মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে সংঘাত ছড়িয়ে পড়ায় বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ প্রকট হচ্ছে। সৌদি আরবের জ্বালানি অবকাঠামোতে হামলা, উপসাগরীয় অঞ্চলে নিরাপত্তাঝুঁকির বৃদ্ধি এবং জাহাজভাড়া বেড়ে যাওয়ার ফলে তেলের দাম ঊর্ধ্বমুখী। বৃহস্পতিবার সকালে বিশ্ববাজারে তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১১০ ডলারে দাঁড়িয়েছে। উল্লেখ্য, চলতি সপ্তাহের পুরো সময় তেলের দাম ১১০ ডলারের কাছাকাছি অবস্থান করছে।

আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার (আইইএ) পূর্বাভাস অনুযায়ী, জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি এবং অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার কারণে বিশ্বজুড়ে তেলের চাহিদা হ্রাস পেতে পারে। বর্তমানে তেলের বাজারে একদিকে যেমন সরবরাহ-সংকটের আশঙ্কা রয়েছে, অন্যদিকে দেখা যাচ্ছে চাহিদা কমে যাওয়ার প্রবণতা। এই দুই বিপরীতমুখী পরিস্থিতির কারণে তেলের বাজারে চরম অনিশ্চয়তা বিরাজ করছে।

বাজারের এই অস্থিরতার প্রেক্ষাপটে তেলের দামের গতিপ্রকৃতি এখন নতুন করে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে এসেছে। যদি মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত দীর্ঘায়িত হয়, তবে সরবরাহব্যবস্থা স্বাভাবিক হতে দীর্ঘ সময় লাগতে পারে। বিশেষ করে উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে তেল পরিবহন ব্যাহত হলে আন্তর্জাতিক বাজারে দাম আরও বাড়ার ঝুঁকি রয়েছে। তবে অনেক বিশ্লেষক মনে করছেন, দাম খুব একটা বাড়বে না।

মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাতের বিস্তার এবং তেল পরিবহনে ঝুঁকি বাড়ার ফলে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ছে। রয়টার্সের এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, সৌদি আরবে ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীদের নতুন হামলার পর যুক্তরাষ্ট্র সৌদি আরবের বেশ কিছু কূটনৈতিক মিশন থেকে কর্মীদের পরিবারের সদস্যদের সরিয়ে নেওয়ার উদ্যোগ গ্রহণ করেছে।

গত বুধবার সৌদি আরবের দাম্মাম শহরের বেসামরিক বিমানবন্দরে হুতিদের চালানো এক হামলায় একজন নিহত এবং আটজন আহত হয়েছেন। একই দিনে সৌদি আরবের একটি তেলক্ষেত্রে ড্রোন হামলায় আরও দুজন নিহত হন। এসব ঘটনার ফলে উপসাগরীয় অঞ্চলে জ্বালানি সরবরাহ এবং নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ ও অনিশ্চয়তা আরও ঘনীভূত হচ্ছে।

তেল পরিবহনের ক্ষেত্রেও ঝুঁকি বাড়ছে। জাহাজ চলাচল পর্যবেক্ষণকারী প্রতিষ্ঠান কেপলারের তথ্যমতে, গত দুই সপ্তাহে বাণিজ্যিক জাহাজে অন্তত ১৮টি হামলা চালানো হয়েছে। হরমুজ প্রণালির বাইরেও ওমান উপসাগর পর্যন্ত ট্যাংকারগুলোকে লক্ষ্য করে হামলা চালানো হচ্ছে। এর ফলে উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে অপরিশোধিত তেল জাহাজে তোলা এবং জাহাজ থেকে জাহাজে তেল স্থানান্তরের কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। ফলে শুধু উৎপাদন নয়, তেল রপ্তানি ও পরিবহনের ধারাবাহিকতা নিয়েও বাজারে অনিশ্চয়তা বাড়ছে।

পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রে অপরিশোধিত তেলের মজুত প্রত্যাশার চেয়ে বেশি কমে যাওয়া আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বৃদ্ধির অন্যতম কারণ। গত সপ্তাহে দেশটির মজুত ৩০ লাখ ৬০ হাজার ব্যারেল কমে ৪১ কোটি ২৫ লাখ ব্যারেলে নেমেছে। এই প্রভাবের ফলে গত মঙ্গলবার তেলের দাম পাঁচ মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ ১১১ দশমিক ৭৫ ডলারে পৌঁছেছে।

আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার (আইইএ) অক্টোবরের পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৬ সালের চতুর্থ প্রান্তিকে (অক্টোবর–ডিসেম্বর) বিশ্বে তেলের চাহিদা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় দৈনিক ২৫ লাখ ব্যারেল কমতে পারে। পুরো বছরে এই চাহিদা কমতে পারে দৈনিক ২৬ লাখ ব্যারেল।

আইইই-র পূর্বাভাস অনুসারে, ইরান যুদ্ধের প্রভাবে সরবরাহ-সংকট, জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি এবং অর্থনৈতিক পরিস্থিতির অবনতির কারণে এই অবস্থার সৃষ্টি হতে পারে। বিশেষ করে ডিজেলের চাহিদা কমতে পারে। ২০২৭ সালে তেলের ব্যবহার দৈনিক ২০ লাখ ব্যারেল বাড়লেও তা ২০২৫ সালের তুলনায় দৈনিক ৬ লাখ ২০ হাজার ব্যারেল কম থাকবে।

সেপ্টেম্বরে বিশ্বে তেলের সরবরাহ আগের মাসের তুলনায় দৈনিক ২৫ লাখ ব্যারেল বেড়ে ১০ কোটি ২৩ লাখ ব্যারেলে দাঁড়িয়েছে। তবে ২০২৬ সালে বার্ষিক সরবরাহ দৈনিক গড়ে ৫৮ লাখ ব্যারেল কমতে পারে।

সেপ্টেম্বরে বিশ্বে তেলের মজুত এক কোটি ব্যারেল কমেছে, যা ফেব্রুয়ারি মাসের শেষভাগের তুলনায় ৫০ কোটি ৯০ লাখ ব্যারেল কম। উপসাগরীয় অঞ্চলে সংঘাত অব্যাহত থাকলে সরবরাহ পুনরুদ্ধার ব্যাহত হতে পারে, যার ফলে তেলের দাম আরও বৃদ্ধির আশঙ্কা থেকে যায়।

বিশ্ববাজারে তেলের দাম দীর্ঘ সময় বাড়তি থাকলে বাংলাদেশের আমদানি ব্যয় বাড়বে, যা বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর চাপ সৃষ্টি করবে। তবে বাংলাদেশে জ্বালানির দাম পুরোপুরি বাজারনির্ভর নয়; সরকার প্রতি মাসের শুরুতে দাম নির্ধারণ করে। ফলে বিশ্ববাজারে দাম বাড়লেই যে দেশের বাজারে দাম বেড়ে যাবে, তা নয়। তবে বাড়তি খরচ বহনের সক্ষমতা এবং সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনা করে সরকার স্থানীয় বাজারে তেলের দাম বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেয়।

স্থানীয় বাজারে দাম বাড়লে পরিবহন, বিদ্যুৎ উৎপাদন ও শিল্প উৎপাদনসহ জীবনযাত্রার সামগ্রিক খরচ বেড়ে যায়। উচ্চ জ্বালানি ব্যয়ের কারণে শেষ পর্যন্ত পণ্য ও সেবার দাম বেড়ে যেতে পারে, যার সরাসরি প্রভাব পড়বে মূল্যস্ফীতির ওপর।

এই বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের শিক্ষক ও সানেমের নির্বাহী পরিচালক সেলিম রায়হান বলেন, “জ্বালানির দাম বৃদ্ধির অভিঘাত পড়বেই, তবে এর চেয়ে বেশি শঙ্কার কারণ হলো অনিশ্চয়তা। অনিশ্চয়তার কারণে বিনিয়োগকারীদের পক্ষে সিদ্ধান্ত নিতে সমস্যা হবে। ফলে বাংলাদেশ যে নিম্ন প্রবৃদ্ধি ও উচ্চ মূল্যস্ফীতির দীর্ঘস্থায়ী চক্রের মধ্যে পড়ে গেছে, তা থেকে বেরোতে বেগ পেতে হবে। সরকারের নীতিগত অবস্থানেও পরিষ্কার কিছু নেই, বাংলাদেশ কীভাবে এই পরিস্থিতি থেকে বেরোবে।”

সরকার নবায়নযোগ্য জ্বালানির ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে, এই উদ্যোগকে সাধুবাদ জানিয়েছেন সেলিম রায়হান। তিনি বলেন, “অতীতেও সরকার বিভিন্ন লক্ষ্যমাত্রা ঘোষণা করেছে, কিন্তু তা অর্জিত হয়নি। সে জন্য সমন্বিত উদ্যোগ দরকার।”

সামগ্রিকভাবে বিশ্ববাজারে তেলের ভবিষ্যৎ গতিপথ বেশ কিছু বিষয়ের ওপর নির্ভর করছে। যেমন—মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত কতটা বিস্তৃত হয়, উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে সরবরাহ কতটা স্বাভাবিক থাকে এবং বাড়তি দাম বিশ্ব অর্থনীতির চাহিদাকে কতটা কমিয়ে দেয়।

সরবরাহের ঘাটতি ও মজুত কমে আসার কারণে দাম বৃদ্ধির ঝুঁকি বাড়ছে। আবার উচ্চ মূল্য ও অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার কারণে চাহিদা কমে গেলে দাম বৃদ্ধির গতি সীমিত হতে পারে। ফলে তেলের বাজারে অস্থিরতা অব্যাহত থাকার আশঙ্কাই এখন প্রবল।