বেশ জাঁকজমকপূর্ণ আয়োজনের মাধ্যমে শান্তি পুরস্কার চালু করেছিল বিশ্ব ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থা ফিফা। এই পুরস্কারের প্রথম প্রাপক হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের হাতে সম্মাননা তুলে দেওয়া হয়। তবে পুরস্কারটি চালু করার এক বছর পার হতে না হতেই এর ভবিষ্যৎ নিয়ে চরম অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। বর্তমানে এই পুরস্কারটি পুরোপুরি বাতিল করা অথবা রাজনীতিবিদদের এই পুরস্কারের আওতা থেকে বাদ দেওয়ার প্রস্তাব উঠেছে ফিফা কাউন্সিলের ভেতরে। ফলে ডোনাল্ড ট্রাম্পই হতে পারেন ফিফার শান্তি পুরস্কার পাওয়া প্রথম এবং শেষ ব্যক্তি।
গত বৃহস্পতিবার (১৫ অক্টোবর) সুইজারল্যান্ডের জুরিখে ফিফা কাউন্সিলের একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে এই শান্তি পুরস্কারের ভবিষ্যৎ নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ানের এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, উক্ত বৈঠকে উপস্থিত কয়েকজন সদস্য পুরস্কারটি সম্পূর্ণ বাতিলের দাবি জানান। অন্যদিকে, কিছু সদস্য পুরস্কারটি চালু রাখার পক্ষে মত দিলেও রাজনীতিবিদদের এর বাইরে রাখার প্রস্তাব দেন।
আলোচনার পর বিষয়টি পর্যালোচনার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে ফিফার ফুটবল সামাজিক দায়বদ্ধতা কমিটির হাতে। বৃহস্পতিবারের বৈঠকের পর ফিফা এক আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে এই তথ্যের সত্যতা নিশ্চিত করেছে। আগামী ডিসেম্বরে কাউন্সিলের পরবর্তী বৈঠকে এই পর্যালোচনার ভিত্তিতে পুরস্কারটির ভবিষ্যৎ নিয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
২২ সদস্যের এই সামাজিক দায়বদ্ধতা কমিটির সভাপতির দায়িত্ব পালন করছেন মিয়ানমারের ফুটবল কর্মকর্তা জাও জাও। আর সহসভাপতি হিসেবে রয়েছেন আর্জেন্টিনা ও ইন্টার মিলানের সাবেক তারকা ফুটবলার হাভিয়ের জানেত্তি। পুরস্কারটি আদৌ চালু রাখা উচিত কি না, চালু থাকলে কারা এর জন্য যোগ্য হবেন এবং বিজয়ী নির্বাচনের সঠিক প্রক্রিয়া কী হবে—এই বিষয়গুলো খতিয়ে দেখবে কমিটি।
আগামী ১৬ ডিসেম্বর কাতারের দোহায় ফিফা কাউন্সিলের পরবর্তী বৈঠকের কথা রয়েছে। কমিটির উচিত তার আগেই প্রয়োজনীয় সুপারিশ জমা দেওয়া। তবে এখন পর্যন্ত পুরস্কার বাতিল কিংবা রাজনীতিবিদদের অযোগ্য ঘোষণা করার বিষয়ে কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি।
বৈঠক শেষে ফিফার সহসভাপতি এবং ইংল্যান্ড ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ডেবি হিউইট সাংবাদিকদের বিষয়টি নিশ্চিত করেন। তিনি বলেন, ‘শান্তি পুরস্কারটি পর্যালোচনার সিদ্ধান্ত হয়েছে। এমন একটি পুরস্কার আদৌ থাকা উচিত ছিল কি না, কিসের ভিত্তিতে এটি দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল এবং ভবিষ্যতে আরেকটি পুরস্কার দেওয়া হবে কি না, এসব প্রশ্ন উঠেছে। সামাজিক দায়বদ্ধতা কমিটি বিষয়গুলো খতিয়ে দেখবে।’
২০২৫ সালের ৫ নভেম্বর প্রথমবারের মতো শান্তি পুরস্কার চালুর ঘোষণা দিয়েছিল ফিফা। সংস্থাটির দাবি ছিল, বিশ্বজুড়ে শান্তি প্রতিষ্ঠা এবং মানুষকে ঐক্যবদ্ধ করতে যাদের অসাধারণ অবদান রয়েছে, তাদের সম্মান জানাতেই এই উদ্যোগ। তারা প্রতি বছর এই পুরস্কার দেওয়ার পরিকল্পনা করেছিল।
এর ঠিক এক মাস পর, ৫ ডিসেম্বর ওয়াশিংটনের কেনেডি সেন্টারে ২০২৬ বিশ্বকাপের ড্র অনুষ্ঠানে ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনো ডোনাল্ড ট্রাম্পকে প্রথম শান্তি পুরস্কার প্রদান করেন। মার্কিন প্রেসিডেন্টের হাতে পুরস্কারের পাশাপাশি একটি স্মারক পদক ও সনদও তুলে দেওয়া হয়।
তবে ট্রাম্পকে এই পুরস্কার দেওয়ার প্রক্রিয়াটি শুরু থেকেই ব্যাপক প্রশ্নের মুখে পড়েছে। দ্য অ্যাথলেটিকের এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ফিফা কাউন্সিলের কোনো আনুষ্ঠানিক অনুমোদন ছাড়াই ইনফান্তিনো প্রথম বিজয়ীর নাম নির্বাচন করেছিলেন। ট্রাম্পকে বেছে নেওয়ার ক্ষেত্রে কাদের বিবেচনায় নেওয়া হয়েছিল কিংবা কোন পদ্ধতিতে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, তার কোনো বিস্তারিত বিবরণ প্রকাশ করা হয়নি।
পুরস্কার প্রদানের এই সিদ্ধান্ত নিয়ে শুরু থেকেই তীব্র সমালোচনা শুরু হয়। বিশেষ করে ফিফার মতো একটি আন্তর্জাতিক ক্রীড়া সংস্থার রাজনৈতিক নিরপেক্ষতা এবং শীর্ষ নেতৃত্বের সিদ্ধান্ত গ্রহণের স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে।
দ্য গার্ডিয়ানের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ফিফা কাউন্সিলের বেশ কয়েকজন সদস্য মনে করছেন যে বর্তমান কাঠামোতে এই পুরস্কারটি চালিয়ে যাওয়া উচিত নয়। তাদের আশঙ্কা, ভবিষ্যতে অন্য কোনো রাজনৈতিক নেতাকে এই পুরস্কার দেওয়া হলে তা নতুন বিতর্ক কিংবা কূটনৈতিক জটিলতার জন্ম দিতে পারে।
এমন পরিস্থিতিতে পুরস্কারটির ধরন বদলে দেওয়ার প্রস্তাবও এসেছে। কাউন্সিলের এক সদস্য দ্য গার্ডিয়ানকে জানিয়েছেন, ফুটবলের মাধ্যমে সামাজিক সম্প্রীতি ও দায়িত্বশীলতা প্রতিষ্ঠায় যাদের অসাধারণ অবদান রয়েছে, তাদের জন্য পুরস্কারটি নির্ধারণ করার বিষয়টি আলোচনায় এসেছে।
সেই প্রস্তাবনা অনুযায়ী, ভবিষ্যতে কোনো রাজনীতিবিদকে এই পুরস্কার দেওয়া যাবে না। পাশাপাশি বিজয়ী মনোনয়ন ও নির্বাচনের জন্য সুস্পষ্ট ও স্বচ্ছ নিয়ম তৈরি করতে হবে। তবে এই প্রস্তাবগুলো এখনো আলোচনার পর্যায়েই রয়েছে।
পুরস্কারের ভবিষ্যৎ নিয়ে বিতর্কের পাশাপাশি ফিফা সভাপতি ইনফান্তিনোর নেতৃত্ব নিয়েও সংস্থার ভেতরে প্রশ্ন উঠেছে। বিশ্বকাপের বাণিজ্যিক স্বত্ব সংক্রান্ত একটি বিনিয়োগ পরিকল্পনা নিয়ে কাউন্সিল সদস্যদের সঙ্গে যথাযথ আলোচনা না করায় বৃহস্পতিবারের বৈঠকে ক্ষমা চেয়েছেন তিনি।
‘ফিফা ফরোয়ার্ড এন্টারপ্রাইজ’ নামের ওই পরিকল্পনায় বিশ্বকাপসহ বিভিন্ন প্রতিযোগিতার বাণিজ্যিক স্বত্ব পরিচালনার জন্য একটি নতুন প্রতিষ্ঠান গঠনের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল। তবে ব্যাপক সমালোচনার মুখে পরিকল্পনাটি প্রত্যাহার করে নেওয়া হয়। ফিফা জানিয়েছে, এই পরিকল্পনাটি আর ফিরিয়ে আনা হবে না।
বিতর্কিত ওই পরিকল্পনার পাশাপাশি ট্রাম্পকে শান্তি পুরস্কার দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েও কাউন্সিল সদস্যদের প্রশ্নের মুখে পড়েছেন ইনফান্তিনো। তাঁর নেতৃত্বে সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া আরও স্বচ্ছ করার দাবি উঠেছে।
তবে শান্তি পুরস্কারটির ভবিষ্যৎ এখনো অনিশ্চিত। আগামী ডিসেম্বরে সামাজিক দায়বদ্ধতা কমিটির সুপারিশের ভিত্তিতেই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে ফিফা কাউন্সিল।