সকালে নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জে ব্যস্ততা বাড়তে থাকে। শহরের বিভিন্ন এলাকা থেকে শ্রমিকেরা আসেন আদমজী রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ এলাকায়—যাকে সাধারণভাবে এইপিজেড বলা হয়। কারও হাতে টিফিন বক্স, কারও হাতে ব্যাগ। নারী-পুরুষ মিলিয়ে প্রায় ৮০ হাজার শ্রমিকের কর্মচাঞ্চল্যে একসময়ের আদমজী জুট মিল এলাকা মুখর হয়ে ওঠে।

এই ইপিজেডের ৪৭টি শিল্পপ্রতিষ্ঠানে কাজ করেন শ্রমিকেরা। আদমজী জুট মিলের পরিত্যক্ত ভূমির ওপর গড়ে ওঠা এই ইপিজেড এখন দেশের অন্যতম বড় রপ্তানি ও কর্মসংস্থান কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত। শ্রমিকদের হাতের নৈপুণ্যে এসব কারখানায় তৈরি হচ্ছে সেফটি জ্যাকেট, ব্লেজার ও ইউরোপের নবদম্পতিদের ব্রাইডাল গাউন।

এ ছাড়া গার্মেন্টস অ্যাকসেসরিজ, সেফটি শু, টেক্সটাইল, ইলেকট্রনিকস ও ইলেকট্রিক্যাল পণ্য, লেজার প্রিন্টার ও ফটোকপি মেশিনের অপিসি ড্রাম এবং গাড়ির সিট কভারের মতো নানা পণ্যও তৈরি হয়। এসব উৎপাদনের মাধ্যমে এখান থেকে বিলিয়ন ডলারের পণ্য রপ্তানি হচ্ছে।

রপ্তানি আয়ের পাশাপাশি পাল্টে যাচ্ছে কর্মীদের জীবনমানও। সরেজমিনে দেখা যায়, এই ইপিজেডের কর্মপরিবেশে ধারাবাহিকতা তৈরি হয়েছে। ব্রাহ্মণবাড়িয়া থেকে আদমজী ইপিজেডে কাজ করতে এসেছেন ফারজানা আক্তার। এই তরুণীর মাসিক বেতন এখন ১৯ হাজার টাকা; তবে প্রথম দিকে বেতন ছিল ৮ হাজার ২০০ টাকা। কদমতলীতে থাকা এ নারী মা-বাবার জন্য মাসে চার হাজার টাকা পাঠান। কাজের পরিবেশ ভালো হওয়ায় সাত বছর ধরে একই প্রতিষ্ঠানে কাজ করছেন বলে তিনি মুক্তকণ্ঠকে জানান।

নতুন আরও ১০টি প্রতিষ্ঠান উৎপাদনে আসছে। বাংলাদেশ রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ এলাকা কর্তৃপক্ষের (বেপজা) তথ্যমতে, এ বছরের মধ্যে উৎপাদনে আসতে যাওয়া এসব প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে মোট শ্রমিকের সংখ্যা এক লাখ ছাড়িয়ে যাবে।

এ বিষয়ে আদমজী ইপিজেডের নির্বাহী পরিচালক মো. আবদুর রহমান ভূঁইয়া মুক্তকণ্ঠকে বলেন, ‘গ্যাস, বিদ্যুৎ ও পানির নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করায় বিনিয়োগকারীদের ব্যাপক আগ্রহ রয়েছে। বাইসাইকেলসহ বিভিন্ন পণ্য তৈরির কারখানা হচ্ছে।’

একনজরে আদমজী ইপিজেড

১৯৫০ সালে আদমজী জুট মিল প্রতিষ্ঠা
১৯৭১ সালের পর জাতীয়করণ হয়
২০০২ সালের আর্থিক লোকসানে বন্ধ
২০০৪ বেপজায় হস্তান্তর
২০০৬ সালে আদমজী ইপিজেড উদ্বোধন
আয়তন ২৯২ একর
শিল্প প্লটের সংখ্যা ২৭৬
চালু প্রতিষ্ঠান ৪৭টি
বাস্তবায়নাধীন প্রতিষ্ঠান ১০টি
মোট প্রকৃত বিনিয়োগ ৮৪৭ মিলিয়ন মার্কিন ডলার
মোট রপ্তানি ১১ বিলিয়ন মার্কিন ডলার

বিলিয়ন ডলারের রপ্তানি

আদমজী ইপিজেড সূত্রে জানা গেছে, নদীতীরবর্তী ২৯২ একর জমির ওপর গড়ে উঠেছে আদমজী ইপিজেড। এখানে রয়েছে ২৭৬টি শিল্প প্লট। ২০০৬ সালে প্রতিষ্ঠার পর থেকে এখন পর্যন্ত বিনিয়োগ হয়েছে ৮৪৭ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। আর রপ্তানি হয়েছে ১১ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের পণ্য।

আদমজী ইপিজেডেই রয়েছে দেশের একমাত্র ব্রাইডাল পোশাক তৈরির কারখানা। টমি হিলফিগার, রালফ লরেন, মাইকেল কর্স ও ভ্যান হিউসেনের মতো ব্র্যান্ডের পোশাক তৈরি হয় এই ইপিজেডে। গত ২০২৫-২৬ অর্থবছরে আদমজী ইপিজেড থেকে রপ্তানি হয়েছে ১ দশমিক ১৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। এর আগের অর্থবছরেও রপ্তানির পরিমাণ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে যায়।

বিনিয়োগ কোন কোন দেশের

এখানকার ৪৭টি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে বিদেশি বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠান রয়েছে ২৬টি। দেশি-বিদেশি যৌথ বিনিয়োগ রয়েছে ৯টি প্রতিষ্ঠানের। আর দেশীয় বিনিয়োগ রয়েছে ১২টি প্রতিষ্ঠানের।

বিদেশি বিনিয়োগকারীদের মধ্যে রয়েছে কানাডার একটি, চীন–হংকংয়ের ৯টি, জার্মানির একটি, দক্ষিণ কোরিয়ার দুটি ও ভারতের পাঁচটি প্রতিষ্ঠান। এ ছাড়া যুক্তরাষ্ট্র ও জাপানের পাঁচটি করে প্রতিষ্ঠান বিনিয়োগ করেছে। একটি করে কারখানা রয়েছে মালয়েশিয়া, নেদারল্যান্ডস, রোমানিয়া, সিঙ্গাপুর, স্পেন, শ্রীলঙ্কা ও ইউক্রেনের।

নতুন নতুন অনেক প্রতিষ্ঠান এ ইপিজেডে বিনিয়োগ করতে চায়। ইউক্রেনের সুপার প্রটেকটিভ শু কোম্পানি এখানে সেফটি জুতা তৈরি করে, যা নির্মাণ, কেমিক্যাল ও খনিশ্রমিকেরা ব্যবহার করে থাকেন। প্রতিষ্ঠানটিতে এক হাজারের বেশি কর্মী কাজ করছেন।

প্রতিষ্ঠানটির মহাব্যবস্থাপক মো. আসলাম উদ্দিন মুক্তকণ্ঠকে বলেন, ‘আমরা নতুন বিনিয়োগের জন্য জায়গা খুঁজছি। ১০ মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করা হবে। এখানে না হলে অন্য কোথাও হয়তো জমি নিতে হবে।’

এখানকার উন্নত কর্মপরিবেশের পাশাপাশি অনেক প্রতিষ্ঠানে শ্রমিকদের বাচ্চার জন্য রয়েছে ডে-কেয়ার সেন্টার।

জাপানি প্রতিষ্ঠান টিএস টেক গাড়ির সিট কভার তৈরি করে। প্রতিষ্ঠানটিতে কাজ করছেন প্রায় ৪০০ শ্রমিক। প্রতিষ্ঠানটিতে গিয়ে দেখা যায়, সেখানে ১৯ জন বাচ্চার জন্য সাজানো একটি দিবাযত্ন কেন্দ্র রয়েছে। তাদের দেখাশোনার জন্য রয়েছেন চারজন প্রশিক্ষিত নারী কর্মী।

প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপক মো. মাহবুবুর রহমান বলেন, ‘গর্ভবতী হওয়ার পর থেকেই শ্রমিকদের দুধ সরবরাহ করা হয়। তাঁদের কাজের সহায়তা করতে সার্বক্ষণিক চেয়ার দেওয়া হয়। এ ছাড়া তাঁদের মাথায় আলাদা সবুজ ফিতা দিয়ে চিহ্নিত করা হয়, যাতে সহজে সেবা দেওয়া যায়।’

যেভাবে শুরু

নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জে আদমজী পরিবারের তিন ভাইয়ের উদ্যোগে ১৯৫০ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল এই শিল্পপ্রতিষ্ঠান। ১৯৫১ সালে উৎপাদনে যাওয়া প্রতিষ্ঠানটি অল্প সময়ের মধ্যেই বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ পাটকলে পরিণত হয়। স্বাধীনতার পর মিলটি জাতীয়করণ হয়। পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশ জুট মিলস করপোরেশনের ব্যবস্থাপনায় আসে। তবে দীর্ঘদিনের আর্থিক লোকসান, ব্যবস্থাপনাগত দুর্বলতা, প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতা ও শ্রমিক অসন্তোষের কারণে মিলটি ক্রমে সংকটে পড়ে।

অবহ্যাত লোকসানের কারণে বিশ্বব্যাংকের শর্তে ২০০২ সালে আদমজী জুট মিল সম্পূর্ণভাবে বন্ধ হয়ে যায়। কর্মরত ২০-২৫ হাজার শ্রমিক-কর্মচারীর রুটি-রুজির অবসান ঘটে।

তবে আদমজীর গল্প সেখানেই শেষ হয়নি। নিস্তব্ধ জুট মিল এলাকায় কর্মচাঞ্চল্য ফিরিয়ে আনা এবং মিলের জমি ও স্থাপনার উৎপাদনমুখী ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির বিকল্প পরিকল্পনা করা হয়। ২০০৪ মিলের জমি বেপজার কাছে হস্তান্তরের সিদ্ধান্ত হয়। পরে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া আনুষ্ঠানিকভাবে আদমজী ইপিজেড উদ্বোধন করেন।

পাটের ঐতিহ্যের জায়গায় আধুনিক শিল্পের সূচনা হয়। নীরব শিল্পাঞ্চল আবারও শ্রমিকের কর্মব্যস্ততায় মুখরিত হয়ে ওঠে। সেই থেকে বাড়তে থাকে কর্মচঞ্চলতা। ২০ হাজার শ্রমিকের স্থলে এখন সরাসরি কাজে যুক্ত প্রায় ৮০ হাজার শ্রমিক। পরোক্ষভাবে যুক্ত রয়েছে আরও প্রায় ২০ হাজার। শিগগিরই এটা এক লাখ ছাড়িয়ে যাওয়ার প্রত্যাশা করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।

ইপিজেডের ইউনিভার্সেল ম্যানসওয়্যারে কাজ করেন আসমা বেগম। মাসে পাঁচ হাজার টাকা করে জমাচ্ছেন তিনি। কখনো ছেলের পড়ালেখার খরচ, কখনো স্বামীর সিএনজি নষ্ট হলে সেই সঞ্চয় কাজে লাগছে। একসময় যেখানে ২০ হাজারের বেশি শ্রমিক কাজ হারিয়েছিলেন, সেই একই জায়গায় এখন লাখো মানুষের জীবিকার সঙ্গে জড়িয়ে গেছে নতুন শিল্প।