বিশ্বকাপের বাণিজ্যিক কার্যক্রমে বেসরকারি বিনিয়োগকারীদের অংশীদার করার একটি বিতর্কিত পরিকল্পনা নিয়ে অবশেষে ক্ষমা চেয়েছেন ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনো। তবে তার এই ক্ষমা প্রার্থনায় শান্ত হননি সমালোচকেরা। বরং ইংল্যান্ড ও জার্মানির ফুটবল কর্তারা ফিফার নেতৃত্ব দেওয়ার ক্ষেত্রে তার যোগ্যতা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তুলেছেন। বিশ্ব ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থাটির শীর্ষ নেতৃত্বে পরিবর্তনের দাবিও নতুন করে জানিয়েছেন তাঁরা।

গত বৃহস্পতিবার (১৫ অক্টোবর) সুইজারল্যান্ডের জুরিখে ফিফা কাউন্সিলের এক বৈঠকে ক্ষমা চান ইনফান্তিনো। সাড়ে তিন ঘণ্টা স্থায়ী ওই বৈঠকে বিশ্বকাপের বাণিজ্যিক কার্যক্রমে বেসরকারি বিনিয়োগকারীদের অন্তর্ভুক্ত করার পরিকল্পনা নিয়ে তাকে কঠিন প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হয়। তবে ইউরোপীয় ফুটবলের প্রতিনিধিদের অভিযোগ, ক্ষমা চাইলেও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নগুলোর কোনো সন্তোষজনক উত্তর দিতে পারেননি ফিফা সভাপতি।

পুরো বিতর্কের সূত্রপাত হয়েছিল গত জুলাই মাসে। ‘ফিফা ফরোয়ার্ড এন্টারপ্রাইজ’ নামক একটি প্রকল্পের মাধ্যমে বিশ্বকাপসহ ফিফার বিভিন্ন প্রতিযোগিতার বাণিজ্যিক কার্যক্রম পরিচালনার জন্য নতুন প্রতিষ্ঠান গড়ার পরিকল্পনা করেছিলেন ইনফান্তিনো। প্রায় দুই হাজার কোটি ডলার মূল্যায়নের ওই প্রতিষ্ঠানের অন্তত ২০ শতাংশ অংশীদারত্ব বেসরকারি বিনিয়োগকারীদের কাছে বিক্রি করে প্রায় ৪২০ কোটি ডলার সংগ্রহের প্রস্তাব ছিল সেখানে। সম্ভাব্য বিনিয়োগকারীদের তালিকায় মার্কিন ব্যবসায়ী জশুয়া কুশনারের নামও ছিল।

কিন্তু অভিযোগ ওঠে যে, এই পরিকল্পনাটি নিয়ে আগে থেকে ফিফা কাউন্সিলের সদস্যদের সঙ্গে কোনো আলোচনা করা হয়নি। সংবাদমাধ্যমে বিষয়টি ফাঁস হওয়ার পর তীব্র সমালোচনার মুখে পড়ে গত জুলাইয়েই প্রস্তাবটি প্রত্যাহার করে নেয় ফিফা।

বৃহস্পতিবারের বৈঠকের পর ফিফার পক্ষ থেকে প্রকাশিত এক ভিডিও বার্তায় ইনফান্তিনো বলেন, ‘ফিফা ফরোয়ার্ড এন্টারপ্রাইজ প্রকল্প নিয়ে যোগাযোগ ও আলোচনার প্রক্রিয়ায় আমাদের যে ভুল হয়েছে, তার জন্য আমি ক্ষমা চেয়েছি।’

তবে তিনি দাবি করেন, পরিকল্পনাটি চূড়ান্ত কোনো সিদ্ধান্ত ছিল না, বরং এটি ছিল কেবল একটি প্রস্তাব এবং কোনো সম্পন্ন চুক্তি নয়। তার মতে, ফিফার ২১১টি সদস্য দেশের ফুটবল ফেডারেশনের জন্য বাড়তি অর্থায়নের ব্যবস্থা করাই ছিল এই উদ্যোগের মূল উদ্দেশ্য।

কিন্তু এই ব্যাখ্যায় মোটেও সন্তুষ্ট নন ইংল্যান্ড ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনের প্রধান ও ফিফার সহসভাপতি ডেবি হিউইট। তার দাবি, বৈঠকে গুরুত্বপূর্ণ নথিপত্র চাওয়া হলেও সেগুলো সরবরাহ করা হয়নি; বরং প্রশ্নগুলো লিখিতভাবে জমা দিতে বলা হয়েছে। ইনফান্তিনোর সমালোচনা করে হিউইট বলেন, ‘তাকে এসব প্রশ্নের উত্তর দিতে হবে। যদি তিনি উত্তর না দেন, তাহলে ফিফা সভাপতি হওয়ার যোগ্য নন।’

একই ধরনের অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন জার্মান ফুটবল ফেডারেশনের সভাপতি বের্ন্ড নয়েনডর্ফ। তার মতে, ইনফান্তিনো মূল প্রকল্পটির জন্য নয়, বরং কাউন্সিলের সদস্যদের সঙ্গে আগে আলোচনা না করার জন্যই ক্ষমা চেয়েছেন। অথচ বিতর্কের কেন্দ্রে থাকা পরিকল্পনাটি নিয়ে এখনো গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের উত্তর পাওয়া যায়নি।

ফিফার নেতৃত্ব ও প্রশাসনিক ব্যবস্থায় বড় ধরনের পরিবর্তনের দাবি জানিয়ে নয়েনডর্ফ বলেন, ‘পুরো প্রশাসন এবং পরিচালনব্যবস্থার সংস্কার প্রয়োজন। কিন্তু ইনফান্তিনোর নেতৃত্বে সেটি সম্ভব নয় বলে আমি নিশ্চিত। তাই আমাদের পুরোপুরি নতুন করে শুরু করা প্রয়োজন।’

তবে ফিফার সব সদস্য ইনফান্তিনোর বিপক্ষে নন। আফ্রিকার বেশ কয়েকটি ফুটবল ফেডারেশন এখনো তার নেতৃত্বের প্রতি সমর্থন বজায় রেখেছে। মৌরিতানিয়া ফুটবল ফেডারেশনের সভাপতি আহমেদ ইয়াহিয়া বলেন, বিশ্বজুড়ে ফুটবলের উন্নয়নে ইনফান্তিনোর অবদান রয়েছে। তাদের বিশ্বাস, ফিফার নেতৃত্বে থাকার জন্য তিনিই উপযুক্ত ব্যক্তি।

এদিকে এই বিতর্কের মধ্যেই ফিফার পরিচালনব্যবস্থা পর্যালোচনার জন্য নতুন একটি কার্যদল গঠনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে ফিফার শান্তি পুরস্কারের ভবিষ্যৎ এবং শৃঙ্খলাবিধির প্রয়োগ খতিয়ে দেখার কথা জানিয়েছে সংস্থাটি।

বৈঠকে বিশ্বকাপে যুক্তরাষ্ট্রের ফুটবলার ফোলারিন বালোগুনের লাল কার্ডের নিষেধাজ্ঞা স্থগিতের সিদ্ধান্ত নিয়েও প্রশ্ন তোলা হয়। এ ছাড়া ফিফার আর্থিক ব্যবস্থাপনা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়ায় আরও স্বচ্ছতা দাবি করেছেন ইউরোপীয় প্রতিনিধিরা।

আগামী বছরের ১৮ মার্চ মরক্কোর রাবাতে অনুষ্ঠিত হবে ফিফা সভাপতি নির্বাচন। সেই নির্বাচনে ইনফান্তিনোর প্রতিদ্বন্দ্বী হতে আগ্রহীদের আগামী ১৮ নভেম্বরের মধ্যে প্রার্থিতা জমা দিতে হবে। আবারও সভাপতি পদে লড়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন ইনফান্তিনো। তবে বিশ্বকাপের বাণিজ্যিক কার্যক্রম নিয়ে বিতর্ক এবং ইউরোপীয় ফুটবল কর্তাদের নেতৃত্ব পরিবর্তনের দাবি তাকে নতুন করে চাপের মুখে ফেলেছে।