নিষিদ্ধ সময়সীমা শুরু হলেও থামেনি মা ইলিশ শিকার। বরিশাল জেলা মৎস্য দপ্তর ও নৌ-পুলিশের বিভিন্ন অভিযান সত্ত্বেও মেঘনা এবং এর সংলগ্ন নদীগুলোতে প্রকাশ্যে চলছে ইলিশ শিকারের মহোৎসব। অভিযোগ উঠেছে, স্থানীয় বিএনপি নেতাদের প্রত্যক্ষ মদদ ও নিয়ন্ত্রণে সশস্ত্র হয়ে নদীতে নামছে হাজার হাজার জেলে। এর ফলে অভিযানে যাওয়া আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী প্রতিনিয়ত হামলার শিকার হয়ে পিছু হটতে বাধ্য হচ্ছে। প্রজনন মৌসুম শুরুর মাত্র পাঁচ দিনেই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে স্থানীয় প্রশাসন পুরোপুরি অসহায় হয়ে পড়েছে।

মৎস্য দপ্তরের সহকারী পরিচালক মোহাম্মদ আলম জানান, ইলিশ প্রজনন মৌসুমে স্বচ্ছ ও মিষ্টি পানিতে ডিম ছাড়ে। সমুদ্র থেকে উঠে আসার পর সেই স্বচ্ছ ও মিষ্টি পানি পায় মেঘনা নদীর মেহেন্দিগঞ্জের উলানিয়া থেকে পুরো হিজলা অংশে। এই অংশটি ১০/১২টি নদীর মুখ হওয়ায় এখানে গভীরতা অনেক বেশি এবং কোনো চর নেই। ফলে প্রজনন মৌসুমে প্রচুর ইলিশ এখানে চলে আসে। তিনি জানান, গত বছর কঠোর অভিযানের কারণে এ বছর ইলিশের পরিমাণ ও আকার দুটোই বেড়েছে। কিন্তু এ বছর সংঘবদ্ধ জেলেদের কারণে মা ইলিশ রক্ষা করা যাচ্ছে না। মেঘনা নদীর মেহেন্দিগঞ্জের উলানিয়া পর থেকে অন্তত ৬০ কিলোমিটার এলাকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই এলাকায় মাছ শিকার বন্ধ করতে না পারলে নিষেধাজ্ঞার কোনো ফল আসবে না এবং ভবিষ্যতে ইলিশ আরও কমে যাবে।

হিজলার জ্যেষ্ঠ মৎস্য কর্মকর্তা কেএম মাহফুজুর রহমান বলেন, “স্বাভাবিক মৌসুমের চেয়ে বর্তমানে দুই থেকে তিনগুণ বেশি জাল ফেলছে জেলেরা। অভিযান করে ধাওয়া দিলে সরে যায়। জাল তুলতে গেলে ১০/১২ নৌকা সশস্ত্র অবস্থায় হামলা করে। প্রতিদিনই জেলেরা ভয়ংকর আচরণ করছে। সব বুঝলেও কিছু বলা যাচ্ছে না। তবুও আমরা চেষ্টা করছি, যতটুকু রক্ষা করা যায়।”

নাম প্রকাশ না করার শর্তে হিজলার অন্তত ১০ জন বাসিন্দা জানান, মূল মেঘনা এখন উন্মুক্ত এবং সেখানে প্রশাসনের কোনো উপস্থিতি নেই। দিনরাত জেলেরা নির্বিঘ্নে মা ইলিশ নিধন করছে। উপজেলার হিজলা গৌরবদি ইউনিয়নের কাঁকুড়িয়া বাজার সংলগ্ন খাল, ওরাকুল রাস্তার মাথা, ধুলখোলা ইউনিয়নের খেয়াঘাট এবং মাঝেরচর—প্রতিটি স্পট মূল মেঘনার পাড়ে অবস্থিত। এখানে ২৪ ঘণ্টা ধরে উন্মুক্ত মাছ শিকার, আহরণ ও বিক্রি চলছে।

তাদের অভিযোগ, হিজলা উপজেলার বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক আলতাফ হোসেন খোকন দপ্তরি ও সদস্য সচিব দেওয়ান মনির হোসেন মেঘনা নদীর মাছ শিকার ও কেনাবেচা নিয়ন্ত্রণ করছেন। তিনি ঠিক করে দিচ্ছেন কোন জেলেরা কখন এবং কোথায় মাছ শিকার করবে। তাদের নির্দেশনার বাইরে কেউ মাছ শিকার বা কেনাবেচা করতে পারে না।

এছাড়া আবুপুর লঞ্চ ঘাট নিয়ন্ত্রণ করেন বিএনপি নেতা খালিদ মাঝি। টুমচর নদীর কিনারায় বেবাজিয়া পাড়া নিয়ন্ত্রণ করেন তার ছেলে রিফাত। এছাড়া নাচকাটি হান্নান ও আরিফ, ক্রোপ চুন্নু খা ও ফরাদ বাগার, কাঁকুড়িয়া ইসমাইল শেখ, ফারুক সরকার, মোস্তফা শিকদার আলাম শরীফ এবং দলু মোল্লা, অন্তর্বাম, চরকিল্লা ও জানপুর খোকা বেপারী ও আব্দুল কুদ্দুস লিটন, তিন নম্বর ঘাট খোকা বেপারী, উলানিয়া মিজান মাঝি ও মিঠন চৌধুরী এই কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ করছেন। তাদের ছত্রছায়ায় প্রকাশ্যে মাছ শিকার ও বিক্রি হচ্ছে। অভিযোগ রয়েছে, বিএনপি নেতারা মাছ বিক্রির শতকরা ১০ টাকা করে নেন। এছাড়া নদীতে প্রতিটি জালের জন্য প্রশাসনের নাম করে দুই হাজার টাকা করে নেওয়া হচ্ছে।

অভিযানিক দলের মধ্যে আতঙ্ক ছড়াতে সংঘবদ্ধ জেলেরা হামলা চালাচ্ছে। গত পাঁচ দিনে প্রায় প্রতিদিন এমন হামলার ঘটনা ঘটেছে। হামলাকারী জেলেদের নিবৃত্ত করতে কোস্টগার্ড এখন পর্যন্ত ১১ রাউন্ড গুলি করেছে। এই হামলায় হিজলা উপজেলার মৎস্য দপ্তরের স্পিড বোটও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। উপজেলা প্রশাসন, নৌ-পুলিশসহ কোস্টগার্ড এখন পর্যন্ত নামকাওয়াস্তে অভিযান পরিচালনা করছে বলে অভিযোগ। নৌ-বাহিনীর কোনো উপস্থিতি সেখানে দেখা যাচ্ছে না।

হিজলার মেঘনা নদীর প্রবীণ জেলে মোতালেব হোসেন বেপারী বলেন, “এ বছর মেঘনা নদীতে প্রচুর মাছ ধরা পড়ছে। এ কারণে জেলেদের নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না। হাজার হাজার জেলেরা মাছ শিকার করছে। কোন বাহিনীর পক্ষে তাদের নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হচ্ছে না। যদি ১০টি বাহিনীও একত্র হয়, তবুও তাদের নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে না। দুই উপজেলায় ৫০ হাজার জেলে বর্তমানে মাছ শিকার করে।”

বরিশাল জেলা মৎস্য দপ্তরের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, এ বছর ১০টি উপজেলার ৭৯ হাজার ৮৯০ জন নিবন্ধিত জেলেদের মাঝে বিতরণ করার জন্য ১৯৯৭ দশমিক ২৫০ মেট্রিক টন চাল বরাদ্দ হয়েছে। মঙ্গলবার পর্যন্ত ১০৮৪ দশমিক ৭০০ মেট্রিক টন চাল বিতরণ করা হয়েছে। জেলায় মোট নিবন্ধিত জেলে রয়েছেন ৮৫ হাজার ২৯৫ জন। গত পাঁচ দিনে ২৫ জন জেলেকে জেল দেওয়া হয়েছে এবং ৫১ দশমিক ১০ লাখ টাকা জরিমানা আদায় করা হয়েছে। এছাড়া ১৬ দশমিক ২৬৩ লাখ মিটার জাল এবং দশমিক ২৫০ মেট্রিক টন মা ইলিশ উদ্ধার করা হয়েছে।

হিজলা নৌ-পুলিশ ফাড়ির ইনচার্জ ইয়াছিনুল হক বলেন, “মেঘনা অনেক বড় নদী। সেই তুলনায় আমাদের লোকবল খুবই কম। নিষেধাজ্ঞার সময় জেলেরা হিংস্র হয়ে উঠে। তাদের সেই ধরনের আচরন তো করা যায় না। রাতের বেলায় অভিযানে গিয়ে সবাইকে ঝুকিতে ফেলা হয়। অভিযান করা হয়, আমাদের সামর্থ্য অনুযায়ী।”

এ সব বিষয়ে হিজলা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. ইলিয়াস সিকদার বলেন, “দুই প্রভাবশালী নেতাকে ডেকে নিষেধাজ্ঞা সময়ে যেন মাছ শিকার না করে সেই সহায়তা চাওয়া হয়েছে। রাতের বেলায় সব সময় অভিযান করা হয় না। দুই একবার করা হয়, ফাঁকা সময়ের সুযোগ নিয়ে শিকার করে। আমরা চেষ্টা করছি, সেটা বন্ধ করার।”

অভিযোগের বিষয়ে হিজলা উপজেলা বিএনপির সদস্য সচিব দেয়ান মনির হোসেন বলেন, “আমরা সরকারের পক্ষে আছি। যারা মাছ শিকার করবে তাদের বিরুদ্ধে প্রশাসন ব্যবস্থা নেবে। আমার প্রশাসনের পক্ষে রয়েছি।”

বরিশাল জেলা মৎস্য কর্মকর্তা ড. মো হাদিউজ্জামান বলেন, “মেঘনা নদীর ৬০ কিলোমিটার এলাকা গুরুত্বপূর্ন। এ গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় নৌ-বাহিনীর একটি জাহাজ যদি মোতায়েন করা যেত, সাথে কোস্টগার্ড ও পুলিশ থাকলে মাছ শিকার বন্ধ করা যেত। আমরা চেষ্টা করে যাচ্ছি। অনেক কিছুই বলতে পারা যায় না।”