সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদের কিং খালেদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ইয়েমেনের ইরান-সমর্থিত হুতি সশস্ত্র গোষ্ঠীর চালানো এক ভয়াবহ হামলায় ১২ জন নিহত হয়েছেন। সৌদি কর্তৃপক্ষের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, নিহতদের মধ্যে দুজন বাংলাদেশি নাগরিক রয়েছেন। গতকাল শনিবার সংঘটিত এই প্রাণঘাতী হামলায় আরও ৩০৯ জন আহত হয়েছেন বলে জানা গেছে।

হুতি গোষ্ঠীর জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা মোহাম্মদ আল-বুখাইতি গতকাল রিয়াদের এই বিমানবন্দর হামলার দায় স্বীকার করেছেন। তাঁর দাবি, ইয়েমেনে সৌদি আরবের চালানো হামলার পাল্টা জবাব হিসেবেই এই অভিযান চালানো হয়েছে। তিনি আরও অভিযোগ করেন যে, সৌদি আরবের হামলায় বেসামরিক অবকাঠামোকেও লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে।

চলতি সপ্তাহে কিং খালেদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে এটি তৃতীয়বারের মতো হামলা চালানো হলো। এই ঘটনার পরপরই বিমানবন্দরের যাবতীয় কার্যক্রম সাময়িকভাবে স্থগিত করা হয়েছে এবং সব ফ্লাইট অন্য বিমানবন্দরে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে।

সৌদি আরবের বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ এক্সে দেওয়া এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, “বিমানবন্দরে হামলার ঘটনায় অন্তত ১২ জন নিহত হয়েছেন।” বিবৃতিতে আরও উল্লেখ করা হয় যে, নিহতদের মধ্যে সৌদি আরবের চারজন, বাংলাদেশের দুজন এবং যুক্তরাষ্ট্র, জর্ডান, ফিলিস্তিন, সিরিয়া, সুদান ও মিসরের একজন করে নাগরিক রয়েছেন।

ঘটনা সম্পর্কে অবগত সূত্রগুলো জানিয়েছে, আহতদের দ্রুত অ্যাম্বুলেন্স ও হেলিকপ্টারে করে হাসপাতালে নেওয়া হলে সেখানে ব্যাপক ভিড় তৈরি হয়। আহতদের মধ্যে বেশ কয়েকজনের শারীরিক অবস্থা অত্যন্ত আশঙ্কাজনক বলে জানা গেছে।

উল্লেখ্য, গতকালের এই হামলার আগে কোনো ধরনের আগাম সতর্কবার্তা দেওয়া হয়নি। সৌদি আরবের হুমকি শনাক্তকরণ ও সতর্কীকরণ ব্যবস্থাও কোনো সংকেত প্রদান করেনি। এর আগে চলতি সপ্তাহে কিং খালেদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে দুটি পৃথক হামলায় চারজন নিহত হয়েছিলেন। এছাড়া বিমানবন্দরের রানওয়েতে অবস্থানরত সৌদি আরবের একটি বাণিজ্যিক উড়োজাহাজেরও ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে গতকাল বিমানবন্দরে উপস্থিত একজন প্রত্যক্ষদর্শী জানান, তিনি বিস্ফোরণ ঘটতে দেখেছেন। এরপর বিমানবন্দরের ভেতরে বেশ কয়েকজনকে আহত অবস্থায় মাটিতে পড়ে থাকতে দেখেন। তিনি আরও জানান, এক ডজনের বেশি অ্যাম্বুলেন্সকে দ্রুত গতিতে বিমানবন্দরের দিকে যেতে দেখা গেছে। রয়টার্সের যাচাই করা একটি ভিডিওতেও বিমানবন্দরে অসংখ্য অ্যাম্বুলেন্সের আনাগোনা দেখা গেছে।

আহত একজন যাত্রী নাম প্রকাশ না করার শর্তে রয়টার্সকে বলেন, “বিমানবন্দরের বাইরে আকাশে কোনো কিছুকে উড়ে যেতে দেখেছিলেন তিনি। এরপর বের হওয়ার ফটকের কাছে ছাদের একটি অংশ ধসে পড়েছে।”

অন্যদিকে, বিমানবন্দরের অভ্যন্তরীণ টার্মিনালে হামলার ঘটনা প্রত্যক্ষ করা একজন যাত্রী বার্তা সংস্থা এএফপিকে বলেন, “আমি ৪০৩ নম্বর গেটে ছিলাম। ৪০১ নম্বর গেটে হামলা হতে দেখেছি। নিজের চোখের সামনে আহত মানুষ দেখেছি। সবাই দৌড়াদৌড়ি করছিল।”

চিকিৎসা-সংক্রান্ত একটি সূত্র জানিয়েছে, এই ভয়াবহ হামলার পরিপ্রেক্ষিতে স্বাস্থ্য কর্মকর্তারা ‘গুরুতর জরুরি পরিস্থিতি’ সামাল দিতে চিকিৎসকদের জরুরি ভিত্তিতে তলব করেছেন।

এদিকে রিয়াদের এই হামলার কয়েক ঘণ্টা পর হুতিদের বিরুদ্ধে লড়াইরত সৌদি নেতৃত্বাধীন আন্তর্জাতিক জোটের একজন মুখপাত্র সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে জানিয়েছেন, দাম্মামের কিং ফাহাদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কাছে একটি ‘প্রজেক্টাইল’ আঘাত হেনেছে। এরপর আজ রোববার ভোরের দিকে জোট জানিয়েছে, তারা রাজধানীর দক্ষিণ-পূর্বে একটি ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করতে সক্ষম হয়েছে।

সৌদি আরবের বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, কিং খালেদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ নিরূপণের কাজ বর্তমানে চলছে। এই কারণে সাময়িকভাবে বিমানবন্দরের কার্যক্রম বন্ধ রাখা হয়েছে।

ফ্লাইট পর্যবেক্ষণকারী ওয়েবসাইট ফ্লাইটরাডার২৪-এর তথ্য অনুযায়ী, রিয়াদগামী সব ফ্লাইট অন্য বিমানবন্দরে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে অথবা বাতিল করা হয়েছে। একপর্যায়ে বিমানবন্দরের ওপর দিয়ে শুধু একটি হেলিকপ্টারকে চক্কর দিতে দেখা গেছে। ফ্লাইটরাডার২৪ আরও জানিয়েছে, গতকাল ১৫৫টি আগমনী ও ১৬১টি বহির্গামী ফ্লাইট বাতিল করা হয়েছে। এ ছাড়া মোট ২২২টি ফ্লাইটের উড্ডয়ন ও অবতরণে দেরি হয়েছে।

গত বৃহস্পতিবার এবং চলতি সপ্তাহের শুরুর দিকে হুতিদের ধারাবাহিক হামলার কারণে বেশ কয়েকটি আন্তর্জাতিক উড়োজাহাজ সংস্থা সৌদি আরবের রাজধানীতে তাদের ফ্লাইট স্থগিত বা বাতিল করেছে।