সাজু আলম একজন শৌখিন মৎস্যশিকারি। আজ শুক্রবার ভোরে তিনি একটি মাছ ধরার প্রতিযোগিতায় অংশ নেন। এই প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণের জন্য টিকিট বাবদ তাঁকে ব্যয় করতে হয়েছে ২৬ হাজার টাকা। মাছ ধরার নির্ধারিত সময় ছিল সন্ধ্যা সাড়ে পাঁচটা পর্যন্ত। দুপুর পেরিয়ে গেলেও দীর্ঘ সময় ধরে সাজু কোনো মাছ ধরতে সক্ষম হননি। তবে প্রতিযোগিতার শেষ এক ঘণ্টা বাকি থাকল যখন, অর্থাৎ বিকেল সাড়ে চারটার দিকে তাঁর বড়শিতে ধরা পড়ে সাড়ে চার কেজি ওজনের একটি কাতলা মাছ। এই একটি মাছের মাধ্যমেই তিনি প্রতিযোগিতায় প্রথম স্থান অধিকার করেন এবং পুরস্কার হিসেবে জিতে নেন দুই লাখ টাকা।
ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সরাইল উপজেলার কালীকচ্ছ ইউনিয়নের দত্তপাড়ার বীরেশ দিঘিতে আজ শুক্রবার ভোর সোয়া ছয়টায় এই প্রতিযোগিতার সূচনা হয় এবং শেষ হয় বিকেল সাড়ে পাঁচটায়। প্রতিযোগিতায় অংশ নিতে ২৬ জন প্রতিযোগী প্রত্যেকে ২৬ হাজার টাকা দিয়ে টিকিট সংগ্রহ করেন। এর ফলে আয়োজকদের মোট আয় হয় ৬ লাখ ৭৬ হাজার টাকা। অন্যদিকে, ২৬ জন প্রতিযোগীর জন্য মোট ৪ লাখ ৭০ হাজার টাকার ৬টি পুরস্কারের ব্যবস্থা করা হয়েছিল।
প্রথম পুরস্কার বিজয়ী সাজু আলম (৫০) ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর উপজেলার বুধল ইউনিয়নের নন্দনপুর এলাকার বাসিন্দা। তাঁর অনুভূতি ব্যক্ত করে তিনি মুক্তকণ্ঠকে বলেন, ‘সারা দিন ভাবছিলাম, খালি হাতে ফিরে যাব। কিন্তু শেষ মুহূর্তে এক কাতলা পেয়েই প্রথম পুরস্কার দুই লাখ টাকা জিতেছি। এখন ভালোই লাগছে।’
আজকের সরেজমিন পর্যবেক্ষণে দেখা যায়, বীরেশ দিঘিতে ভোর থেকে দিনব্যাপী বড়শি দিয়ে মাছ ধরার এই প্রতিযোগিতা চলছিল। দিঘির চারপাশের ২৬টি মাচায় বসে শিকারিরা অত্যন্ত তীক্ষ্ণদৃষ্টিতে মাছ ধরার চেষ্টায় ব্যস্ত ছিলেন। লটারির মাধ্যমে তাঁদের বসার আসন নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছিল। কেউ কেউ মাছের খাবার প্রস্তুত করছিলেন, আবার কেউ দিঘির পানিতে বড়শি ফেলছিলেন। মাঝেমধ্যেই মাচাগুলো থেকে উচ্চস্বরে আওয়াজ উঠছিল। বড় মাছ ধরার উত্তেজনায় শিকারি এবং তাঁদের সহযোগীরা ‘বড় মাছ, বড় মাছ’ বলে হইহুল্লোড় করছিলেন।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার বিভিন্ন উপজেলা ছাড়াও ঢাকা, কিশোরগঞ্জ ও হবিগঞ্জ থেকে অনেক মৎস্যশিকারি এই প্রতিযোগিতায় অংশ নিতে এসেছেন। একজন শিকারিকে মাছ ধরার টিকিটের পাশাপাশি আনুষঙ্গিক আরও ১০–১২ হাজার টাকা খরচ করতে হয়। অনেক ক্ষেত্রে আসনের মালিকরা পেশাদার শিকারি ভাড়া করে নিয়ে এসেছেন, যাদের পারিশ্রমিক হিসেবে ৩–৫ হাজার টাকা দেওয়া হয়।
প্রতিযোগীদের জন্য নির্ধারিত ৪ লাখ ৭০ হাজার টাকার ৬টি পুরস্কারের মধ্যে সাজু আলম ৪ কেজি ৬৯৫ গ্রাম ওজনের কাতলা মাছ শিকার করে প্রথম পুরস্কার হিসেবে ২ লাখ টাকা পান। দ্বিতীয় স্থান অধিকার করেন কিশোরগঞ্জের হোসেনপুর উপজেলার ইলিয়াছ হোসেন, যিনি সকাল ৯টার দিকে ৪ কেজি ৬৭৫ গ্রাম ওজনের একটি কাতলা মাছ শিকার করেন। তিনি পুরস্কার হিসেবে পেয়েছেন এক লাখ টাকা।
তৃতীয় স্থানটি দখল করেন হবিগঞ্জের মাধবপুর উপজেলার মনতলা এলাকার কাউছার মিয়া। তিনি ৪ কেজি ৫১০ গ্রাম ওজনের কাতলা মাছ শিকার করে ৫০ হাজার টাকা পুরস্কার পান। এছাড়া ব্রাহ্মণবাড়িয়া শহরের মেড্ডা এলাকার ইয়াছিন মিয়া ৩ কেজি ৮৩০ গ্রাম এবং ৩ কেজি ৮১৫ গ্রাম ওজনের দুটি কাতলা মাছ শিকার করে চতুর্থ ও ষষ্ঠ স্থান অধিকার করেন এবং মোট ৮০ হাজার টাকা পুরস্কার পান। একই এলাকার আওলাদ হোসেন ৩ কেজি ৮৩০ গ্রাম ওজনের একটি কাতলা মাছ শিকার করে পঞ্চম হয়ে ৪৫ হাজার টাকা জিতে নিয়েছেন।
পৌনে তিন একর আয়তনের এই দিঘিটির মালিক সরাইল উপজেলার কালীকচ্ছ ইউনিয়নের দত্তপাড়া (কলেজপাড়া) গ্রামের প্রয়াত বীর মুক্তিযোদ্ধা মোহাম্মদ আলীর পরিবার। ওই পরিবারের কাছ থেকে সরাইল মৎস্য চাষ প্রকল্প নামের একটি সমিতি ৯০ লাখ টাকায় দিঘিটি বন্ধক নিয়েছে। তারা প্রতিবছর এখানে কয়েকবার মৎস্য শিকার প্রতিযোগিতার আয়োজন করে থাকে। এ বছর এই প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হলো সপ্তমবারের মতো।
সরাইল মৎস্য চাষ প্রকল্পের সভাপতি আলী মিয়া মুক্তকণ্ঠকে বলেন, এখানে প্রতিবছর এ মাছ ধরার আয়োজন করা হয়। দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে শৌখিন মৎস্যশিকারিরা এখানে অংশ নেন।