শখের বশে মাছ ধরার প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়েছিলেন সাজু আলম। তবে এই নেশার পেছনে খরচ হয়েছিল মোটা অঙ্কের টাকা; টিকিট কাটতেই ব্যয় করতে হয়েছে ২৬ হাজার টাকা। সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত দীর্ঘ সময় ধরে বরশি ফেললেও মাছের দেখা পাননি তিনি। যখন প্রায় হাল ছেড়ে দেওয়ার কথা ভাবছিলেন, ঠিক সেই শেষ মুহূর্তেই তার বরশিতে ধরা পড়ে সাড়ে চার কেজির বেশি ওজনের একটি কাতলা। আর এই একটি মাছই তাকে এনে দেয় প্রতিযোগিতার প্রথম পুরস্কার হিসেবে দুই লাখ টাকা।
গত শুক্রবার (১৬ অক্টোবর) ব্রাহ্মণিয়ার সরাইল উপজেলার কালীকচ্ছ ইউনিয়নের দত্তপাড়ার বীরেশ দিঘিতে দিনব্যাপী এই মাছ ধরার প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হয়। ভোর সোয়া ছয়টায় শুরু হওয়া এই প্রতিযোগিতা শেষ হয় বিকেল সাড়ে পাঁচটায়। বিকেল সাড়ে চারটার দিকে সাজু আলমের বরশিতে সেই ভাগ্য বদলে দেওয়া মাছটি ধরা পড়ে।
এই প্রতিযোগিতায় অংশ নিতে মোট ২৬ জন শৌখিন মৎস্যশিকারি অংশ নেন, যাদের প্রত্যেকে ২৬ হাজার টাকা করে টিকিট কেটেছিলেন। টিকিট বিক্রির মাধ্যমে আয়োজকদের মোট আয় হয় ৬ লাখ ৭৬ হাজার টাকা। প্রতিযোগীদের জন্য মোট ৪ লাখ ৭০ হাজার টাকার ছয়টি পুরস্কারের ব্যবস্থা রাখা হয়েছিল।
প্রথম পুরস্কার জয়ী ৫০ বছর বয়সী সাজু আলম ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর উপজেলার বুধল ইউনিয়নের নন্দনপুর এলাকার বাসিন্দা। নিজের অনুভূতি ব্যক্ত করে তিনি বলেন, “সারা দিন ভাবছিলাম খালি হাতে ফিরতে হবে। কিন্তু শেষ মুহূর্তে একটি কাতলা পেয়েই প্রথম পুরস্কার দুই লাখ টাকা জিতে গেলাম। অনুভূতি খুব ভালো।”
শুক্রবার সরেজমিনে দেখা যায়, ভোর থেকেই দিঘির চারপাশে ২৬টি মাচায় বসে বরশি দিয়ে মাছ ধরছিলেন প্রতিযোগীরা। লটারির মাধ্যমে তাদের আসন নির্ধারণ করা হয়েছিল। কেউ কেউ মাছের খাবার প্রস্তুত করছিলেন, আবার কেউ দিঘিতে বরশি ফেলছিলেন। যখনই কোনো বড় মাছ ধরা পড়ত, তখনই মাচা থেকে ভেসে আসত উল্লাসধ্বনি। শিকারি এবং তাদের সহযোগীরা আনন্দে মেতে উঠতেন।
জানা গেছে, ব্রাহ্মণিয়ার বিভিন্ন উপজেলা ছাড়াও ঢাকা, কিশোরগঞ্জ ও হবিগঞ্জ থেকে প্রতিযোগীরা এই ইভেন্টে অংশ নিতে এসেছেন। টিকিটের ২৬ হাজার টাকা ছাড়াও একজন শিকারিকে আনুষঙ্গিক খাতে আরও ১০ থেকে ১২ হাজার টাকা খরচ করতে হয়। অনেক ক্ষেত্রে মাচার মালিকরা ভাড়া করে শিকারি নিয়ে আসেন, যাদের পারিশ্রমিক হিসেবে ৩ থেকে ৫ হাজার টাকা দেওয়া হয়।
প্রতিযোগিতায় দ্বিতীয় স্থান অধিকার করেছেন কিশোরগঞ্জের হোসেনপুর উপজেলার ইলিয়াছ হোসেন। শুক্রবার সকাল নয়টার দিকে ৪ কেজি ৬৭৫ গ্রাম ওজনের একটি কাতলা ধরে তিনি এক লাখ টাকার পুরস্কার জিতে নেন। অন্যদিকে, ৪ কেজি ৬৯৫ গ্রাম ওজনের কাতলা ধরে প্রথম স্থান দখল করা সাজু আলমের পুরস্কারের পরিমাণ ছিল দুই লাখ টাকা।
এছাড়া হবিগঞ্জের মাধবপুর উপজেলার মনতলা এলাকার কাউছার মিয়া ৪ কেজি ৫১০ গ্রাম ওজনের কাতলা ধরে ৫০ হাজার টাকার তৃতীয় পুরস্কার পান। ব্রাহ্মণবাড়িয়া শহরের মেড্ডা এলাকার ইয়াছিন মিয়া ৩ কেজি ৮৩০ গ্রাম ও ৩ কেজি ৮১৫ গ্রাম ওজনের দুটি কাতলা ধরে যথাক্রমে চতুর্থ ও ষষ্ঠ স্থান অর্জন করেন। এই দুটি পুরস্কার মিলিয়ে তিনি মোট ৮০ হাজার টাকা পান। একই এলাকার আওলাদ হোসেন ৩ কেজি ৮৩০ গ্রাম ওজনের কাতলা ধরে পঞ্চম হয়ে ৪৫ হাজার টাকা পুরস্কার পান।
প্রায় পৌনে তিন একর আয়তনের বীরেশ দিঘিটির মালিক সরাইল উপজেলার কালীকচ্ছ ইউনিয়নের দত্তপাড়া (কলেজপাড়া) গ্রামের প্রয়াত বীর মুক্তিযোদ্ধা মোহাম্মদ আলীর পরিবার। এই পরিবারটির কাছ থেকে ‘সরাইল মৎস্য চাষ প্রকল্প’ নামের একটি সমিতি ৯০ লাখ টাকায় দিঘিটি বন্ধক নিয়েছে। এই সমিতিটি প্রতিবছর এখানে কয়েকবার মাছ ধরার প্রতিযোগিতার আয়োজন করে থাকে। এ বছর এটি ছিল সপ্তম আয়োজন।
সরাইল মৎস্য চাষ প্রকল্পের সভাপতি আলী মিয়া জানান, প্রতিবছরই এখানে মাছ ধরার আয়োজন করা হয়। দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে শৌখিন মৎস্যশিকারিরা অত্যন্ত উৎসাহের সঙ্গে এতে অংশ নেন।