ইয়েমেনের সংঘাতময় পরিস্থিতিতে সৌদি আরবের পুনরায় যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ার পেছনে রয়েছে একের পর এক কৌশলগত ভুল হিসাব। সংযুক্ত আরব আমিরাতের সঙ্গে জোটের ফাটল, হুতিদের মোকাবিলায় প্রস্তুতির অভাব এবং মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের অনিশ্চিত ভূমিকা রিয়াদকে চরম সংকটের মুখে ঠেলে দিয়েছে। সামরিক ক্ষেত্রে কিছু সাফল্য এলেও বিভক্ত মিত্রবাহিনী এবং কার্যকর রাজনৈতিক সমাধানের অভাবে এই সংঘাতের ভবিষ্যৎ এখন অনিশ্চিত।
সৌদি আরবের যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান তাঁর দেশকে বিশ্বব্যাপী বিনিয়োগ, পর্যটন এবং বিশ্বের বৃহত্তম ক্রীড়া ইভেন্টগুলোর প্রধান আকর্ষণীয় কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার স্বপ্ন দেখেছিলেন। তবে তাঁর সেই উচ্চাকাঙ্ক্ষার পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে ইরান-সমর্থিত হুতিদের ছোড়া ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র। এই হামলাগুলো এখন সৌদি আরবের বিভিন্ন শহরে আঘাত হানছে। ফলে যুবরাজ যে আঞ্চলিক অস্থিরতাকে পেছনে ফেলে সামনে এগোতে চেয়েছিলেন, এখন বাধ্য হয়ে সেই সংঘাতের গভীরেই তলিয়ে যাচ্ছে তাঁর দেশ।
গত কয়েক বছরের তুলনামূলক শান্ত পরিবেশ ভেঙে চলতি গ্রীষ্মে ইয়েমেনের গৃহযুদ্ধ নতুন করে ছড়িয়ে পড়েছে এবং গত মাসে তা আরও তীব্র রূপ নিয়েছে। দীর্ঘ ১১ বছর ধরে সৌদি আরব সামরিক শক্তি ও কূটনীতির সমন্বয়ে তাদের দক্ষিণ সীমান্তের এই সংঘাত নিয়ন্ত্রণে রাখার চেষ্টা করছিল। এই প্রক্রিয়ায় রিয়াদ প্রথমে হুতিদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করে, পরবর্তীতে শান্তি আলোচনা চালায় এবং হুতিদের প্রধান পৃষ্ঠপোষক ইরানের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক পুনরুদ্ধার করে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এত সব প্রচেষ্টা সত্ত্বেও ধারাবাহিক কিছু ভুল হিসাব-নিকাশের কারণে রিয়াদ ইয়েমেনের এই নতুন সংঘাতের মুখে নিজেদের অরক্ষিত করে ফেলেছে। ইয়েমেনের একটি প্রতিদ্বন্দ্বী সশস্ত্র গোষ্ঠীকে সমর্থন দেওয়ার কারণে গত বছরের শেষের দিকে সংযুক্ত আরব আমিরাতের (ইউএই) সঙ্গে সৌদি আরবের দীর্ঘদিনের অংশীদারত্বের অবসান ঘটে। এছাড়া সংকটের মুহূর্তে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সদিচ্ছাকে মূল্যায়ন করতেও রিয়াদ ভুল করেছে। পাশাপাশি, ইয়েমেনে হুতিদের বিরুদ্ধে লড়াইরত বিভিন্ন সশস্ত্র উপদলগুলোকে এক সুতোয় গাঁথতেও বেগ পেতে হচ্ছে সৌদি আরবকে।
বর্তমানে সৌদি আরব ইয়েমেনের হুতিবিরোধী স্থানীয় অংশীদারদের সমর্থন দিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার চেষ্টা করছে। হুতিদের বিরুদ্ধে শুরু হওয়া এই নতুন সামরিক অভিযানের নাম দেওয়া হয়েছে ‘ইয়েমেন্স ডন’ বা ‘ইয়েমেনের ভোর’।
এক দশকের বেশি সময় আগে ক্ষমতায় আসার পর থেকেই যুবরাজ বিন সালমানের সৌদি আরব পরিবর্তনের পরিকল্পনাগুলো বেশ কিছু চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। বর্তমানে সৌদির তেল অবকাঠামোয় বহুমুখী হামলার কারণে তেল রপ্তানি হ্রাস পাচ্ছে, বড় বড় প্রকল্প বাতিল করতে হচ্ছে এবং কোনো সুনির্দিষ্ট গন্তব্য ছাড়াই দেশটি একটি যুদ্ধের টানাহেঁচড়ার শিকার হচ্ছে। ফলে যুবরাজের পরিকল্পনাগুলো এখন তীব্র চাপের মুখে।
সৌদি আরবের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, চলতি সপ্তাহে দেশটির কয়েকটি বিমানবন্দরে হুতি বাহিনীর হামলায় একজন সৌদি পাইলটসহ অন্তত তিনজন নিহত হয়েছেন। আঞ্চলিক এই অস্থিরতার কারণে দেশটিতে এ বছর তারকাবহুল চলচ্চিত্র উৎসব, পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠান ও কনসার্ট স্থগিত করতে হয়েছে। অন্যদিকে, চলতি অক্টোবরের শেষে সৌদির ফ্ল্যাগশিপ আর্থিক সম্মেলন (যা মরুভূমির দাভোস নামে পরিচিত) অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা থাকলেও সাম্প্রতিক হামলার কারণে এটি এখন চরম অনিশ্চয়তার মুখে।
সৌদি আরবের লক্ষ্য ছিল ইয়েমেন সংঘাতকে যতটা সম্ভব দূরে রাখা যাতে হুতিরা তাদের রূপান্তর পরিকল্পনা ব্যাহত করতে না পারে। কিন্তু এখন রিয়াদ নিজেদের এই সংঘাতের ঠিক মাঝখানে আবিষ্কার করছে।
সৌদি আরবে নিযুক্ত সাবেক মার্কিন রাষ্ট্রদূত মাইকেল র্যাটনি সিএনএনকে বলেন, “সৌদি আরবের শুধু এতটুকুই দরকার ছিল, যেন ইয়েমেন সংঘাত তাদের থেকে যতটা সম্ভব দূরে থাকে এবং হুতিরা যেন তাদের (সৌদি আরব) রূপান্তর পরিকল্পনা ব্যাহত করতে না পারে। কিন্তু এখন রিয়াদ নিজেদের এ সংঘাতের ঠিক মাঝখানে আবিষ্কার করছে।”
গত বছর সংযুক্ত আরব আমিরাতের পাঠানো সামরিক যানের একটি চালানের ওপর সৌদি আরবের যুদ্ধবিমান হামলা চালালে দুই দেশের এক দশকের পুরোনো জোটে ফাটল ধরে। ইয়েমেনে ইরানের প্রভাব রুখতে এই দুই দেশ একসঙ্গে লড়ছিল। তবে ওই ঘটনার পর আবুধাবি তাদের সেনা প্রত্যাহার করে নিলে সৌদি আরব ইয়েমেন সংকটে কার্যত একা হয়ে পড়ে। ইউএইর সঙ্গে এই সম্পর্কচ্ছেদ পুরো অঞ্চলকে চমকে দিয়েছিল।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সৌদি আরবের আরেক বড় ভুল ছিল যুক্তরাষ্ট্রের ধারাবাহিক সমর্থনের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা। গত বছর ওয়াশিংটনের সঙ্গে একটি নতুন প্রতিরক্ষা চুক্তি সই এবং যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে ‘মেজর নন-ন্যাটো অ্যালাই’ (ন্যাটোর বাইরে গুরুত্বপূর্ণ মিত্র) হিসেবে স্বীকৃতি পাওয়ার পরও, নিজেদের নিরাপত্তার ক্ষেত্রে মার্কিন প্রতিশ্রুতি কমে যাওয়ায় রিয়াদ হতাশ হয়েছে।
এরপর সৌদি আরব তাদের প্রতিবেশীর বিরুদ্ধে এক বিরল গণমাধ্যম যুদ্ধ শুরু করে। তাদের বিরুদ্ধে সুদান ও ইয়েমেনে অস্থিতিশীলতা উসকে দেওয়ার অভিযোগ আনা হয়। সৌদির বিশ্লেষকেরা প্রকাশ্যে ইউএইকে এমন এক ছোট ভাই হিসেবে চিত্রায়িত করতে থাকেন, যে বড় ভাইয়ের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করছে।
চলতি বছরের জানুয়ারিতে প্রখ্যাত সৌদি সাংবাদিক দাউদ আল-শিরিয়ান লিখেছিলেন, সৌদি আরব হলো সেই গুরুত্বপূর্ণ শক্তি, যার ওপর আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা নির্ভর করে। তিনি আরও উল্লেখ করেন, “যদি (সৌদি আরব) হোঁচট খায়, তবে পুরো ব্যবস্থা ভেঙে পড়বে ও উপসাগরীয় অঞ্চল ছিটকে যাবে।”
রিয়াদ যখন উপসাগরীয় অঞ্চলে নিজের আধিপত্য বজায় রাখার চেষ্টা করছিল, তখন ইয়েমেনের পরিস্থিতি বদলে যায়। হুতিদের সঙ্গে চার বছরের যুদ্ধবিরতি এমনিতেই নড়বড়ে ছিল। তার ওপর রিয়াদের দাবিতে ইউএইর দ্রুত সেনা প্রত্যাহারের ফলে চরম বিভ্রান্তি তৈরি হয়। ইয়েমেনে যে হাজার হাজার যোদ্ধা এক দশক ধরে আবুধাবির অধীনে লড়াই করছিলেন, তাঁরা সৌদির নতুন কৌশল বুঝতে পারছিলেন না। আরব আমিরাতের মিত্র যোদ্ধাদের দাবি, আবুধাবির চলে যাওয়ার ফলে ইয়েমেনে যে ক্ষমতার শূন্যতা তৈরি হয়েছিল, সৌদিরা তা পূরণ করতে পারেনি।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে দক্ষিণ ইয়েমেনের এক কর্মকর্তা সিএনএনকে বলেন, “আমিরাতিরা (ইউএইর সেনা) যখন চলে যায়, তখন দায়িত্ব হস্তান্তরের প্রক্রিয়াটি সঠিকভাবে হয়নি। এরপর পরিস্থিতি কতটা বদলে গেছে, তা সত্যিই ভয়াবহ। আমিরাতের সেনা কমান্ড ও নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা ছিল অত্যন্ত দক্ষ, সৌদিরা সেই দক্ষতার বিকল্প তৈরি করতে পারেনি।”
হুতিবিরোধী বাহিনীগুলো পর্যাপ্ত সহায়তা পেয়েছিল কি না বা দায়িত্ব হস্তান্তর ঠিকঠাক হয়েছিল কি না, তা জানতে সিএনএন সৌদি সরকারের সঙ্গে যোগাযোগ করলেও কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি।
ইউএইর সেনা প্রত্যাহারের আট সপ্তাহ পরই ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে যুদ্ধ শুরু হয়, যা এই অঞ্চলে নজিরবিহীন অশান্তি ডেকে আনে। ওয়াশিংটনের এই পদক্ষেপের ফলে সৌদি আরবসহ মার্কিন মিত্ররা সরাসরি ইরানের নিশানায় পরিণত হয়। অনেক বিশেষজ্ঞের মতে, সৌদির জন্য ওই সময়টা ছিল অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনক। ইয়েমেনে ইউএই-মদদপুষ্ট বিচ্ছিন্নতাবাদীদের চাপ সামলানোর পরপরই সৌদি আরবকে এই আঞ্চলিক যুদ্ধের মুখোমুখি হতে হয়। ইরানের ওপর ট্রাম্পের ক্রমাগত চাপের ফলে ইরানপন্থী হুতিরা যে সৌদির ওপর চড়াও হবে, তা প্রায় নিশ্চিত ছিল।
সাবেক মার্কিন রাষ্ট্রদূত র্যাটনি বলেন, “নিজেদের ভূখণ্ডে শত্রু বাহিনীর হামলার পর সৌদিদের পাল্টা জবাব দেওয়া ছাড়া উপায় ছিল না...তাই এখানে একটি প্রতিক্রিয়া হওয়াটা অবধারিত ছিল।”
পূর্ব দিক থেকে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র সৌদিতে আঘাত হানলেও রিয়াদের পুরো মনোযোগ ছিল দক্ষিণে ইয়েমেন সীমান্তে। হুতিরা তখনো সৌদির সঙ্গে আনুষ্ঠানিক যুদ্ধবিরতিতে থাকায় প্রথমে তাদের ইরানি মিত্রদের সাহায্য করতে অনিচ্ছুক বলে মনে হচ্ছিল। তবে তেহরান শেষ পর্যন্ত সৌদিদের এই যুদ্ধে টেনে আনে।
যে সামরিক বাহিনী মার্কিন অংশীদারত্বের ওপর ভিত্তি করে তাদের ‘সমগ্র বিশ্বদর্শন’ গড়ে তুলেছে, সেই সৌদিরা এখন বুঝতে পারছে ট্রাম্প কতটা অপ্রত্যাশিত। নিজেদের শক্তিতে একা এই যুদ্ধগুলো লড়া কখনোই তাদের সামরিক কৌশল বা কাঠামোর মধ্যে ছিল না।
গত জুলাইয়ে ইয়েমেনে সৌদির বিমান অবরোধ অমান্য করে হুতিদের একটি প্রতিনিধিদলকে তেহরানে ইরানের সর্বোচ্চ নেতার জানাজায় নিয়ে আসার জন্য একটি বাণিজ্যিক বিমান পাঠায় ইরান। বিমানটিকে অবতরণে বাধা দিতে সানা বিমানবন্দরে বিমান হামলা চালায় রিয়াদ। এর জবাবে বিদ্রোহী হুতি গোষ্ঠী যুদ্ধবিরতি বাতিলের ঘোষণা দেয় এবং সৌদির জাহাজের ওপর নৌ অবরোধ আরোপ করে। একই সঙ্গে তারা লোহিত সাগরের ইয়েমেন উপকূলজুড়ে এক ঝটিকা অভিযান শুরু করে এবং গুরুত্বপূর্ণ বাব আল-মানদেব প্রণালিসহ কৌশলগত অঞ্চলগুলো নিয়ন্ত্রণে নেয়। ২০২২ সালের পর এটিই ছিল ইয়েমেনের সবচেয়ে বড় সংঘাত।
হুতিরা সৌদির তেল অবকাঠামো ও পাইপলাইনে হামলা চালালে অপরিশোধিত তেল সরবরাহ ব্যাহত হয় এবং তেলের দাম দ্রুত বৃদ্ধি পায়। জবাবে সৌদি বাহিনীও হুতিদের লক্ষ্য করে শত শত বিমান হামলা চালায়।
ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের ইয়েমেন-বিষয়ক জ্যেষ্ঠ বিশ্লেষক আহমেদ নাগি সিএনএনকে বলেন, “সৌদি আরব বেশ কিছু ভুল ও ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে।” রিয়াদ হুতিদের এমন আকস্মিক আক্রমণের জন্য প্রস্তুত ছিল না এবং মিত্র ইয়েমেনি সরকারি বাহিনীর সঙ্গে তাদের কোনো সমন্বয় ছিল না বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
আহমেদ নাগি আরও বলেন, “(ইয়েমেনে) যেসব অঞ্চল হাতছাড়া হয়েছে, তার ফলে মিত্রদের মনোবল ভেঙে গেছে। এটি এখন সৌদিদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। কারণ, হুতিদের কাছে এখন আরও উন্নত অস্ত্র রয়েছে, যা সৌদির বেশ কয়েকটি শহরে আঘাত হানতে সক্ষম।”
বিশেষজ্ঞদের মতে, সৌদি আরবের আরেকটি বড় ভুল ছিল যুক্তরাষ্ট্রের ধারাবাহিক সমর্থনের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা। গত বছর ওয়াশিংটনের সঙ্গে একটি নতুন প্রতিরক্ষা চুক্তি সই এবং যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে ‘মেজর নন-ন্যাটো অ্যালাই’ (ন্যাটোর বাইরে গুরুত্বপূর্ণ মিত্র) হিসেবে স্বীকৃতি পাওয়ার পরও, নিজেদের নিরাপত্তার ক্ষেত্রে মার্কিন প্রতিশ্রুতি কমে যাওয়ায় রিয়াদ হতাশ হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাতে সিএনএন জানায়, গত মাসে যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে দুবার ফোনে কথা বলেন এবং হুতিদের ওপর হামলা চালানোর অনুরোধ জানান। তবে ট্রাম্প এই যুদ্ধে জড়াতে অস্বীকৃতি জানান। উল্টো ওয়াশিংটন ওমানে হুতিদের সঙ্গে বৈঠকে বসে। এই বৈঠকের মূল উদ্দেশ্য ছিল হুতিদের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের নিজস্ব যুদ্ধবিরতি রক্ষা করা। হুতিরাও স্পষ্ট করে দেয় যে তাদের লড়াই শুধু সৌদি আরবের বিরুদ্ধে। ফলে লোহিত সাগরে মার্কিন জাহাজগুলো কোনো বাধা ছাড়াই অবাধে চলাচলের সুযোগ পায়।
সাবেক মার্কিন রাষ্ট্রদূত মাইকেল র্যাটনি বলেন, যে সামরিক বাহিনী মার্কিন অংশীদারত্বকে কেন্দ্র করে তাদের ‘সমগ্র বিশ্বদর্শন’ গড়ে তুলেছে, সেই সৌদিরা এখন বুঝতে পারছে ট্রাম্প কতটা অপ্রত্যাশিত।
র্যাটনি আরও বলেন, “নিজেদের শক্তিতে একা একা এ যুদ্ধগুলো লড়া কখনোই তাদের সামরিক কৌশল বা কাঠামোর মধ্যে ছিল না। সাধারণ কোনো মার্কিন প্রেসিডেন্টের আমলে এমন পরিস্থিতি হলে, আমরা একটি যৌক্তিক ও সুচিন্তিত প্রক্রিয়ার মাধ্যমে আমাদের অংশীদারকে (সৌদি আরব) সাহায্য করতাম।”
র্যাটনি বলেন, “এখন আমাদের সেই প্রক্রিয়া নেই এবং সবকিছু শেষ পর্যন্ত একটি বিষয়ের ওপরই এসে ঠেকেছে, তা হলো ট্রাম্প কী ভাবছেন? আর এর ফলেই সৌদি আরব সম্ভবত নিজেদের অরক্ষিত বোধ করছে।”
এমন পরিস্থিতিতে সৌদি আরব এখন অন্য দিকে নজর দিয়েছে। গত মাসে সৌদি যুবরাজ মিসরের প্রেসিডেন্ট আবদেল ফাত্তাহ আল-সিসির সঙ্গে দেখা করতে কায়রো যান। এর কয়েক সপ্তাহ পর আঞ্চলিক পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনার জন্য সংযুক্ত আরব আমিরাতের ভাইস প্রেসিডেন্ট শেখ মনসুর বিন জায়েদকে রিয়াদে আমন্ত্রণ জানান। ফ্রান্স তাদের সামরিক কর্মীসহ প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম মোতায়েনে রাজি হয়েছে। যুক্তরাজ্য বলেছে, সৌদি যুদ্ধবিমানে জ্বালানি সরবরাহের জন্য তারা উড়োজাহাজ পাঠাবে। এছাড়া নবগঠিত যৌথ বাহিনী কমান্ডের অধীনে গোয়েন্দা তথ্য ও লক্ষ্যবস্তু নির্ধারণে সহায়তার জন্য বর্তমানে ১০০ জনের বেশি মার্কিন সামরিক উপদেষ্টা সৌদিতে কাজ করছেন।
রিয়াদে এক জরুরি বৈঠকের পর গত সোমবার সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তান ‘মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি’র অধীন ‘সম্মিলিত প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা সক্রিয় করতে’ সম্মত হয়েছে। চলতি বছরের শুরুতে করা এই চুক্তির উদ্দেশ্য তিন দেশের মধ্যে প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তা সহযোগিতা বৃদ্ধি করা। এছাড়া ইউএইর অনুগত ইয়েমেনি বাহিনীও হুতিবিরোধী এই অভিযানে অংশ নিচ্ছে বলে মনে হচ্ছে, যা সৌদি ও ইউএইর মধ্যকার সম্পর্কের বরফ গলার আভাস দিচ্ছে।
তবে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, বাইরের দেশের সমর্থন এবং সৌদি-সমর্থিত ইয়েমেন সরকারের প্রাথমিক সাফল্য এই সংঘাতের স্থায়ী সমাধান করতে পারবে না। বিভিন্ন সশস্ত্র উপদলের মধ্যে অভ্যন্তরীণ কোন্দল এখনো সাধারণ বিষয় এবং যুদ্ধের কোনো সুনির্দিষ্ট রাজনৈতিক পরিণতি এখনো দৃশ্যমান নয়।
বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের সমর্থনপুষ্ট হুতি বাহিনীর বিরুদ্ধে দীর্ঘমেয়াদি লড়াই চালিয়ে যেতে হলে সুশৃঙ্খল সংগঠন, আঞ্চলিক সমর্থন, তহবিল ও লজিস্টিকস বা রসদ সহায়তার প্রয়োজন, যা বর্তমান সৌদি জোট ধরে রাখতে পারবে কি না, তা নিশ্চিত নয়।
ইউরোপিয়ান ইনস্টিটিউট অব পিসের ইয়েমেন-বিষয়ক জ্যেষ্ঠ উপদেষ্টা হিশাম আল-ওমাইসি সিএনএনের বেকি অ্যান্ডারসনকে বলেন, “তাদের কমান্ড সেন্টারগুলো একীভূত করতে হবে এবং এ জোটের ভেতরের বিভিন্ন উপদলের মধ্যে যে সমস্যাগুলো রয়েছে, সেগুলোর সমাধান করতে হবে। সৌদি-সমর্থিত ইয়েমেন সরকার যদি (হুতিদের কাছ থেকে) মুক্ত করা অঞ্চলের ওপর নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে না পারে, তবে এ ভূখণ্ডগত অর্জনের কোনো মূল্য থাকবে না।”
অনেক বিশেষজ্ঞ মনে করেন, ইয়েমেনের এই লড়াই মূলত ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধের সঙ্গে যুক্ত। আর ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যকার এই সংঘাত যত দিন চলবে, তত দিন সৌদি আরবকে বিপর্যস্ত রাখতে হুতিদের উসকে দেওয়ার শক্তিশালী কারণ ইরানের থাকবে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই পরিস্থিতিতে উপসাগরীয় দেশগুলো ইরানের সঙ্গে আলাদা কূটনৈতিক সমাধানে পৌঁছানোর চেষ্টা করতে পারে অথবা হুতি নেতৃত্বকে নির্মূল করতে তাদের সামরিক হামলা আরও জোরদার করতে পারে।
তবে র্যাটনি বলেন, “এ দুটি পরিস্থিতির কোনোটিই নিকট ভবিষ্যতে ইয়েমেন সংঘাতের স্থায়ী সমাধান করবে না। সৌদি আরবকে শুধু একটি ত্রুটিপূর্ণ পথ ধরেই সামনের দিকে এগিয়ে যাওয়ার উপায় খুঁজতে হবে।”