বিদেশি বিনিয়োগ পরিস্থিতি নিয়ে গত ৩১ জানুয়ারি মুক্তকণ্ঠের অর্থ ও বাণিজ্য পাতায় ‘বিনিয়োগে চমক দেখাতে পারেনি অন্তর্বর্তী সরকার’ শিরোনামে একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। প্রতিবেদনটি ‘বিনিয়োগ কম, আশিক চৌধুরীর চমক কোথায়’ শিরোনামে অনলাইনে প্রকাশিত হয়। প্রতিবেদনের সঙ্গে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ পরিস্থিতি নিয়ে একটি ইনফোগ্রাফিকসও ছিল।

প্রতিবেদন প্রকাশের পর ২ ফেব্রুয়ারি রাতে বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) নির্বাহী চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরী নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে মুক্তকণ্ঠের করা ইনফোগ্রাফিকসসহ একটি স্ট্যাটাস দেন। এতে তিনি উল্লিখিত বিদেশি বিনিয়োগ আসার পরিসংখ্যানের সময়সীমার যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন।

আশিক চৌধুরীর মন্তব্য হুবহু তুলে ধরা হলো। তিনি লিখেছেন:‘অন্তত প্রথম সারির সংবাদমাধ্যমগুলো বিভ্রান্তিমূলক সংবাদ ছাপাবে না, এতটুকু প্রত্যাশা তো আমরা করতেই পারি। কিন্তু মুক্তকণ্ঠের এই ফটোকার্ডটা দেখে খুব হতাশ হলাম। বিনিয়োগে চমক দেখাতে না পারার তকমায় অন্তর্বর্তীকালীন সরকারকে ভূষিত করেছেন উনারা। তাই প্রকাশিত প্রতিবেদনের উত্তর না দেবার আমার যে রীতি, তার বাইরে গিয়ে কয়টা কথা লিখছি।

১. তথ্যপ্রমাণ হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে জুলাই ২০২৪ থেকে জুন ২০২৫ সময়সীমার ডেটা। সেলুকাস! এই সরকার শুরুই করলো অগাস্ট থেকে (বিডার কার্যক্রম অক্টোবর থেকে)। জুলাই-অগাস্টে বিনিয়োগ না আসার দোষ নাকি আমাদের। সাইকোলজিতে ডেটা নিয়ে এই ধরনের দুষ্টামিকে ‘ফ্রেমিং ইফেক্ট’ বলে।

২. মজার ব্যাপার হচ্ছে, উনারা চাইলেই যথাযথ একটা সময়সীমা নিয়ে বিশ্লেষণ করতে পারতেন। যেমন জানুয়ারী ২০২৫ থেকে শুরু করে জুন ২০২৫ বা অক্টোবর ২০২৫–এর বিনিয়োগের আগের বছরের সাথে তুলনা করা যেতো। এই সময়সীমা ইন্টেরিমের জন্য আরও যুক্তিযুক্ত উইন্ডো। বাংলাদেশ ব্যাংকের ত্রৈমাসিক ডেটা কিন্তু আছে। এবং ডেটা বলছে বিনিয়োগ ২০২৫-এর প্রথম নয় মাসে বেড়েছে ৮০%। শ্রীলঙ্কা বা সুদানের মতো বাংলাদেশে গণ–অভ্যুত্থান পরবর্তী সময়ে বিদেশী বিনিয়োগ নেট নেগেটিভ হয়ে যায়নি (তথ্যসূত্র: বিশ্বব্যাংক)—এই তথ্যটাও দেয়া যেতো। বিনিয়োগে যতটুকু অর্জন তার সিংহভাগ কৃতিত্ব দেশের প্রাইভেট সেক্টর ও সাধারণ মানুষের। তাদেরকে স্বীকৃতিটা দিলে কি ক্ষতি হতো?

৩. ‘নিবন্ধনে ধস’ এই তথ্য সঠিক কিন্তু বিশ্লেষণ ভুল। আগের সরকারের আমলে উন্নয়নের জোয়ারের যে ন্যারেটিভ ছিলো তার হাত ধরে যথেচ্ছ নিবন্ধন হতো। প্রতিবছর নিবন্ধন বৃদ্ধি পেতো, কিন্তু একচুয়াল বিনিয়োগ আগের জায়গায়। আমরা এসব ভুয়া নিবন্ধন বন্ধ করে দিয়েছি। তাই নিবন্ধন কমেছে। আলহামদুলিল্লাহ।মুক্তকণ্ঠকে বলছি, আপনাদের তো সেকেন্ড ক্লাস পত্রিকার মতো ক্লিকবেইট প্রকাশের দরকার নাই। দয়া করে বস্তুনিষ্ঠ খবর প্রকাশ করুন।’

প্রতিবেদকের বক্তব্য১. বিনিয়োগ নিয়ে প্রকাশিত প্রতিবেদনে ২০২৪-২৫ অর্থবছরের পরিসংখ্যান ব্যবহার করা হয়েছে। বাংলাদেশ সরকারের অর্থবছর ১ জুলাই থেকে ৩০ জুন। ফলে সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগ (এফডিআই) থেকে শুরু করে জিডিপি প্রবৃদ্ধি, মূল্যস্ফীতি, রপ্তানি, প্রবাসী আয় ইত্যাদি অর্থনৈতিক সূচকের পরিসংখ্যান অর্থবছর ভিত্তিতে প্রকাশ করে সংশ্লিষ্ট সংস্থা। মাসিক ও ত্রৈমাসিক ভিত্তিতেও সূচকগুলোর পরিসংখ্যান প্রকাশ করা হয়। ফলে ২০২৪-২৫ অর্থবছর অনুযায়ী বিনিয়োগের হিসাবটি কোনো ব্যতিক্রমী বা ‘দুষ্টুমি করে বেছে নেওয়া’ সময়পর্ব নয়। এটিকে ‘ফ্রেমিং ইফেক্ট’ বলাও কোনোভাবে গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।

২. ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর সময়ে (৯ মাসে) বিদেশি বিনিয়োগ ৮০ শতাংশ বেড়েছে, এটা ঠিক। কিন্তু এটা কি বিশেষ কোনো উন্নতি, তা দেখে নেওয়া যাক।

২০২৫ সালের প্রথম ৯ মাসে বিদেশি বিনিয়োগ এসেছে ১৪১ কোটি ডলার। কিন্তু মনে রাখা দরকার, ২০২৪ সালে বিদেশি বিনিয়োগ একেবারেই কমে গিয়েছিল। নেমেছিল ৭৮ কোটি ডলারে। সেখান থেকে ৬৩ কোটি ডলার বৃদ্ধি পাওয়ায় প্রবৃদ্ধি দাঁড়িয়েছে ৮০ শতাংশ। কিন্তু ১৪১ কোটি ডলার কি সন্তোষজনক? এ ক্ষেত্রে আগের বছরগুলো বিবেচনায় নিতে হবে। তাতে দেখা যাচ্ছে, করোনার বছর, অর্থাৎ ২০২০ সালের প্রথম ৯ মাসের চেয়েও ২০ শতাংশ কম বিদেশি বিনিয়োগ এসেছে ২০২৫ সালের প্রথম নয় মাসে।

করোনাভাইরাসের কারণে ২০২০ সালের প্রথমার্ধ সারা বিশ্বের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড স্থবির হয়ে পড়েছিল। দেশে ২৬ মার্চ থেকে টানা ৬৬ দিন সাধারণ ছুটি ছিল। ৩১ মে সীমিত আকারে সরকারি-বেসরকারি অফিস-আদালত ও কলকারখানা খুলে দেওয়া হয়। ভয়াবহ ওই বছরের চেয়েও কম বিদেশি বিনিয়োগ পাওয়াকে কি সাফল্য দাবি করা যায়?

২০২৫ সালের প্রথম ৯ মাসে যে ১৪১ কোটি টাকার বিদেশি বিনিয়োগ এসেছে, তার মধ্যে নতুন বিনিয়োগ প্রায় ৪৫ কোটি ডলার। বাকিটা আন্তকোম্পানি ঋণ ও মুনাফার পুনর্বিনিয়োগ। এই দুই ধরনের বিনিয়োগ আসে মূলত দেশে ব্যবসারত বিদেশি কোম্পানি থেকে। একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, নতুন বিনিয়োগ কতটা এসেছে। সে ক্ষেত্রে দেখা যায়, ২০২৫ সালের প্রথম ৯ মাসে তা বেড়েছে মাত্র ৮ শতাংশ।বাংলাদেশে গণ-অভ্যুত্থান–পরবর্তী সময়ে অন্য দেশের মতো বিদেশি বিনিয়োগ ঋণাত্মক হয়ে যায়নি—এ বিষয়ে আশিক চৌধুরীর বক্তব্যই মুক্তকণ্ঠের প্রতিবেদনে আছে। তিনি বলেছেন, সাধারণত গণ-অভ্যুত্থান–পরবর্তী দেশে বিনিয়োগ প্রবৃদ্ধি নেতিবাচক থাকে বা শূন্যে চলে যায়। কিন্তু আমাদের দেশে তা উল্টো বেড়েছে। এটি একটি আশ্চর্যজনক ব্যাপার (মিরাকল)। তিনি বলেন, ‘একজন বিদেশি বিনিয়োগকারী হিসেবে ২০২৪ সালে দেশে যা হয়েছে, তা দেখার পর ২০২৫ সালে এসে কেউ কেন বিনিয়োগ করবেন? কারণ, দেশ কোন দিকে যাচ্ছে, তা অনিশ্চিত ছিল। তারপরও বিনিয়োগ বেড়েছে। তার মানে দেশের সম্ভাবনা নিয়ে বিনিয়োগকারীদের কোনো সন্দেহ নেই। এখন আমরা তাঁদের জন্য উপযুক্ত পরিবেশ তৈরি করতে পারব কি না, সেটা প্রধান বিষয়।’

মুক্তকণ্ঠের প্রতিবেদনটি প্রায় ১ হাজার ৪০০ শব্দের। প্রতিবেদনের সবকিছু ইনফোগ্রাফিকসে দেওয়া সম্ভব হয় না। ইনফোগ্রাফিকসে সাধারণত উপাত্তের তুলনামূলক চিত্র ও বিশেষ তথ্য দেওয়া হয়। পুরো প্রতিবেদনটি পড়লে হয়তো এ বিভ্রান্তি এড়ানো যেত।

৩. নিবন্ধনের তথ্যের মাধ্যমে বিনিয়োগের আগ্রহের প্রবণতা সম্পর্কে একটি ধারণা পাওয়া যায়। আশিক চৌধুরী এখন ‘ভুয়া’ বিনিয়োগ নিবন্ধন বন্ধ করার কথা উল্লেখ করছেন এবং তাতে বিনিয়োগ নিবন্ধন কমেছে বলে জানাচ্ছেন। কিন্তু বিনিয়োগপ্রবণতা বুঝতে শুধু নিবন্ধনের তথ্য মুক্তকণ্ঠের প্রতিবেদনে ব্যবহার করা হয়নি। সে ক্ষেত্রে বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ ও মূলধনি যন্ত্রপাতি আমদানির তথ্যও ব্যবহার করা হয়েছে। তাতে সুখকর চিত্র পাওয়া যায়নি। আশিক চৌধুরী এ বিষয়ে কিছু বলেননি।

বিনিয়োগ নিবন্ধনের তথ্য শুধু মুক্তকণ্ঠ নয়, সরকারই ব্যবহার করে। অর্থ মন্ত্রণালয়ের প্রকাশিত বাংলাদেশে অর্থনৈতিক সমীক্ষা-২০২৫–এ বিনিয়োগ নিবন্ধনের তথ্য উল্লেখ করা হয়েছে।

সবশেষ কথা হলো, মুক্তকণ্ঠের প্রতিবেদনটি কোনো ‘ক্লিকবেইট’ সাংবাদিকতা ছিল না। বরং সেটি ছিল, বিনিয়োগ পরিস্থিতির একটি সার্বিক মূল্যায়ন। বিনিয়োগ বাড়লে মানুষের কর্মসংস্থান ও আয় বাড়ে। ফলে এটি অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক।

দায়িত্বশীল সাংবাদিকতার অংশ হিসেবে এই অর্থনৈতিক সূচক পরিস্থিতির মূল্যায়ন প্রকাশ করা হয়েছে এবং তাতে সরকার অর্থনীতির যেসব ক্ষেত্রে ভালো করেছে, তা–ও উল্লেখ করা হয়েছে। বলা হয়েছে, ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে খাদের কিনারায় পৌঁছে যাওয়া আর্থিক খাতে অনেকটা স্থিতিশীলতা ফিরিয়েছে অন্তর্বর্তী সরকার। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের পতনও ঠেকানো গেছে। তবে বিনিয়োগ পরিস্থিতি সন্তোষজনক করা যায়নি।