ইয়েমেনের সশস্ত্র গোষ্ঠী হুতিদের প্রাণঘাতী হামলার প্রভাব পড়েছে আকাশপথে। রিয়াদ ও দাম্মামের ফ্লাইটগুলো বন্ধ থাকায় সৌদি আরবগামী যাত্রীদের এখন বিকল্প পথ হিসেবে দেশটির জেদ্দা ও মদিনা রুট বেছে নিতে হচ্ছে। রিয়াদ ও দাম্মাম রুটের ফ্লাইট স্থগিতের মেয়াদ আরও এক দিন বাড়িয়ে ১৮ অক্টোবর পর্যন্ত করেছে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস।
গত শনিবার থেকে রিয়াদের কিং খালেদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে সব ধরনের ফ্লাইট চলাচল বন্ধ রয়েছে, যার মূল কারণ হুতিদের হামলা। পরবর্তীতে মঙ্গলবার থেকে সৌদি সরকার দাম্মামগামী ফ্লাইটগুলোও বন্ধ ঘোষণা করে।
গতকাল বৃহস্পতিবার বিকেলে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে জানিয়েছে, রিয়াদ ও দাম্মাম রুটের ফ্লাইটগুলোর বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত তারা পরবর্তীতে জানাবে। উল্লেখ্য, বেসরকারি বিমান সংস্থা ইউএস-বাংলা এয়ারলাইনস আগেই ২১ অক্টোবর পর্যন্ত রিয়াদগামী ফ্লাইট বাতিলের ঘোষণা দিয়েছিল।
বিমান কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, জরুরি প্রয়োজনে যাত্রীরা সৌদি আরবের জেদ্দা ও মদিনা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর ব্যবহার করে দেশটিতে প্রবেশ করতে পারবেন এবং সেখান থেকে বাংলাদেশে ফিরতে পারবেন। যাত্রীদের বাড়তি চাপ সামলাতে মদিনা রুটে বোয়িং ৭৮৭ উড়োজাহাজের পরিবর্তে বড় আকারের বোয়িং ৭৭৭ যুক্ত করা হয়েছে, যার ফলে প্রতি ফ্লাইটে আসনসংখ্যা ১৪৮টি বৃদ্ধি পেয়েছে। পাশাপাশি জেদ্দা রুটে অতিরিক্ত তিনটি ফ্লাইট চালুর ব্যবস্থা করা হয়েছে। বিস্তারিত তথ্যের জন্য যাত্রীদের বিমানের টিকিট বিক্রয়কেন্দ্রে যোগাযোগ করার অনুরোধ জানানো হয়েছে।
বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস স্পষ্ট করে বলেছে, “জরুরি প্রয়োজনে যাত্রীরা সৌদি আরবের জেদ্দা ও মদিনা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর ব্যবহার করে দেশটিতে যেতে এবং বাংলাদেশে ফিরতে পারবেন।”
গতকাল সন্ধ্যা সাড়ে সাতটার জেদ্দাগামী ফ্লাইটে ছিলেন লক্ষ্মীপুর সদরের ব্যবসায়ী বদরুল ইসলাম। পরিবারের পাঁচ সদস্যকে নিয়ে ওমরাহ পালনের উদ্দেশ্যে সৌদি আরব যাচ্ছেন তিনি। ফ্লাইটে ওঠার আগে তিনি মুক্তকণ্ঠকে বলেন, “জেদ্দায় যেতে গতকাল সন্ধ্যা সাড়ে সাতটার একটি ফ্লাইটের যাত্রী ছিলেন লক্ষ্মীপুর সদরের ব্যবসায়ী বদরুল ইসলাম। পরিবারের পাঁচ সদস্যকে নিয়ে ওমরাহ পালনের উদ্দেশে সৌদি আরব যাচ্ছেন তিনি। ফ্লাইটে ওঠার আগে তিনি মুক্তকণ্ঠকে বলেন, ‘জেদ্দার ফ্লাইটে কোনো সমস্যা নেই বলে বিমানের অফিস থেকে জানিয়েছে। আশা করছি, নিরাপদেই যেতে পারব।’”
একই ফ্লাইটের যাত্রী ছিলেন আবু তাহের। মুন্সিগঞ্জের মুক্তারপুরের বাসিন্দা তিনি, যিনি প্রথমবারের মতো সৌদি আরব যাচ্ছেন রিয়াদের একটি দোকানে কাজ করার জন্য। তিনি জানান, “শুরুতে রিয়াদে যাওয়ার টিকিট কেটেছিলাম। রিয়াদের ফ্লাইট বাতিল হওয়ায় এখন জেদ্দা হয়ে যাচ্ছি। বিমানের অফিস থেকে টিকিট পরিবর্তন করে এনেছি।”
রিয়াদগামী আরও এক যাত্রী তারেক হোসেন গতকাল সকালে ময়মনসিংহের ভালুকা থেকে শাহজালাল বিমানবন্দর-সংলগ্ন বিমানের বলাকা কার্যালয়ে আসেন জেদ্দার টিকিট সংগ্রহ করতে। তাঁর সঙ্গে ছিলেন চাচাতো ভাই মো. হৃদয়, যাঁর টিকিট কাটা হয়েছিল ইউএস-বাংলায়। তিনি মুক্তকণ্ঠকে বলেন, “রিয়াদের ফ্লাইট ছিল। সেই ফ্লাইট বাতিল হয়েছে। এখন টিকিট বদলে নিতে হবে।”
বলাকা কার্যালয়ের সামনেই দেখা হয় রিয়াদগামী যাত্রী মোখলেসুর রহমানের সঙ্গে। ১৮ তারিখ বিকেল পাঁচটায় বিমানের একটি ফ্লাইটে তাঁর রিয়াদ যাওয়ার কথা ছিল। ফ্লাইটটি বাতিল হওয়ায় তিনি মদিনা যাওয়ার টিকিট নিতে সেখানে এসেছেন।
গতকাল দুপুর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ১৫ জনেরও বেশি যাত্রীর সঙ্গে কথা বলেছে এই প্রতিবেদকের। দেখা গেছে, গত কয়েক দিনের মতো ফ্লাইট বাতিল হওয়া যাত্রীরা এখন আর বিমানবন্দরে ভিড় করছেন না; বরং জেদ্দা ও মদিনাগামী ফ্লাইটের জন্য অপেক্ষা করছেন।
যাত্রীদের এই ভোগান্তি নিয়ে তারেক হোসেনের কথা ছিল, “রিয়াদের ফ্লাইট ছিল। সেই ফ্লাইট বাতিল হয়েছে। এখন টিকিট বদলে নিতে হবে।”
বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (বেবিচক) গতকাল দুপুরের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, গত শনিবার থেকে এ পর্যন্ত ঢাকা থেকে সরাসরি এবং সৌদি আরব হয়ে চলাচলকারী ট্রানজিট ফ্লাইট মিলিয়ে মোট ১০৩টি ফ্লাইট চলাচল বিঘ্নিত হয়েছে। এর মধ্যে কিছু ফ্লাইট স্থগিত এবং কিছু বাতিল করা হয়েছে। এর ফলে মোট ১৫ হাজার ৭৭৯ জন যাত্রী ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। গতকাল রাত আটটা পর্যন্ত প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত বেবিচক এ বিষয়ে নতুন কোনো তথ্য প্রদান করেনি।
বেবিচকের তথ্যানুযায়ী, সরাসরি ফ্লাইটের মধ্যে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের ১৭টি, ইউএস-বাংলা এয়ারলাইনসের ১০টি, সৌদিয়ার ৮টি এবং রিয়াদ এয়ারের ৭টি ফ্লাইট বিঘ্নিত হয়েছে, যার মোট সংখ্যা ৪২টি। অন্যদিকে ট্রানজিট ফ্লাইটের ক্ষেত্রে ইন্ডিগোর ২২টি, সালাম এয়ারের ৭টি, ইজিপ্ট এয়ারের ১টি, এমিরেটসের ১৪টি, কাতার এয়ারওয়েজের ৮টি, ফ্লাইদুবাইয়ের ৬টি এবং এয়ার ইন্ডিয়ার ৩টি ফ্লাইট বিঘ্নিত হয়েছে। সব মিলিয়ে ট্রানজিট ফ্লাইটের সংখ্যা ৬১টি।
বেবিচকের চূড়ান্ত তথ্যে বলা হয়েছে, “গত শনিবার থেকে এ পর্যন্ত ঢাকা থেকে সরাসরি ফ্লাইটের পাশাপাশি সৌদি আরব হয়ে চলাচলকারী ট্রানজিট ফ্লাইট মিলিয়ে মোট ১০৩টি ফ্লাইট চলাচল বিঘ্নিত হয়েছে। এর মধ্যে কিছু ফ্লাইট স্থগিত ও কিছু ফ্লাইট বাতিল করা হয়েছে। এতে ১৫ হাজার ৭৭৯ জন যাত্রী ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন।”