বল হাতে তিনি এখনো যথেষ্ট কার্যকর। ঘরোয়া ক্রিকেটে নিয়মিত উইকেট শিকার করছেন। মাঠে নেমে নিজের ফিটনেস নিয়ে সব প্রশ্নের জবাব দিচ্ছেন তিনি। তা সত্ত্বেও ভারতীয় জাতীয় দলে জায়গা করে নিতে পারছেন না মোহাম্মদ শামি। নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে আসন্ন দুই টেস্টের সিরিজ জন্য দল ঘোষণা করার পর শামিকে নিয়ে সেই পুরনো প্রশ্নটিই আবারও জোরালো হয়ে উঠেছে—জাতীয় দলের দরজা কি তবে তাঁর জন্য চিরতরে বন্ধ হয়ে গেল?

গতকাল রাতে নিউজিল্যান্ড সফরের জন্য ১৫ সদস্যের টেস্ট দল ঘোষণা করেছে ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ড (বিসিসিআই)। এই দলে দীর্ঘ এক বছরেরও বেশি সময় পর ফিরেছেন পেসার আকাশ দীপ। তবে দলে নেই মোহাম্মদ শামি। অথচ গত কয়েকদিন ধরেই ভারতীয় দলে শামির ফেরার জোরালো গুঞ্জন শোনা যাচ্ছিল, বিশেষ করে প্রায় চার বছরের দীর্ঘ বিরতি কাটিয়ে ভুবনেশ্বর কুমারের দলে ফেরার পর। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সেই গুঞ্জন বাস্তবায়িত হয়নি।

পরিসংখ্যান অনুযায়ী, শামি ভারতের হয়ে সর্বশেষ খেলেছেন ২০২৫ সালের মার্চে, চ্যাম্পিয়নস ট্রফিতে। ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে সর্বশেষবার ভারতের হয়ে টি-টোয়েন্টি খেলেছেন এই অভিজ্ঞ পেসার। তবে টেস্ট ক্রিকেটে তাঁর অনুপস্থিতি আরও দীর্ঘ; ২০২৩ সালের জুনে আইসিসি টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপ ফাইনালে তিনি সর্বশেষ টেস্ট খেলেছিলেন।

অজিত আগারকার প্রধান নির্বাচকের পদ ছেড়ে দেওয়ার পর শামির প্রত্যাবর্তন নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছিল। অনেকে আশা করেছিলেন যে, নির্বাচক কমিটিতে পরিবর্তনের ফলে শামির সামনে নতুন সুযোগ তৈরি হতে পারে। কিন্তু সেই প্রত্যাশা পূরণ হয়নি। প্রজ্ঞান ওঝার নেতৃত্বাধীন নতুন নির্বাচক কমিটিও ভারতের হয়ে ৪৬২ উইকেট নেওয়া এই অভিজ্ঞ পেসারকে দলে ফেরানোর সিদ্ধান্ত নেয়নি।

অথচ ঘরোয়া ক্রিকেটে শামির পারফরম্যান্স ছিল অত্যন্ত নজরকাড়া। ২০২৫-২৬ রঞ্জি ট্রফিতে বেঙ্গলের হয়ে সাত ম্যাচে মোট ৩৭টি উইকেট নিয়েছেন তিনি। তাঁর বোলিং গড় ছিল ১৬.৭২ এবং তিনবার ইনিংসে পাঁচ উইকেট নেওয়ার কৃতিত্ব দেখিয়েছেন। চলতি মৌসুমের শুরুতেও নিজের দক্ষতার প্রমাণ দিয়েছেন শামি; বেঙ্গলের হয়ে দিল্লির বিপক্ষে ম্যাচে তিনি পাঁচ উইকেট শিকার করেন। অর্থাৎ, বল হাতে নিজের দায়িত্ব পালন করে চলেছেন এই পেসার।

প্রশ্ন উঠছে, ঘরোয়া ক্রিকেটে এমন দুর্দান্ত পারফরম্যান্সের পরও তাঁর আর কী প্রমাণ করার বাকি আছে? কেন জাতীয় দলের দরজা তাঁর জন্য খুলছে না?

শামির জাতীয় দলে না ফেরার পেছনে বারবার ফিটনেসের প্রসঙ্গটি সামনে এসেছে। দীর্ঘ সময় ধরে চোটের সমস্যায় ভুগেছেন তিনি। ফলে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের তীব্র চাপ সামলানোর সক্ষমতা তাঁর আছে কি না, তা নিয়ে আলোচনা চলছে। তবে শামি নিজেই বারবার দাবি করেছেন যে, তিনি খেলার জন্য সম্পূর্ণ প্রস্তুত।

দিল্লির বিপক্ষে রঞ্জি ম্যাচের পর সাংবাদিকদের সামনে নিজের অবস্থান স্পষ্ট করে শামি সমালোচকদের প্রতি বলেন, “আপনারা আমার ফিটনেস দেখতে পাচ্ছেন। সেটা লিখুন। আপনারা তো আমাকে দেখছেন। আমি কী বললাম, তাতে কী হবে? আমি মাঠে আছি। খেলছি। যেখানে খেলার সুযোগ পাচ্ছি, সেখানেই খেলছি। আমার কাজ শুধু বোলিং করে যাওয়া।” এছাড়া রঞ্জি ট্রফির শুরুর আগে শামি বলেছিলেন, ভারতের হয়ে না খেলতে পারলে, তাঁর কোনো ক্ষতি নেই।

বর্তমানে শামির বয়স ৩৬ বছর। অভিজ্ঞতার দিক থেকে তিনি ভারতীয় ক্রিকেটের অন্যতম প্রধান মুখ। তবে ফাস্ট বোলারদের ক্ষেত্রে বয়সের পাশাপাশি চোটের ইতিহাস অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাঁড়ায়। বিশেষ করে টেস্ট ক্রিকেটে দীর্ঘ স্পেল বল করতে হয় এবং টানা বোলিংয়ের প্রচণ্ড ধকল সামলাতে হয়। তাই একজন পেসারকে দলে নেওয়ার সময় নির্বাচকেরা তাঁর ফিটনেস, কাজের চাপ এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার কথা গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করতে পারেন।

শামির ক্ষেত্রেও কি সেই হিসাব কাজ করছে? এই বিষয়ে নির্বাচকদের কাছ থেকে কোনো আনুষ্ঠানিক ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি, ফলে বিষয়টিকে নিশ্চিত কারণ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।

ভুবনেশ্বরের ফেরা এবং শামির না ফেরার মধ্যে একটি মৌলিক পার্থক্য রয়েছে। ভুবনেশ্বরকে ভারত মূলত সাদা বলের ক্রিকেটের জন্য, বিশেষ করে টি-টোয়েন্টির জন্য বিবেচনা করছে, যেখানে টেস্টের তুলনায় শারীরিক ধকল কম। অন্যদিকে, শামিকে দলে নেওয়া হলে তিনি সম্ভবত টেস্ট এবং ওয়ানডে উভয় ফরম্যাটেই বিবেচিত হতেন। এছাড়া ভুবনেশ্বর আইপিএলে টানা দুই মৌসুম অবিশ্বাস্য পারফর্ম করে রয়্যাল চ্যালেঞ্জার্স বেঙ্গালুরুকে চ্যাম্পিয়ন করেছেন এবং গত দুই মৌসুমে তাঁর উইকেট সংখ্যা ছিল ৪৫টি। আইপিএলে এমন পারফরম্যান্স তাকে সবার নজরে এনেছে সহজেই।

এর পাশাপাশি ভারতীয় পেস আক্রমণে এখন প্রতিযোগিতা অনেক বেড়েছে। আকাশ দীপের মতো উদীয়মান বোলাররা দলে জায়গা করে নিচ্ছেন। ফলে শামির সামনে চ্যালেঞ্জ এখন আরও কঠিন। শুধু ফিটনেস প্রমাণ করলেই হবে না, তাকে নির্বাচকদের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনায় জায়গা করে নিতে হবে। আপাতত মনে হচ্ছে, তিনি সেই পরিকল্পনার বাইরে। অন্যথায় বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের মতো গুরুত্বপূর্ণ নিউজিল্যান্ড সফরে কেন তাঁর জায়গা হতো না!