মোড়ের চায়ের দোকানে বসে এক কাপ লিকার-চা হাতে নিয়ে দীর্ঘক্ষণ ধরে পা নাড়াচ্ছিলেন পল্টুদা। আমাদের এলাকার কাউন্সিলর কাশেম ব্যাপারীর ডান হাত বলা চলে পল্টুদাকে। তবে এই 'ডান হাত' হওয়ার বিশেষ কারণ রয়েছে; কাশেম ব্যাপারীর যত বিতর্কিত ও খারাপ কাজের বাস্তবায়ন হয়, তা মূলত এই পল্টুদার মাধ্যমেই সম্পন্ন হয়। তবে এলাকায় বেশ কিছুদিন ধরে গুঞ্জন শোনা যাচ্ছিল যে, কাশেম ব্যাপারী এবং পল্টুদার দীর্ঘদিনের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক এখন চরম তিক্ততায় রূপ নিয়েছে।
এমন এক সময়ে আমি পল্টুদার পাশে গিয়ে বসলাম। মনে মনে ভাবছিলাম, সকালের নাশতার খরচটা হয়তো আজ বাঁচানো যাবে। আমি জিজ্ঞেস করলাম, “কী পল্টুদা, টেনশনে মনে হচ্ছে!”
পল্টুদা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, “জীবন রিস্কে, টেনশন না কইরা কী করমু?”
আমি আবারও জানতে চাইলাম, “আবার ঝগড়া হয়েছে ঘরে?”
তিনি বিরক্ত হয়ে উত্তর দিলেন, “আরে ধুর! হেই সব না।”
আমি তাকে আশ্বস্ত করে বললাম, “তাহলে কী সমস্যা? আপনি আমার বড় ভাই; আপনার সমস্যা আমার সমস্যা।”
আমার কথা শুনে তিনি কিছুটা খিটখিটে স্বরে বললেন, “বেটা সকাল সকাল তেল মারতাছস, সর এইহান থেইক্কা।”
তার কথা শুনেই বুঝলাম, বেচারা সত্যিই কোনো গভীর দুশ্চিন্তায় ডুবে আছেন। মানবিকতা জাগিয়ে আমি সিদ্ধান্ত নিলাম তাকে সাহায্য করার। আমি পুনরায় অনুরোধ করলাম, “ভাই খুলে বলেন, সমস্যা কী হয়েছে? সমাধান আমি দেব।”
তখনই পল্টুদা তার দুঃখের কথা খুলে বললেন, “দুঃখের কথা কী কমু? তোরা তো জানস, কাশেম ব্যাপারীর লগে আমার গোঁজামিল চলতাছে। হের সব অকাজের ফাইলপত্র আমার কাছে। কয় দিন আগে ব্যাপারী প্রাইমারি স্কুলের দেয়াল বরাবর ‘এক নম্বর’ বাথরুম করছিল। সময়ে কাজে লাগতে পারে ভাইবা, ওই ছবি তুইলা রাখছিলাম।”
আমি অবাক হয়ে বললাম, “ওইটা সমস্যা?”
পল্টুদা আর্তনাদ করে বললেন, “আরে না, বেটা। সমস্যা আরও গুরুতর। গত রাইতে জসিমের বিয়ায় গিয়া, উল্টাপাল্টা খায়া আমি ওই ছবি পোস্ট মাইরা দিসি ফেসবুকে, লগে ক্যাপশনও দিছি—কাশেম ব্যাপারীর উন্নয়নের জোয়ারে ভাসছে আবদুল্লাহপুর!”
আমি চমকে গিয়ে বললাম, “হায় হায়! কন কী! পোস্ট ডিলিট করেন নাই?”
পল্টুদা আতঙ্কিত স্বরে বললেন, “পোস্ট তো সকালে হুঁশ হওয়ামাত্রই ডিলিট করছি। তয় মাঝরাইতে ওই পোস্ট দেইখা ব্যাপারী নাকি স্ট্রোক করছে, অহন আইসিইউতে। এহন যদি ব্যাপারী পটল তুলে, তোগো পল্টু ভাই তো চৌদ্দ শিকের ভাত খাইব রে, মফিজ। ভাই মফিজ, আমারে তুই বাঁচা”
এমন এক সংকটময় পরিস্থিতির সমাধান খুঁজতে খুঁজতে আমার মাথায় একটি বুদ্ধি এল। আমি তাকে পরামর্শ দিলাম, “পল্টুদা, আপনি এক কাজ করেন, ফেসবুক লাইভ করেন। ওইখানে বলেন যে আপনার আইডি হ্যাক হয়েছিল; আইডির অ্যাকসেস আপনার কাছে ছিল না। বিরোধী দল আপনার আইডি হ্যাক করে এসব পোস্ট করেছে। সাথে কাউন্সিলরের নামে ননস্টপ সুনাম করেন; সব সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে।”
পল্টুদা আশাবাদী হয়ে জিজ্ঞেস করলেন, “হাছা কইতাছস? এটা করলেই হইব?”
আমি আত্মবিশ্বাসের সাথে বললাম, “আরে হইব হইব।”
এরপর আমিই পল্টুদাকে দিয়ে লাইভটি করালাম। লাইভে পল্টুদা বিরোধী দলের প্রতি তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করলেন এবং কাশেম ব্যাপারীর এমন প্রশংসা করলেন যে, সেই প্রশংসা যদি কাশেম শুনতেন, তবে হয়তো তার ৬০ বছরের আয়ু ১০০ হয়ে যেত, অথবা খুশিতে তিনি তখনই পরলোকগমন করতেন। লাইভ চলাকালীন হঠাৎ একটি নোটিফিকেশন এল—'কাশেম ব্যাপারী (কাউন্সিলর আবদুল্লাহপুর) is watching your live'।
লাইভ শেষ করে আমরা দুজনে খুশিতে ৩০ টাকার লোকাল বিরিয়ানি খাচ্ছিলাম (ডিম ছাড়া ৩০ টাকা, আর ডিমসহ ৪০ টাকা)। ঠিক সেই মুহূর্তে আমার বন্ধু বুলবুলের ফোন এল। দুই মিনিটের সেই কথোপকথনে সে জানাল যে, কিছুক্ষণ আগেই কাশেম ব্যাপারী মারা গেছেন। অর্থাৎ, কাশেমের কাছে এখন তার নিজের ‘জীবনের’ অ্যাকসেসই আর নেই।
আমি তখন পল্টুদাকে সতর্ক করে বললাম, দাদা, জলদি এলাকার অ্যাকসেস ছাড়েন। নয়তো আপনার জিন্দেগি এমনভাবে হ্যাক হইব, হাজারবার রিস্টোর মারলেও আর ফিরে আসবে না।