তয়না হাসান মুনা একজন নারী উদ্যোক্তা। তিনি ২০২৬ সালের জুনে ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ লিংক রোডের ভূঁইগড় এলাকায় ‘মুনা’স কিচেন’ নামে একটি রেস্তোরাঁ দিয়ে ব্যবসা শুরু করেন। কিছুদিন পর ‘ফুড রিভিউয়ার্স নারায়ণগঞ্জ’ নামের একটি ফেসবুক গ্রুপে তার রেস্তোরাঁর খাবারের মান নিয়ে একাধিক নেতিবাচক পোস্ট চোখে পড়ে। এরপর একদিন তার হোয়াটসঅ্যাপ নম্বরে মেসেজ আসে। তাতে প্রস্তাব করা হয়, তিনি যদি মাসিক ‘সাবস্ক্রিপশন’ নেন, তাহলে তার রেস্তোরাঁর বিরুদ্ধে আর নেতিবাচক পোস্ট আসবে না। ফ্যাক্টচেক প্রতিষ্ঠান দ্য ডিসেন্টের এক প্রতিবেদনে এসব তথ্য জানা গেছে।

এ বিষয়ে মুনা জানান, তার হোয়াটসঅ্যাপে একটি নম্বর থেকে মেসেজ আসে। তাতে লেখা, ‘আপু, আমি “ফুড রিভিউয়ার্স নারায়ণগঞ্জ” থেকে আকাশ বলছি। আপনার রেস্টুরেন্টের নামে অনেক অভিযোগ আসছে। আমাদের গ্রুপের সাবস্ক্রিপশন নিন। তাহলে আর নেগেটিভ পোস্ট আসবে না।’ আকাশ আরও উল্লেখ করেন, সাবস্ক্রিপশন এর মূল্য প্রতি মাসে ২০ হাজার টাকা করে। এই ফি দিয়ে সাবস্ক্রিপশন কিনলে সঙ্গে কিছু সুবিধাও অফার করা হয়। যার মধ্যে রয়েছে: ৬০টি প্রমোশনাল পোস্ট, ফুড ফটোশপ, সেই সঙ্গে একজন ব্লগার পজিটিভ ভিডিও করবে রেস্টুরেন্ট নিয়ে।

মুনা দ্য ডিসেন্টকে একটি ভিডিও পাঠান (যেটি তাকে আগে পাঠানো হয়েছিল), ভিডিওতে আকাশকে বলতে শোনা যায়, ‘আমাদের গ্রুপে ৫ লক্ষ প্লাস সদস্য আছে। নারায়ণগঞ্জের প্রায় সব রেস্টুরেন্টই আমাদের সাথে কাজ করে। আমাদের সাথে কাজ করলে আপনি ভালো ফিডব্যাক পাবেন। সে জন্যই আপনাকে নক করা। আমরা মার্কেটিং করে দিব।’

সদ্য প্রতিষ্ঠিত নিজের রেস্তোরাঁটিকে টিকিয়ে রাখতে মুনা একপর্যায়ে ১২ হাজার টাকা দিয়ে সাবস্ক্রিপশন কিনতে রাজি হন।

টাকা দিলে ইতিবাচক প্রচারণা, না দিলে হুমকি-নেতিবাচক পোস্ট

মুনা বলেন, ‘২০২৬ সালের ২৬ আগস্ট তাদের দেওয়া বিকাশ একাউন্টে প্রথম দফায় ছয় হাজার টাকা পাঠাই। এরপর ২৩ সেপ্টেম্বর একই নম্বরে আরও ছয় হাজার টাকা পাঠাই। এরপরেই আমার রেস্টুরেন্ট নিয়ে নেতিবাচক পোস্টগুলো ডিলেট করে দিয়ে ৪টি ইতিবাচক পোস্ট করা হয়।’

প্রতিবেদনে বলা হয়, বিকাশে প্রথম কিস্তির টাকা পরিশোধের দুই দিন পর ২৮ আগস্ট ‘ফুড রিভিউয়ার্স নারায়ণগঞ্জ’ ফেসবুক গ্রুপে ‘লামিয়া ইসলাম’ নামের একটি অ্যাকাউন্ট থেকে মুনা’স কিচেনের খাসির লেগ খিচুড়ির প্রচারমূলক পোস্ট করা হয়। ১ সেপ্টেম্বর ‘তুবা তনুশ্রী’ নামের আরেকটি অ্যাকাউন্ট থেকেও একই খাবারের প্রচারমূলক পোস্ট প্রকাশ করা হয়। ২ সেপ্টেম্বর ‘এঞ্জেল নিশা’ ও ১৪ সেপ্টেম্বর ‘সুমি ইসলাম’ নামের দুটি অ্যাকাউন্ট থেকে প্রচারমূলক পোস্ট করা হয়। বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ফুড রিভিউয়ার্স নারায়ণগঞ্জ ফেসবুক গ্রুপে এই অ্যাকাউন্টগুলো থেকে নিয়মিত বিভিন্ন রেস্টুরেন্টের খাবার নিয়ে প্রমোশনাল পোস্ট করা হয়।

যেভাবে বিপত্তির শুরু

সেপ্টেম্বরে দ্বিতীয় কিস্তিতে ছয় হাজার টাকা পরিশোধ করেন মুনা। ২ অক্টোবর একই মোবাইল নম্বর থেকে হোয়াটসঅ্যাপে আবার মেসেজ আসে। এবার প্রতি মাসে ৬০টি প্রমোশোনাল পোস্ট এবং নেতিবাচক পোস্ট না করার জন্য মুনার কাছে প্রতি মাসে ১২ হাজার টাকা চাওয়া হয়। এরপর মুনা আকাশকে লেখেন, ‘১২ হাজার টাকা তো মুখের কথা না। এই মাসে টাকা দেব না বলছি, তাই আবারো এই পোস্টগুলো এপ্রুভ করেছেন।’

তিনি প্রতি মাসে ১২ হাজার টাকা দিতে অপারগতা প্রকাশ করেন। এরপর ৪ অক্টোবর ‘ফুড রিভিউয়ার নারায়ণগঞ্জ গ্রুপ’সহ একাধিক গ্রুপ ও ফেসবুক পেজে তার রেস্তোরাঁ নিয়ে নেতিবাচক পোস্ট করা হয়। এসব পোস্টে খাবারের মান নিয়ে প্রশ্ন তোলা, বাসি খাবার পরিবেশনের অভিযোগ এবং ক্রেতাদের ওই রেস্তোরাঁয় না যাওয়ার আহ্বান জানানো হয় বলে জানিয়েছেন মুনা। তবে ফুড রিভিউয়ার নারায়ণগঞ্জ গ্রুপে পোস্টগুলো পাওয়া যায়নি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।

মুনা বলেন, ‘ফুড রিভিউয়ার্স নারায়ণগঞ্জ ফেসবুক গ্রুপের মালিক হিসেবে আমি আজিজ বিন মাশফিক অরফে তারেক নামে একজনকে চিনতাম। আমার রেস্টুরেন্ট নিয়ে আবারো নেতিবাচক পোস্ট আসা শুরু করলে আমি ১৯ সেপ্টেম্বর উনার সাথে কথা বলি। তবে তারেক ভাই আমাকে জানিয়েছেন গ্রুপটি তার নয়। তবে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, তারেক ভাইয়ের সাথে কথা বলার কিছুক্ষণ পরেই আকাশ আমাকে কল করে এবং আবারো হুমকি দেয়।’

পরে ৪ অক্টোবর মুনা’স কিচেনের ফেসবুক পেজে আকাশের সঙ্গে কথোপকথনের স্ক্রিনশট প্রকাশ করেন মুনা। সেখানে তিনি চাঁদাবাজি ও ব্ল্যাকমেইলিংয়ের অভিযোগ তোলেন। এসব ঘটনার পর মুনার স্বামী আহসান হাবিব (৩৫) নারায়ণগঞ্জ ফুড রিভিউয়ার্স গ্রুপের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সন্দেহে কয়েকজনের বিরুদ্ধে নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা মডেল থানায় অভিযোগ করেন। অভিযোগে শহরের আমলাপাড়া এলাকার বাসিন্দা আকাশসহ গ্রুপ-সংশ্লিষ্ট সাত থেকে আটজনের কথা উল্লেখ করা হয়। অভিযোগপত্রে আকাশের বয়সও ৩৫ বছর উল্লেখ করা হয়েছে। বিষয়টি নিয়ে তিনি ফেসবুক লাইভেও বক্তব্য দেন।

কী বলছেন অভিযুক্ত আকাশ

প্রতিবেদনে বলা হয়, আবিদ হাসান আকাশকে মুনা’স কিচেনের কাছে অর্থ চাওয়ার কথা জিজ্ঞেস করলে তিনি প্রচারণার জন্য অর্থ গ্রহণের কথা স্বীকার করেন। তবে তিনি কোনো রকম চাঁদাবাজি বা ব্ল্যাকমেলের সঙ্গে জড়িত না বলে জানান। আকাশ দাবি করে বলেন, ‘আমি মার্কেটিং এজেন্সি হিসেবে বিভিন্ন গ্রুপ ও ফুড ব্লগারদের সঙ্গে কাজ করি। রেস্টুরেন্টগুলোর সঙ্গে চুক্তি করে ব্লগারদের প্রমোশনাল ভিডিও করতে নিয়ে আসি এবং ফুড রিভিউয়ার্স নারায়ণগঞ্জ গ্রুপে আমি নানা রেস্টুরেন্টের সঙ্গে প্রমোশনাল পোস্ট নিয়ে মার্কেটিংয়ের কাজ করি এজেন্সি হিসেবে। মুনা’স কিচেনের সঙ্গে আমি এক মাস মার্কেটিংয়ের কাজ করেছি এবং সে হিসেবে পেমেন্ট নিয়েছি।’

তিনি বিরোধিতা করছেন না জানিয়ে বলেন, ‘উনার সাথে এক মাস কাজ করার পর উনি আমাকে তার আর্থিক সমস্যার কথার জানান এবং আমার সাথে আর কাজ না করার কথা বলেন। আমি মেনে নেই। কিন্তু এরপরে উনার রেস্টুরেন্টে অনেকে খেতে যায়, সেখান থেকে কেউ ভালো বলে কেউ খারাপ বলে, সেটা তো আমার দেখার কিছু না। খারাপ খাবার হতে পারে, সেটা অনেকে বিভিন্ন গ্রুপের মাধ্যমে প্রকাশ করে। কিন্তু মুনা মনে করেছেন সেই খারাপ রিভিউগুলো আমার লোকজন দিয়েছে। কিন্তু আমার এত সময় নেই যে আমি কারো বিরুদ্ধে লেগে থাকব।’

তয়না হাসান মুনা দাবি করে জানান, ফুড রিভিউয়ার্স নারায়ণগঞ্জ ফেসবুক গ্রুপের মালিক আজিজ বিন মাশফিক অরফে তারেক নামের একজন। এ বিষয়ে তারেক বলেন, ‘আমি আগে এই গ্রুপের এডমিন ছিলাম। তবে আমার নিজের ব্যবসা নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ায় অনেক আগেই এই দায়িত্ব থেকে সরে আসি। বর্তমানের এডমিনরা কী করছেন সেটা আমি জানি না।’

ফতুল্লা মডেল থানার বর্তমান অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মোহাম্মদ মাহবুব আলমকে মুনা’স কিচেনের জিডির ব্যাপারে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘জিডি হয়েছে, তবে এই বিষয়ে আমি বিস্তারিত জানি না। আমি এখন ব্যস্ত আছি।’

চাঁদাবাজির অভিযোগ আরও কিছু গ্রুপের বিরুদ্ধে

দ্য ডিসেন্ট বলছে, মুনা’স কিচেনের বাইরেও ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ ও মুন্সীগঞ্জের একাধিক রেস্টুরেন্ট ব্যবসায়ী একই ধরনের অভিযোগ করেছেন। খাবারের মান ও সেবার অভিজ্ঞতা জানাতে ফেসবুকভিত্তিক ফুড গ্রুপগুলোর জনপ্রিয়তা বেড়েছে। কোথায় খাবেন, কোনো রেস্তোরাঁর খাবার কেমন, এসব জানতে অনেক ব্যবহারকারী এসব গ্রুপে যুক্ত হন।

ঢাকাভিত্তিক জনপ্রিয় গ্রুপগুলোর মধ্যে রয়েছে—‘ফুড ব্যাংক’, ‘মিরপুর ফুড ব্যাংক’, ‘ঢাকা ফুড ব্যাংক’, ‘ওয়ারী ফুড ব্যাংক’ ও ‘শনির আখড়া ফুড ব্লগার্স’। নারায়ণগঞ্জে রয়েছে—‘ফুড রিভিউয়ার্স নারায়ণগঞ্জ’, ‘ফুড লাভারস অব নারায়ণগঞ্জ’ ও ‘ফুড নারায়ণগঞ্জ’। মুন্সীগঞ্জে রয়েছে—‘ফুড রিভিউয়ার্স মুন্সীগঞ্জ’ ও ‘ফুড ব্যাংক মুন্সীগঞ্জ’-এর মতো গ্রুপ। এসবের মধ্যে কয়েকটি গ্রুপের সদস্যসংখ্যা লাখের ঘরে।

একাধিক রেস্তোরাঁ ব্যবসায়ী জানিয়েছেন, খাবারের অভিজ্ঞতা ভাগাভাগির জন্য তৈরি কিছু গ্রুপকে ব্যবহার করে অর্থ আদায় ও ব্ল্যাকমেইলিং করা হচ্ছে। ক্রেতাদের রিভিউ যাচাই-বাছাই ও প্রকাশের ক্ষমতা কাজে লাগিয়ে রেস্টোরাঁ মালিকদের চাপ দেওয়া হয়। তবে গ্রুপের মূল মালিকরা অ্যাডমিন প্যানেলে নিজেদের অ্যাকাউন্ট যুক্ত করেন না। সেখানে অ্যাডমিন হিসেবে যুক্ত করা হয় ভুয়া অ্যাকাউন্ট বা মূল মালিক নন, এমন ব্যক্তিদের।

যেভাবে চলছে অনলাইন ফুড রিভিউ গ্রুপের ‘চাঁদাবাজি’

ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ ও মুন্সিগঞ্জের ১১ জন রেস্টুরেন্ট ব্যবসায়ীর মধ্যে পাঁচজন ফুড গ্রুপগুলোর জালিয়াতির কথা জানিয়েছেন। তারা বলছেন, কেউ নতুন রেস্টুরেন্ট স্থাপন করলেই গ্রুপগুলোর সঙ্গে যুক্ত চক্রের লোকজনকে সাধারণ ক্রেতা সাজিয়ে সেখানে খেতে পাঠানো হয়। পরে রেস্টুরেন্টের খাবারের মান, অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি কিংবা সেবা নিয়ে কৃত্রিমভাবে নেতিবাচক পোস্ট তৈরি করা হয়। তবে অ্যাডমিনরা তা সরাসরি গ্রুপে প্রকাশ না করে ‘পেন্ডিং’ তালিকায় রেখে দেন। এরপর সেই পেন্ডিং পোস্টের স্ক্রিনশট সরাসরি পাঠিয়ে দেওয়া হয় সংশ্লিষ্ট রেস্টুরেন্ট মালিকের হোয়াটসঅ্যাপ, মেসেঞ্জার বা ব্যক্তিগত নম্বরে।

তারা আরও বলেন, পোস্টটি প্রত্যাখ্যান, মুছে ফেলা বা স্থায়ীভাবে প্রকাশ না করার বিনিময়ে দাবি করা হয় মোটা অঙ্কের টাকা। টাকা দিতে রাজি না হলে প্রকাশ করা হয় নেতিবাচক পোস্ট। এতে নিজেদের ব্যবসায় ক্রেতা ধরে রাখতে বিপাকে পড়েন রেস্টুরেন্ট মালিকরা। তারা জানান, পরে সুযোগ বুঝে আবারও এসব পোস্ট প্রকাশের ভয় দেখিয়ে রেস্টুরেন্ট মালিকদের পেজের অ্যাডমিনদের সঙ্গে বা তাদের প্রতিনিধিদের সঙ্গে অনানুষ্ঠানিক কিংবা মৌখিক চুক্তিতে আসতে বাধ্য করা হয়। চুক্তির মূল শর্ত থাকে, প্রতি মাসে নির্দিষ্ট অঙ্কের টাকা দিলে ওই রেস্টুরেন্টের বিরুদ্ধে কোনো ধরনের নেতিবাচক পোস্ট গ্রুপে প্রকাশ করা হবে না। এটি কার্যত মাসিক সাবস্ক্রিপশনের মতো কাজ করে।

ব্ল্যাকমেইল করে টাকা আদায়ের বিনিময়ে গ্রুপে বিভিন্ন অ্যাকাউন্ট থেকে প্রতি মাসে প্রচারমূলক পোস্ট দিয়ে মার্কেটিং সুবিধাও দেওয়া হয়। এ ছাড়া রেস্টুরেন্টগুলোতে বড় কোনো উৎসব বা বিশেষ ছুটিতে গ্রুপের অ্যাডমিন ও তাদের সঙ্গীদের বিনা মূল্যে খাওয়ার সংস্কৃতিও গড়ে তোলে তারা। পাশাপাশি মাসিক টাকার বাইরে আলাদাভাবে অর্থ দেওয়ার বিনিময়ে তাদের নির্দিষ্ট করে দেওয়া বিভিন্ন ফুড ব্লগারকে দিয়ে প্রচারমূলক ভিডিও তৈরি করানোর শর্ত দেওয়া হয়। এসব ভিডিওর জন্য ব্লগারদের বিনা মূল্যে খাবার সরবরাহ এবং চড়া অঙ্কের ফি দিতে হয়। এর একটি অংশ পৌঁছে যায় গ্রুপের অ্যাডমিন ও তাদের হয়ে কাজ করা এজেন্টদের পকেটে।

তবে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ঢাকার এক জনপ্রিয় নারী ফুড ব্লগার জানান, তারা বিভিন্ন গ্রুপ ও রেস্টুরেন্টের সঙ্গে কাজ করা এজেন্টদের কাছ থেকে কাজ পান। এজেন্টরা কাজের ব্যবস্থা করে দেন, আর তারা সংশ্লিষ্ট রেস্টুরেন্টে খেয়ে নিজেদের জনপ্রিয় অ্যাকাউন্টে রিভিউ প্রকাশ করেন। তবে ওই চক্রের বাইরে কাজ করলে বেশি কাজ পাওয়া যায় না। তবে নেতিবাচক ভিডিওর বিষয়ে তিনি বলতে চাননি। একই কথা জানান নারায়ণগঞ্জের আরেক ফুড ব্লগার। তিনি বলেন, এখন ফুড ব্লগারের সংখ্যা অনেক বেশি। ফলে প্রতিযোগিতাও বেশি। তবে এসব সিন্ডিকেটের সঙ্গে কাজ করলে নিয়মিত কাজ পাওয়া যায়। এতে আয়ের একটি অংশ দিতে তাদের সমস্যা নেই।

রেস্টুরেন্ট খোলার এক-দুই সপ্তাহের মধ্যেই ফোন

নারায়ণগঞ্জ শহরের চাষাঢ়া এলাকার এমডি স্কয়ার ভবনের একটি রেস্টুরেন্টের মালিক বলেন, লাখ লাখ টাকা বিনিয়োগ করে ব্যবসা শুরুর এক-দুই সপ্তাহের মধ্যেই গ্রুপের অ্যাডমিন ও তাদের হয়ে কাজ করা ব্যক্তিদের ফোন আসতে থাকে। খাবারের মান যত ভালোই হোক, টাকা না দিলে তারা লোক পাঠিয়ে বানিয়ে খারাপ রিভিউ দেওয়ার নাটক করেন তারা। ব্যবসার সুনাম ও ক্রেতা হারানোর আশঙ্কায় প্রতি মাসে টাকা দিতে হচ্ছে বলে দাবি করেন তিনি।

মিরপুর ১২ নম্বর এলাকার একটি রেস্টুরেন্টের ব্যবস্থাপক বলেন, এসব গ্রুপকে টাকা দেওয়া রেস্টুরেন্ট ব্যবসায় একধরনের সংস্কৃতিতে পরিণত হয়েছে। তার মতে, টাকা না দিয়ে ব্যবসা চালানো কঠিন। তিনি জানান, তারা ঢাকাভিত্তিক ‘ফুড ব্যাংক’ গ্রুপকে বিপণনের জন্য নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ দেন। কোনো ঝামেলায় জড়াতে চান না বলে নিজেরাই গ্রুপটির সঙ্গে যোগাযোগ করেছিলেন। গ্রুপটির সদস্যসংখ্যা প্রায় ২৫ লাখ।

ঢাকার খিলগাঁওয়ের শহীদ বাকী সড়কের একটি রেস্টুরেন্টের ব্যবস্থাপক বলেন, প্রকৃত ক্রেতাদের গঠনমূলক সমালোচনা তারা স্বাগত জানান। কিন্তু কিছু ফেসবুক গ্রুপের কর্মকাণ্ডকে তিনি ‘জিম্মি ব্যবসা’ বলে বর্ণনা করেন। তার অভিযোগ, টাকা দিয়ে রিভিউ না নিলে ভুয়া আইডির মাধ্যমে পেজের রেটিং কমিয়ে দেওয়ার হুমকি দেওয়া হয়। গ্রুপে নিয়মিত নেতিবাচক পোস্ট দিয়েও প্রতিষ্ঠানের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করা হয়।

মুন্সীগঞ্জ শহরের সদর হাসপাতাল সড়কের সুপার মার্কেট এলাকার এক রেস্টুরেন্ট ব্যবসায়ী জানান, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মাসিক টাকা দেওয়ার বিষয়টি মাথায় রেখেই তারা ব্যবসার খরচ হিসাব করেন। শেষ পর্যন্ত এই বাড়তি খরচ ক্রেতাদের ওপর পড়ে বলে তার বক্তব্য।

নাম প্রকাশ করতে রাজি না হওয়া এসব ব্যবসায়ী জানান, এই সিন্ডিকেট শক্তিশালী এবং কয়েক বছর ধরে সক্রিয়। প্রকাশ্যে বিরোধিতা করলে নেতিবাচক প্রচারণার মাধ্যমে ব্যবসার ক্ষতি করা হতে পারে বলে আশঙ্কা করেন তারা।

এ বিষয়ে ‘ফুড ব্যাংক’ পরিচালনার সঙ্গে যুক্ত ফুড ব্লগার উজান আহমেদ বলেন, গ্রুপ পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণে খরচ হয়। কোনো রেস্তোরাঁ প্রচারমূলক রিভিউ দিতে চাইলে নির্দিষ্ট অর্থ পরিশোধ করে। ‘মহা খাদক উজান’ পেজের এই ব্লগার জানান, ‘ফুড ব্যাংক’ কাউকে কোনো ধরনের চাপ দেয় না।