দেশে খাদ্যনিরাপত্তাহীনতার ঝুঁকিতে থাকা মানুষের সংখ্যা আশঙ্কাজনকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচির (ডব্লিউএফপি) সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, চলতি বছরের সেপ্টেম্বর থেকে ডিসেম্বর সময়ের মধ্যে তীব্র খাদ্যনিরাপত্তাহীনতার ঝুঁকিতে থাকা মানুষের সংখ্যা ১ কোটি ৮১ লাখে দাঁড়াতে পারে। বছরের শুরুর তুলনায় এই সংখ্যাটি ২৮ লাখ বেশি।

গত ২২ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত ডব্লিউএফপির এই প্রতিবেদনে মূল্যস্ফীতির চাপ, সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা হ্রাস, বন্যায় কৃষিখাতের ব্যাপক ক্ষতি, শিশুদের পুষ্টিহীনতা এবং রোহিঙ্গা শরণার্থীদের খাদ্যসহায়তা নিয়ে বিদ্যমান অনিশ্চয়তার কথা স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে।

আজ ১৬ অক্টোবর বিশ্ব খাদ্য দিবস। ১৯৭৯ সালে জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) ২০তম সম্মেলনে এই দিবসটি পালনের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয় এবং ১৯৮১ সালে প্রথমবারের মতো বিশ্ব খাদ্য দিবস পালিত হয়। এ বছর এই বিশেষ দিবসের প্রতিপাদ্য নির্ধারিত হয়েছে ‘আজকের উদ্ভাবন, আগামী দিনের পুষ্টি’।

এমন এক সময়ে এই দিবসটি পালিত হচ্ছে যখন দেশ দীর্ঘ সময় ধরে উচ্চ মূল্যস্ফীতির কবলে রয়েছে। এর পাশাপাশি অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি হ্রাস এবং কর্মসংস্থানের সুযোগ কমে যাওয়ায় সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা কঠিন হয়ে পড়েছে। বিভিন্ন জরিপে দেখা গেছে, দেশে দারিদ্র্যের হার বেড়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, দেশের জনসংখ্যার একটি নির্দিষ্ট অংশ সব সময়ই খাদ্যনিরাপত্তাহীনতার ঝুঁকিতে থাকে, তবে ডব্লিউএফপির প্রতিবেদন অনুযায়ী সেই সংখ্যাটি এখন আরও বেড়ে গেছে।

ডব্লিউএফপির প্রতিবেদনে সতর্ক করা হয়েছে যে, খাদ্যসংকট ও পুষ্টিহীনতার কারণে শিশুদের শারীরিক ও মানসিক বৃদ্ধি বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। পর্যাপ্ত পুষ্টিকর খাবারের অভাব শিশুদের স্বাভাবিক বিকাশ ও স্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি করছে। পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, দেশে পাঁচ বছরের কম বয়সী প্রতি চার শিশুর একজন খর্বকায় (বয়সের তুলনায় উচ্চতা কম) এবং ১১ শতাংশ শিশু ক্ষীণকায় (উচ্চতার তুলনায় ওজন কম)। এছাড়া প্রতি পাঁচটি পরিবারের দুটিতেই উল্লেখযোগ্য মাত্রায় অণুপুষ্টির ঘাটতি পরিলক্ষিত হচ্ছে।

প্রতিবেদনের তথ্যমতে, ২০২৬ সালে বন্যা ও জলাবদ্ধতার কারণে দেশে প্রায় ৮০ হাজার হেক্টর কৃষিজমি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর ফলে ২ লাখ ৩০ হাজার কৃষক পরিবার এবং প্রায় ১৩ লাখ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন, যা সামগ্রিক খাদ্য উৎপাদন ও মানুষের জীবিকাকে মারাত্মকভাবে ব্যাহত করেছে।

দেশের খাদ্যনিরাপত্তার ওপর বৈশ্বিক ও আঞ্চলিক ঝুঁকির প্রভাবের কথা উল্লেখ করে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের মোট প্রবাসী আয়ের প্রায় অর্ধেক আসে মধ্যপ্রাচ্য থেকে। তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে প্রবাসী আয়ের এই প্রবাহ ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

উল্লেখ্য, ২০২২ সালের শুরুতে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে দেশে খাদ্যের দাম ক্রমাগত বাড়তে থাকে। ২০২৪ সালের জুলাই মাসে খাদ্য মূল্যস্ফীতি ১৪ শতাংশ ছাড়িয়ে যায়, যা গত এক দশকের মধ্যে সর্বোচ্চ। এরপর বেশ কয়েক মাস এই হার ১০ শতাংশের উপরে থাকলেও বর্তমানে তা কিছুটা কমেছে।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) সেপ্টেম্বর মাসে প্রকাশিত তথ্যানুযায়ী, সেপ্টেম্বর মাসে খাদ্য মূল্যস্ফীতি ছিল ৭ দশমিক ২২ শতাংশ এবং খাদ্যবহির্ভূত মূল্যস্ফীতি ছিল ৯ দশমিক ৩০ শতাংশ। তবে খাদ্য মূল্যস্ফীতি কমে যাওয়ার অর্থ এই নয় যে নিত্যপণ্যের দাম কমেছে; বরং এর অর্থ হলো দাম বৃদ্ধির হারটি সামান্য হ্রাস পেয়েছে।

আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) ১৩ অক্টোবর এক পূর্বাভাসে জানিয়েছে, চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরে বাংলাদেশের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রবৃদ্ধি ৩ দশমিক ২ শতাংশে নেমে যেতে পারে। একই সময়ে গড় মূল্যস্ফীতি বেড়ে ১০ দশমিক ৯ শতাংশে পৌঁছাতে পারে। এর ফলে অর্থনীতির পুনরুদ্ধার, মানুষের ক্রয়ক্ষমতা এবং বিনিয়োগের পরিবেশ নিয়ে নতুন করে উদ্বেগের সৃষ্টি হতে পারে।

সরকারি সংস্থা ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) হিসাব অনুযায়ী, বর্তমানে বাজারে মোটা চালের কেজি কমপক্ষে ৫০ টাকা এবং খোলা আটার দামও একই পর্যায়ে রয়েছে।

খাদ্য মন্ত্রণালয়ের হিসাব অনুযায়ী, গত ১ জুলাই থেকে ৮ অক্টোবর পর্যন্ত বিভিন্ন কর্মসূচির আওতায় ৮ লাখ ৩৪ হাজার টন চাল ও গম বিতরণ করা হয়েছে, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৪৮ হাজার টন কম। তবে বর্তমানে সাড়ে ২৩ লাখ টনের মতো খাদ্যশস্য মজুত রয়েছে, যা সন্তোষজনক বলে মনে করা হচ্ছে।

এই সংকটময় মুহূর্তে খাদ্যসংকটের ঝুঁকি মোকাবিলায় করণীয় সম্পর্কে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ও সানেমের নির্বাহী পরিচালক সেলিম রায়হান মুক্তকণ্ঠকে বলেন, “এই মুহূর্তে খাদ্যসংকটের ঝুঁকি মোকাবিলায় সরকারের প্রথম কাজ হওয়া উচিত সবচেয়ে ঝুঁকিতে থাকা জনগোষ্ঠীকে চিহ্নিত করে দ্রুত ও কার্যকর সহায়তা নিশ্চিত করা। নিম্ন আয়ের পরিবার, দিনমজুর, কৃষিশ্রমিক, নারীপ্রধান পরিবার এবং দুর্যোগকবলিত এলাকার মানুষের জন্য খাদ্যসহায়তা, ন্যায্যমূল্যে চাল-ডালসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য বিক্রি এবং লক্ষ্যভিত্তিক নগদ সহায়তার পরিধি বাড়াতে হবে।”

বাজার পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার বিষয়ে সেলিম রায়হান আরও বলেন, “বাজারে কৃত্রিম সংকট, মজুতদারি ও কারসাজি প্রতিরোধে নিয়মিত নজরদারি এবং সরবরাহব্যবস্থায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা জরুরি।”