়া, খড়ের ছাউনি এবং অন্যান্য দাহ্য উপকরণ খুব কাছাকাছি থাকলে আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি বাড়ে। বিশেষ করে কাঠের তৈরি ভবনে যদি অগ্নিপ্রতিরোধী ব্যবস্থা না থাকে, তবে আগুনের তাপে কাঠ দ্রুত জ্বলতে শুরু করে এবং শিখা মুহূর্তের মধ্যে ভবনের অন্য অংশে পৌঁছে যায়।

ঘরের অন্দরসজ্জায় ব্যবহৃত অনেক উপকরণই অত্যন্ত দাহ্য। সিনথেটিক পর্দা, কার্পেট, সোফার ফোম, গদি, বিছানার চাদর এবং প্লাস্টিকের সাজসজ্জার সামগ্রী আগুনের সংস্পর্শে আসা মাত্রই জ্বলে ওঠে। বিশেষ করে পর্দা বা ঝুলন্ত কাপড়ে আগুন লাগলে শিখা দ্রুত ওপরের দিকে ছড়িয়ে পড়ে এবং সেখান থেকে আগুন সিলিং বা আশপাশের আসবাবপত্রে পৌঁছে যায়।

ফোম এবং কিছু সিনথেটিক উপকরণ পুড়লে অত্যন্ত ঘন ধোঁয়া ও বিষাক্ত গ্যাস তৈরি হয়। অগ্নিকাণ্ডের সময় অনেক ক্ষেত্রে আগুনের শিখার চেয়ে এই ধোঁয়াই বেশি প্রাণঘাতী হয়ে ওঠে। ধোঁয়ার কারণে দৃষ্টিসীমা কমে যায়, শ্বাসকষ্ট হয় এবং নিরাপদে বের হওয়ার পথ খুঁজে পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে।

অন্দরসজ্জায় কাঠের প্যানেল, বোর্ড, প্লাস্টিকের আবরণ এবং অন্যান্য উপকরণ ব্যবহারের আগে সেগুলোর অগ্নিপ্রতিরোধী বৈশিষ্ট্য যাচাই করা অত্যন্ত জরুরি। সব ধরনের বোর্ড বা সিলিং উপকরণ সমান ঝুঁকিপূর্ণ নয়। কোনো উপকরণ আগুনের সংস্পর্শে কেমন আচরণ করবে, তা নির্ভর করে তার উপাদান, নির্মাণপদ্ধতি এবং অগ্নিপরীক্ষার ফলাফলের ওপর।

বিশেষ করে সিলিংয়ের ভেতরে আগুন বা ধোঁয়া ছড়িয়ে পড়লে তা বাইরে থেকে সঙ্গে সঙ্গে বোঝা না-ও যেতে পারে। সিলিংয়ের ফাঁকা অংশ, দেয়ালের গোপন জায়গা কিংবা বিভিন্ন পাইপ ও তারের চলাচলের ফাঁক দিয়ে আগুন এক অংশ থেকে অন্য অংশে দ্রুত ছড়িয়ে পড়তে পারে। এই কারণে ভবনের নকশা ও নির্মাণে আগুন ও ধোঁয়া প্রতিরোধের বিশেষ ব্যবস্থা রাখা প্রয়োজন।

রিসোর্ট, হোটেল, রেস্তোরাঁ কিংবা সাধারণ বাড়ি—সব ধরনের স্থাপনায় অগ্নিনিরাপত্তাকে নির্মাণ ও পরিচালনার এক অপরিহার্য অংশ হিসেবে বিবেচনা করা দরকার। শুধু অগ্নিনির্বাপক যন্ত্র রাখলেই দায়িত্ব শেষ হয় না। স্থাপনার ধরন ও আয়তন অনুযায়ী আধুনিক অগ্নিনির্বাপক ব্যবস্থা, ধোঁয়া শনাক্তকারী অ্যালার্ম, অগ্নিসংকেত, জরুরি বহির্গমন পথ এবং প্রয়োজনীয় পানির সংযোগসহ পূর্ণাঙ্গ অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।

পাশাপাশি বৈদ্যুতিক সংযোগ ও রান্নাঘরের সরঞ্জাম নিয়মিত পরীক্ষা করা, দাহ্য উপকরণ নিরাপদ স্থানে রাখা এবং কর্মীদের অগ্নিনিরাপত্তার বিশেষ প্রশিক্ষণ দেওয়া জরুরি। অতিথিদেরও স্পষ্টভাবে জানাতে হবে যে, আগুন লাগলে কোন পথে বের হতে হবে।

অগ্নিকাণ্ডের ঝুঁকি কমাতে ভবন নির্মাণের শুরু থেকেই অগ্নিনিরাপত্তার পরিকল্পনা করা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। এ বিষয়ে আইনগত বাধ্যবাধকতাও রয়েছে। বিশেষ করে পর্যটন রিসোর্টে অতিথিদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার প্রাথমিক দায়িত্ব কর্তৃপক্ষের। নান্দনিক নকশা বা প্রাকৃতিক উপকরণের ব্যবহার যেন কখনোই নিরাপত্তার বিকল্প হয়ে না দাঁড়ায়।

সূত্র: ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স