সৌদি আরবে ইরান-সমর্থিত হুতি বিদ্রোহীদের সাম্প্রতিক আক্রমণ ইয়েমেন যুদ্ধকে এক সংকটময় ও নতুন মোড়ে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। বিমানবন্দরসহ বিভিন্ন বেসামরিক অবকাঠামো লক্ষ্য করে চালানো এই ধারাবাহিক হামলায় অন্তত ১২ জন নিহত এবং শতাধিক মানুষ আহত হয়েছেন। বিশ্লেষকদের মতে, এই ঘটনার মধ্য দিয়ে লাল রেখা বা সীমারেখা মানার সব পথই এখন কার্যত বন্ধ হয়ে গেছে।
হুতিদের এই পদক্ষেপকে একটি চরম দায়িত্বজ্ঞানহীন বাজি হিসেবে দেখা হচ্ছে, যা দীর্ঘমেয়াদে তাদের নিজেদের স্বার্থ রক্ষা করবে না। তারা খুব ভালো করেই জানে যে এই ধরনের উস্কানির পরিণতি এবং পাল্টা হামলা কতটা ভয়াবহ হতে পারে। তা সত্ত্বেও তারা সৌদি আরবে হামলা চালিয়ে যাচ্ছে। ধারণা করা হচ্ছে, মূলত মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনের (মিডটার্ম) ঠিক আগে এই অঞ্চলে উত্তেজনা বাড়িয়ে ইরানের যে পরিকল্পনা, তা বাস্তবায়নের লক্ষ্যেই এই তৎপরতা চালানো হচ্ছে।
পরিস্থিতি যেহেতু ক্রমেই উত্তপ্ত হচ্ছে, তাই বর্তমান প্রেক্ষাপটে দুটি বড় ধরনের দৃশ্যপটের জন্ম হতে পারে: প্রথমটি হলো হুতিদের বিরুদ্ধে একটি বড় মাপের আঞ্চলিক সামরিক অভিযান, আর দ্বিতীয়টি হলো একটি দীর্ঘস্থায়ী ক্ষয়িষ্ণু যুদ্ধ বা ‘ওয়ার অব অ্যাট্রিশন’।
হুতিদের ক্রমাগত উসকানির জবাবে সৌদি আরব এখন আন্তর্জাতিক সমর্থন আদায়ের পাশাপাশি আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক মিত্রদের সঙ্গে সম্পর্ক আরও জোরদার করার চেষ্টা করছে। রিয়াদের লক্ষ্য একটাই—একটি শক্তিশালী ও ঐক্যবদ্ধ জোট গঠন করা, যা আঞ্চলিক হুমকিতে পরিণত হওয়া এই গোষ্ঠীকে কার্যকরভাবে প্রতিহত করতে পারবে। রিয়াদ স্বাভাবিকভাবেই তার প্রতিবেশী উপসাগরীয় দেশগুলোর দিকে তাকিয়ে আছে; কারণ, অঞ্চলটির চলমান অশান্তির আঁচ এখন তাদের গায়েও লাগছে। সবার মধ্যেই এখন এই উপলব্ধি তৈরি হয়েছে যে, এই বিপদটি শুধু সৌদির একার নয়, বরং পুরো অঞ্চলের জন্য হুমকি। ফলে ওমান ছাড়া বাকি উপসাগরীয় দেশগুলো ইয়েমেনে হুতিদের বিরুদ্ধে সরাসরি ও পরোক্ষভাবে রিয়াদকে পূর্ণ সমর্থন দিতে পারে।
অন্যদিকে, পাকিস্তানের পাশাপাশি তুরস্কও এই জোটে যুক্ত হতে পারে। কারণ, সৌদি আরবের সঙ্গে তাদের ‘মক্কা চুক্তি’ নামে একটি প্রতিরক্ষা চুক্তি রয়েছে। এই চুক্তিটি তুর্কি সংসদে অনুমোদন পেলেই সৌদি আরবকে সহায়তায় সেখানে তুর্কি সেনা মোতায়েনের পথ সহজ হবে। তবে উল্লেখ্য যে, আড়ালে তুরস্ক ও পাকিস্তানের প্রত্যক্ষ-পরোক্ষ সামরিক সহায়তা, রসদ এবং গোয়েন্দা তথ্য সরবরাহ ইতিমধ্যেই পুরোদমে চালু রয়েছে।
ইয়েমেন সংকটের একমাত্র সমাধান হিসেবে মনে করা হচ্ছে—ইয়েমেন সরকারের নেতৃত্বে এবং একটি শক্তিশালী আঞ্চলিক জোটের সমর্থনে একটি চূড়ান্ত ও নির্ণায়ক সামরিক অভিযান। আর তা বাস্তবায়ন করতে হলে ইয়েমেন সরকারকে অবশ্যই সবার আগে নিজের ঘর সামলাতে হবে এবং তাদের মিত্রদের সঙ্গে সম্পর্ক সুদৃঢ় করতে হবে। যুক্তরাষ্ট্রের এই সামরিক অভিযানে যোগ দেওয়ার সম্ভাবনা থাকলেও তা মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে ঘটার সম্ভাবনা বেশ কম। কারণ, মধ্যপ্রাচ্যে কোনো নতুন সামরিক অভিযানে জড়ানোকে মার্কিন ভোটাররা ইতিবাচকভাবে দেখেন না।
একটি শক্তিশালী আঞ্চলিক জোট ইয়েমেনের আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারের বিশ্বস্ত বাহিনীকে শক্তিশালী পাল্টা আক্রমণ চালাতে সাহায্য করতে পারে। এটি বাব আল-মানদেব ও ধুবাব ছাড়িয়ে পশ্চিম উপকূলীয় অঞ্চল আবার নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় শক্তি জোগাবে। উপকূলীয় এই সাফল্যগুলো লোহিত সাগরে জাহাজ চলাচলের ঝুঁকি অনেকটাই কমিয়ে দেবে এবং যুদ্ধের পাল্লা আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারের দিকে ঝুঁকে পড়তে পারে। ইয়েমেনের অন্যান্য শহর ও প্রদেশে নতুন সামরিক ফ্রন্ট খুলে দেওয়া সম্ভব হলে হুতিদের মনোযোগ ও রসদ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়বে, যা সরকারি বাহিনীকে আরও দ্রুত সামনে এগিয়ে যাওয়ার সুযোগ তৈরি করে দেবে।
এর ফলে রাজধানী সানা পুনরুদ্ধারের পথও হয়তো উন্মোচিত হতে পারে। তবে সরকারের পক্ষে সানা পুনর্দখলের প্রধান বাধা হলো তাদের নিজেদের অভ্যন্তরীণ কোন্দল। বাইরের নেতিবাচক হস্তক্ষেপ বা প্রভাব এই কোন্দলকে আরও বাড়িয়ে দিতে পারে এবং হুতিদের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ লড়াইকে দুর্বল করে ফেলতে পারে। তবে সাম্প্রতিক সময়ে ইয়েমেন সরকার তাদের সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়াকে এক ছাতার নিচে আনা এবং সামরিক কমান্ডকে সংহত করতে যে পদক্ষেপ নিয়েছে, তার সুফল মাঠে ইতিবাচকভাবে দেখা যাচ্ছে। তা সত্ত্বেও রাজধানী সানা পুনর্দখলের চূড়ান্ত লক্ষ্যে পৌঁছাতে তাদের লাগাতার প্রচেষ্টা ও অবিচল রাজনৈতিক সংকল্প প্রয়োজন।
সরকারি বাহিনী যদি কৌশলগতভাবে বড় ধরনের কোনো অগ্রগতি অর্জন করতে পারে, তবে হুতিরা সাময়িক যুদ্ধবিরতি বা বিরতির বিনিময়ে কিছু ছাড় দিতে বাধ্য হতে পারে। অতীতেও তারা এমনটা করেছে। তবে তাদের আসল উদ্দেশ্য শান্তি প্রতিষ্ঠা নয়; বরং কিছুটা সময় নিয়ে নিজেদের নতুন করে গুছিয়ে নেওয়া এবং পুনরায় নতুন শক্তিতে হামলা চালানো। হুতিদের সঙ্গে আলোচনার টেবিলে বসার সময় কূটনীতিক ও মধ্যস্থতাকারীদের এ বিষয় গুরুত্বের সঙ্গে মাথায় রাখতে হবে।
যদি সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট এবং ইয়েমেন সরকার নিজেদের অভ্যন্তরীণ বিভেদ ও মতপার্থক্য মেটাতে ব্যর্থ হয়, তবে হুতিদের বিরুদ্ধে তাদের অগ্রযাত্রা অনেকটাই থমকে যাবে। এ সুযোগ কাজে লাগিয়ে হুতি যোদ্ধারা কেবল নিজেদের অবস্থানই শক্ত করবে না, বরং কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ তাইজ শহরের ওপর চাপ বাড়াবে এবং সৌদির বেসামরিক লক্ষ্যবস্তুতে ধারাবাহিক হামলা চালিয়ে যাবে। এমন পরিস্থিতি সংঘাতকে আরও জটিল করে তুলবে। ফলে বেসামরিক প্রাণহানি ও বাস্তুচ্যুতির ঘটনা বহুগুণ বাড়বে এবং কোনো চূড়ান্ত ফলাফল ছাড়াই যুদ্ধ প্রলম্বিত হতে থাকবে।
এর একটি বড় অর্থনৈতিক প্রভাব পড়বে সৌদি আরবের ওপর। প্রতিরক্ষা খাতে অস্বাভাবিক খরচ বেড়ে যাওয়ার ফলে তাদের অর্থনৈতিক উন্নয়নের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা কঠিন হয়ে পড়বে। যেহেতু সৌদি আরব এই অঞ্চলের অর্থনীতির চালিকা শক্তি, তাই পুরো উপসাগরীয় অঞ্চলের অর্থনীতিতেই এর তীব্র নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। তা ছাড়া হুতিদের কাছে ভূখণ্ড হাতছাড়া হওয়ার অর্থ হলো হরমুজ প্রণালির সংকট অব্যাহত থাকা, যা মধ্যপ্রাচ্য থেকে বিশ্বজুড়ে জ্বালানি রপ্তানি ব্যাহত করবে।
এই দ্বিতীয় দৃশ্যপটের ফল হবে একটি স্থবির অবস্থা বা অচলাবস্থা, যেখানে ‘কেউ বিজয়ী নয়, কেউ পরাজিত নয়’। তবে আড়ালে আসল লাভটা হবে ইরানের। লোহিত সাগর উপকূলে একটি ক্ষয়িষ্ণু দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ চলতে থাকলে তেহরান সামরিক ও রাজনৈতিক চাপ থেকে অনেকটাই হালকা হতে পারবে। এর ফলে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সঙ্গে বিভিন্ন সময়ের আলোচনায় ইরান ‘হুতি কার্ড’কে দর-কষাকষির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতে পারবে এবং নিজেদের শর্ত ও দাবিগুলো আরও জোরালোভাবে তুলে ধরার সুযোগ পাবে।
পরিশেষে, ইয়েমেন সংকটের একমাত্র সমাধান হলো—ইয়েমেন সরকারের নেতৃত্বে এবং একটি শক্তিশালী আঞ্চলিক জোটের সমর্থনে একটি চূড়ান্ত ও নির্ণায়ক সামরিক অভিযান। আর তা বাস্তবায়ন করতে হলে ইয়েমেন সরকারকে অবশ্যই সবার আগে নিজের ঘর সামলাতে হবে এবং তাদের মিত্রদের সঙ্গে সম্পর্ক সুদৃঢ় করতে হবে।
—আব্দুলসামাদ আলফাগি, ওয়াশিংটন সেন্টার ফর ইয়েমেন স্টাডিজের প্রতিষ্ঠাতা। (আল-জাজিরা থেকে সংক্ষেপে অনূদিত)।