করোনার অতিমারির সেই দুঃসময়ে যখন চারপাশ অন্ধকার হয়ে এসেছিল এবং অনেকেই চাকরি হারিয়ে ভেঙে পড়েছিলেন, ঠিক তেমনই এক চরম বিপর্যয়ের মুখোমুখি হয়েছিলেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করা তরুণ ফজলে এলাহী। তবে প্রতিকূলতাকে জয় করার যে অদম্য জেদ তাঁর মনে ছিল, তা তাঁকে দমাতে পারেনি। কুড়িগ্রামের উলিপুর উপজেলার এক প্রত্যন্ত গ্রামের এই তরুণের জীবনসংগ্রাম আজ অনেকের জন্য অনুপ্রেরণা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

২০২৬ সাল এসেও ইন্টারনেটের তীব্র সংকটের মুখে কখনো বাঁশের ডগায়, আবার কখনো জানালার পাশে মোবাইল রেখে হটস্পট চালু করে যিনি সব বাধা জয় করেছেন, ফজলে এলাহী তেমনই এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। কুড়িগ্রামের সেই প্রত্যন্ত গ্রামের বাঁশের ডগায় বাঁধা মোবাইলটি আজ কেবল একটি ইন্টারনেট রাউটার নয়, বরং শত শত তরুণের জন্য আশার বাতিঘর হয়ে উঠেছে। গতকাল শুক্রবার ভিডিও কলের মাধ্যমে কথা হয়েছে এই তরুণের সঙ্গে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়াশোনা শেষ করে একটি বেসরকারি তথ্যপ্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত ছিলেন ফজলে এলাহী। কিন্তু করোনাভাইরাসের মহামারির প্রভাবে হঠাৎ করেই তাঁর চাকরিটি চলে যায়। এরপরই শুরু হয় জীবনের সবচেয়ে কঠিন অধ্যায়। পকেটে কোনো টাকা নেই, পরিবারকে দেখানোর মতো কোনো সম্বলও নেই। জীবিকার তাগিদে ঢাকায় শুরু হয় তাঁর এক ভিন্ন লড়াই। কোনো উপায় না পেয়ে ঢাকার মানারাত ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটিতে নিরাপত্তা প্রহরীর চাকরি গ্রহণ করেন তিনি। রাতে প্রহরীর দায়িত্ব পালন করার পাশাপাশি দিনের বেলা ইস্কাটনের একটি বেসরকারি কুরিয়ার প্রতিষ্ঠানে চিঠি বিলি ও ডেটা এন্ট্রির কাজ করতেন তিনি।

সেই সময়ের স্মৃতিচারণ করে ফজলে এলাহী মুক্তকণ্ঠকে বলেন, ‘খুব কষ্ট করে চলতে হতো। হাঁপিয়ে উঠতাম। কিন্তু পরিবারের কথা মনে করে নিজেকে সামলে কাজ করে যেতাম।’

অবশেষে করোনা পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করলে সবকিছু ছেড়ে কুড়িগ্রামের গ্রামের বাড়িতে ফিরে আসার সিদ্ধান্ত নেন তিনি। পকেটের শেষ সম্বলটুকুও তখন ফুরিয়ে এসেছিল। ঘরের টিনের চালে বৃষ্টির শব্দ আর অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ—সব মিলিয়ে এক গভীর হতাশায় ডুবে যেতে হয়েছিল তাঁকে।

এমন সময়ে একদিন ফেসবুকে তাঁর চোখে পড়ে একটি কোর্স—‘জীবনের শেষ চিকিৎসা’ শিরোনামে শামীম হুসাইনের স্কিলআপারের ফেসবুক অ্যাডস কোর্স। কোর্সটির গুরুত্ব তিনি অনুধাবন করতে পেরেছিলেন, কিন্তু ফি দেওয়ার মতো ১ হাজার ৯৫০ টাকাও তাঁর কাছে ছিল না। তবে আগে থেকেই বিভিন্ন ফ্রিল্যান্সিং কমিউনিটি ও সরকারি প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত থাকায় তাঁর পরিচয় হয়েছিল বয়সে বড় এক নারীর সঙ্গে, যাঁকে তিনি ‘আপু’ বলে ডাকতেন। লজ্জার সংকোচ কাটিয়ে সেই আপুকে নিজের সমস্যার কথা জানালে তিনি সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেন। তবে শর্ত ছিল একটি—ফজলে এলাহীকে যা শেখানো হবে, তা যেন তিনি ওই নারীকেও একটু শিখিয়ে দেন। এভাবে সেই নারীর দেওয়া টাকায় স্কিলআপারের কোর্সে ভর্তি হন তিনি এবং শুরু হয় নতুন এক লড়াই।

টিনের ঘরের কারণে ঘরের ভেতরে মোবাইল নেটওয়ার্ক পাওয়া যেত না বললেই চলে। ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট বা ল্যাপটপের ওয়াই–ফাই তো দূরের কথা, তাঁর একমাত্র ভরসা ছিল মোবাইল ফোনের হটস্পট। ঘরে নেটওয়ার্ক না পাওয়ার কারণে তিনি এক অদ্ভুত উপায় উদ্ভাবন করেন—জানালার বাইরে কিংবা বাঁশের ডগায় মোবাইল বেঁধে বাইরে রেখে হটস্পট চালু রাখতেন। আর ঘরের ভেতর ল্যাপটপ সংযুক্ত করে চলত তাঁর কাজ ও পড়াশোনা। এভাবে দিনরাত ক্লাসের ভিডিও দেখা, অ্যাসাইনমেন্ট সম্পন্ন করা এবং ফাইভআর ও আপওয়ার্কে চেষ্টা চালিয়ে যান তিনি। দীর্ঘ ৯ মাসের কঠোর চেষ্টার পর প্রথম ৩৫ ডলারের একটি কাজ পান তিনি। আর তখন থেকে আজ পর্যন্ত সেই মোবাইল হটস্পট দিয়েই তাঁর ফ্রিল্যান্সিং কার্যক্রম চলছে।

গ্রামের মানুষ শুরুতে বুঝত না ঘরে বসে ল্যাপটপ টেপাটিপি করা মানে কী। চারপাশ থেকে নানা কটু কথা শুনতে হয়েছে তাঁকে। ফজলে এলাহী মুক্তকণ্ঠকে বলেন, ‘সারা দিন ঘরে কী করে? কবে ঢাকা যাবে? গার্মেন্টসে চাকরি করলেও তো কিছু টাকা আসত!’

এমন হাজারো টিটকারি ও মায়ের উৎকণ্ঠাকে উপেক্ষা করে নিজের লক্ষ্যে অটল ছিলেন তিনি। পরিবারকে তিনি আশ্বস্ত করেছিলেন যে, একদিন ভালো কিছু করে দেখাবেন।

সেই লড়াইয়ের কষ্টগুলো এখন সার্থক হয়েছে। তিনি এখন ফাইভআর ও আপওয়ার্কে টপ রেটেড সেলার হিসেবে সফলতার সঙ্গে কাজ করছেন। গুগল অ্যাডস, ওয়েব অ্যানালিটিকস ও ফেসবুক কনভার্সনের কাজ করে মার্কেটপ্লেস ও বিভিন্ন এজেন্সিতে যুক্ত থেকে ঘরে বসেই প্রতি মাসে উপার্জন করছেন ১ হাজার ৫০০ থেকে ২ হাজার ডলার (২ লাখ টাকার বেশি)।

পাশাপাশি একটি প্রতিষ্ঠানে মেন্টর হিসেবে তরুণদের গাইড করছেন তিনি। নিজের উপার্জনের টাকা দিয়ে গ্রামের মানুষের পাশে দাঁড়াচ্ছেন এবং সাধ্যমতো এলাকার ছোটখাটো উন্নয়নমূলক কাজে অবদান রাখছেন।