সৌদি আরবের রিয়াদে অবস্থিত কিং খালেদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ইয়েমেনের সশস্ত্র গোষ্ঠী হুতিদের চালানো এক ভয়াবহ হামলায় অন্তত ১২ জন নিহত এবং ৩০০ জন আহত হয়েছেন। সৌদি আরব কর্তৃপক্ষ এই হতাহতের তথ্য নিশ্চিত করেছে। চলতি সপ্তাহের মধ্যে ওই বিমানবন্দরটিতে এটি তৃতীয় হামলা। উল্লেখ্য, এক দশকেরও বেশি সময়ের মধ্যে সৌদি আরবে এটিই সবচেয়ে প্রাণঘাতী হামলা হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে।

গত শনিবার সংঘটিত এই হামলায় নিহতদের মধ্যে চারজন সৌদি নাগরিক রয়েছেন। এছাড়া নিহতদের তালিকায় রয়েছেন দুজন বাংলাদেশি এবং যুক্তরাষ্ট্র, জর্ডান, ফিলিস্তিন, সিরিয়া, সুদান ও মিসরের একজন করে নাগরিক। সৌদি বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ এই বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করেছে।

ইয়েমেনে চলমান তীব্র যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে এই হামলার ঘটনা ঘটল। দেশটির সরকারি বাহিনীর সঙ্গে হুতিদের লড়াই দীর্ঘকাল ধরে চলছে। ইরান-সমর্থিত এই গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে যুদ্ধে ইয়েমেন সরকারকে সহায়তা করতে সৌদি আরব বিমান হামলা পরিচালনা করছে।

রিয়াদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে হুতিদের এই নৃশংস হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়েছে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ ও আন্তর্জাতিক সংস্থা। তাদের প্রতিক্রিয়াগুলো নিচে তুলে ধরা হলো—

যুক্তরাষ্ট্র
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এই হামলাকে ‘ভয়াবহ’ বলে বর্ণনা করেছেন। তিনি জানিয়েছেন, সৌদি আরবের কার্যত শাসক যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের সঙ্গে খুব শীঘ্রই তিনি এই বিষয়ে আলোচনা করবেন। পাশাপাশি হুতিদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের যোগ দেওয়া উচিত কি না, তা-ও তিনি বিবেচনা করছেন।

ট্রাম্প বলেন, ‘আমরা যোগ দিতে পারি। বিষয়টি খতিয়ে দেখব। আমরা মাত্রই হামলার খবর পেয়েছি। তাই সিদ্ধান্ত নেব, খুব দ্রুত পদক্ষেপ নেব।’

মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও জানান, হুতিদের এই হামলায় একজন মার্কিন নাগরিক নিহত হয়েছেন। তিনি হুতিদের প্রতি অবিলম্বে হামলা বন্ধের আহ্বান জানান। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে রুবিও লিখেছেন, ‘আমরা সৌদি আরব ও দেশটির জনগণের পাশে আছি। নিহত ব্যক্তিদের এবং তাঁদের পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানাচ্ছি।’

জাতিসংঘ
জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস এক্সে দেওয়া এক বিবৃতিতে জানিয়েছেন, রিয়াদের কিং খালেদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে গতকাল হুতিদের প্রাণঘাতী হামলার ঘটনায় তিনি গভীরভাবে মর্মাহত। তিনি এই হামলার তীব্র নিন্দা ব্যক্ত করেন।

গুতেরেস বলেন, “বেসামরিক মানুষ ও বেসামরিক অবকাঠামোয় হামলা আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন। এ ধরনের হামলা অবিলম্বে বন্ধ করতে হবে।”

ইয়েমেনবিষয়ক জাতিসংঘের বিশেষ দূত হান্স গ্রুন্ডবার্গ বলেন, সৌদি আরবের বেসামরিক বিমানবন্দরগুলোতে প্রাণঘাতী হামলা সংঘাতকে আরও উসকে দিয়েছে। এক বিবৃতিতে তিনি উল্লেখ করেন, এ ধরনের পদক্ষেপ আঞ্চলিক নিরাপত্তার জন্য গুরুতর হুমকি। এটি সহিংসতার চক্রকে দীর্ঘায়িত করবে এবং ইয়েমেনে শান্তি প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টাকে আরও জটিল করবে।

মিসর
হুতিদের এই হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়েছে মিসরের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। এক বিবৃতিতে মন্ত্রণালয়টি বলেছে, এ হামলা আন্তর্জাতিক আইনের স্পষ্ট লঙ্ঘন এবং এর মাধ্যমে নাগরিকদের নিরাপত্তাকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখানো হয়েছে।

কাতার
কাতারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ও এই হামলার নিন্দা জানিয়েছে। তারা এই ঘটনাকে সৌদি আরবের সার্বভৌমত্বের ওপর গুরুতর আঘাত এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তা, বেসামরিক মানুষের জীবন, বেসামরিক স্থাপনা ও আকাশপথে চলাচলের জন্য সরাসরি হুমকি হিসেবে বর্ণনা করেছে। কাতার সৌদি আরবের প্রতি পূর্ণ সংহতি প্রকাশ করেছে। দেশটির সার্বভৌমত্ব, নিরাপত্তা ও ভূখণ্ডের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে সৌদি আরবের নেওয়া ‘সব বৈধ পদক্ষেপের’ প্রতিও সমর্থন জানিয়েছে দোহা।

পাকিস্তান
হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ। তিনি এই ঘটনাকে ‘জঘন্য হামলা’ বলে অভিহিত করেন। এক্সে দেওয়া পোস্টে শাহবাজ শরিফ লিখেছেন, ‘বেসামরিক মানুষ ও গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো লক্ষ্য করে হামলা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। এ ধরনের হামলা আঞ্চলিক শান্তি ও স্থিতিশীলতার জন্য গুরুতর হুমকি।’ সৌদি আরবের সার্বভৌমত্ব ও ভৌগোলিক অখণ্ডতার প্রতি পাকিস্তানের অঙ্গীকারও তিনি পুনর্ব্যক্ত করেন।

জর্ডান
হামলার ঘটনায় সৌদি বাদশাহ সালমান ও যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের প্রতি সমবেদনা জানিয়েছেন জর্ডানের বাদশাহ দ্বিতীয় আবদুল্লাহ। তিনি সৌদি আরবের প্রতি পূর্ণ সংহতি প্রকাশ করেন। জর্ডানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় হুতিদের হামলার নিন্দা জানিয়ে এটিকে ‘বিপজ্জনক উত্তেজনা বৃদ্ধি’ এবং আন্তর্জাতিক আইনের ‘সুস্পষ্ট লঙ্ঘন’ বলে বর্ণনা করেছে।

ওমান
ওমানও এই হামলার নিন্দা জানিয়েছে। দেশটির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, প্রজ্ঞা ও সংযমকে অগ্রাধিকার দিতে হবে এবং এমন পদক্ষেপ এড়িয়ে চলতে হবে, যা সংঘাত আরও বাড়িয়ে দিতে পারে। দেশটি মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখার জোর দাবি জানিয়েছে।

ফিলিস্তিন
ফিলিস্তিনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সৌদি আরবের প্রতি পূর্ণ সংহতি প্রকাশ করেছে। দেশটির নিরাপত্তা, সার্বভৌমত্ব এবং নাগরিকদের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে সৌদি আরবের নেওয়া সব পদক্ষেপের প্রতি সমর্থন জানিয়েছে তারা।

সিরিয়া
সিরিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এই হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়েছে। এক বিবৃতিতে মন্ত্রণালয়টি বলেছে, বেসামরিক স্থাপনায় হামলা বন্ধ করতে এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তার জন্য হুমকি মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে ‘কার্যকর পদক্ষেপ’ নিতে হবে।

ভারত
ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় রিয়াদের কিং খালেদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে হুতিদের এই হামলাকে কাপুরুষোচিত হামলা বলে বর্ণনা করেছে। মন্ত্রণালয়টি বলেছে, বেসামরিক মানুষের ওপর হামলা সম্পূর্ণ অগ্রহণযোগ্য এবং তা অবিলম্বে বন্ধ করতে হবে।

জাপান
সৌদি আরবে অবস্থিত জাপানের দূতাবাস হুতিদের হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়েছে। দূতাবাসটি বলেছে, বেসামরিক মানুষের ওপর হামলা কোনো পরিস্থিতিতেই মেনে নেওয়া যায় না।

কানাডা
সৌদি আরবে হুতিদের হামলার নিন্দা জানিয়েছেন কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি। এক্সে দেওয়া পোস্টে তিনি লিখেছেন, “বেসামরিক অবকাঠামোয় হামলার কোনো যুক্তি থাকতে পারে না।” তিনি আরও বলেন, কানাডা এ ধরনের বেপরোয়া সহিংসতার তীব্র নিন্দা জানায়।

মালয়েশিয়া
মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিম এই হামলার নিন্দা জানিয়েছেন। এক্সে দেওয়া পোস্টে তিনি লিখেছেন, ‘বেসামরিক মানুষ ও বেসামরিক অবকাঠামো লক্ষ্য করে হামলার কোনো যুক্তি থাকতে পারে না।’