মা ইলিশ রক্ষায় ২২ দিনের সরকারি নিষেধাজ্ঞা বলবৎ থাকলেও লক্ষ্মীপুরের মেঘনা নদীর বিভিন্ন এলাকায় ইলিশ শিকার ও বিক্রির ব্যাপক অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, প্রশাসনের নিয়মিত অভিযান ও নজরদারি চললেও নদী থেকে ধরা ইলিশ নদীতীরের অস্থায়ী আড়তে বিক্রি করা হচ্ছে। স্থানীয়দের দাবি, দিনের আলোর চেয়ে রাতের আঁধারে মাছ শিকারের তৎপরতা অনেক বেশি থাকে। অন্যদিকে, ঋণের কিস্তি পরিশোধ, নৌকা ও জাল কেনার দেনা এবং সরকারি সহায়তা না পাওয়ার কথা উল্লেখ করে কিছু জেলে জীবিকার তাগিদে নদীতে নামছেন বলে অভিযোগ করা হয়েছে।

স্থানীয় জেলেদের ভাষ্যমতে, তারা রাতভর নদীতে জাল ফেলে মাছ ধরেন এবং ভোরে নদীর পাড়ে গড়ে ওঠা অস্থায়ী আড়তে তা বিক্রি করেন। দ্রুত মাছ বিক্রি শেষ করে তারা পুনরায় নদীতে ফিরে যান। মাছের উচ্চ চাহিদা ও দাম বেশি থাকায় নিষেধাজ্ঞার তোয়াক্কা না করে কেউ কেউ বাড়তি আয়ের আশায় ইলিশ শিকার করছেন বলে স্থানীয়রা অভিযোগ করেছেন। এই পরিস্থিতির কারণে মা ইলিশের প্রজনন রক্ষায় নেওয়া সরকারি কর্মসূচির কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

জেলেদের একাংশের দাবি, ঋণের কিস্তি, নৌকা ও জাল কেনার দেনা এবং দাদনের চাপে তারা চরম বিপাকে পড়েছেন। নিষেধাজ্ঞার সময়ে সরকারি সহায়তার তালিকায় নাম থাকা সত্ত্বেও অনেকে চাল পাননি বলে অভিযোগ করেছেন। ফলে সংসারের খরচ জোগাতে তারা বাধ্য হয়েই নদীতে নামছেন বলে জানিয়েছেন।

টাকার বিনিময়ে মাছ শিকারের সুযোগের অভিযোগ

নিষেধাজ্ঞার সময়েও মাছ শিকারের সুযোগ করে দিতে কিছু অসাধু কর্মকর্তা অর্থ গ্রহণ করেন বলে অভিযোগ করেছেন কয়েকজন জেলে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে তাদের দাবি, টাকা দিলে মাছ ধরার সুযোগ পাওয়া যায়, আর টাকা না দিলে হয়রানির শিকার হতে হয়। তবে এসব অভিযোগের স্বাধীনভাবে সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হয়নি।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক ক্রেতা বলেন, “গত সোমবার মেঘনা নদীর তীরের মজুচৌধুরীর হাটের দ্বিতীয় গেট দিয়ে সামনে এগোতেই একটি বাড়ির উঠানে অস্থায়ী মাছের আড়ত দেখতে পাই। সেখানে ডাকের মাধ্যমে ইলিশ বিক্রি হচ্ছিল। ওই আড়ত থেকে আমিও ইলিশ কিনেছি।”

ওই ক্রেতার দাবি, জেলেরা মেঘনা নদী থেকে ধরা ইলিশ সেখানে বিক্রির জন্য নিয়ে আসছেন। দাম তুলনামূলক কম হওয়ায় দূর-দূরান্ত থেকে অনেক ক্রেতা মাছ কিনতে আসছেন। প্রতিদিন এসব পয়েন্টে লাখ লাখ টাকার ইলিশ কেনাবেচা হচ্ছে বলেও তিনি দাবি করেন।

লক্ষ্মীপুরের কমলনগরের মাতাব্বরহাট, নাছিরগঞ্জ ও মতিরহাট, সদর উপজেলার বুড়িরঘাট ও মজুচৌধুরীর হাট, রায়পুরের পুরান বেড়ির মাথা এবং চরভৈরবী সীমান্তসংলগ্ন মেঘনার বিভিন্ন এলাকায় নিষেধাজ্ঞার মধ্যে মাছ শিকার ও বিক্রির অভিযোগ পাওয়া গেছে। স্থানীয়দের দাবি, নদী থেকে ধরা মাছ এনে এসব এলাকার নদীতীরবর্তী অস্থায়ী আড়তে বিক্রি করা হচ্ছে।

তাদের অভিযোগ, অভিযান পরিচালনাকারী দল চলে যাওয়ার পর বিভিন্ন স্থানে মাছের বেচাকেনা জমে ওঠে। নিষেধাজ্ঞার মধ্যে এসব আড়তে বিক্রি হওয়া ইলিশের উৎস, বিক্রেতাদের পরিচয় এবং কেনাবেচায় জড়িত ব্যক্তিদের ভূমিকা যাচাই করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।

অভিযানের তথ্য ফাঁসের সন্দেহ, প্রমাণ মেলেনি

অভিযানের সময় ধারণ করা একটি ভিডিও ফুটেজে প্রশাসনের টহল নৌকা, জব্দ করা জাল এবং নৌকায় থাকা এক পুলিশ সদস্যকে মোবাইল ফোনে কথা বলতে দেখা যায়। এ দৃশ্য ঘিরে স্থানীয়দের কেউ কেউ প্রশ্ন তুলেছেন যে, অভিযানের তথ্য আগেই মাছ শিকারিদের কাছে পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে কি না।

তাদের অভিযোগ, অভিযানের খবর আগে জানতে পারলে জেলেরা সতর্ক হয়ে যান, যার ফলে অভিযান ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। তবে ওই পুলিশ সদস্য কার সঙ্গে বা কী বিষয়ে কথা বলছিলেন, তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি। তার ফোনালাপের সঙ্গে অভিযানের তথ্য ফাঁসের কোনো যোগসূত্রও প্রতিষ্ঠিত হয়নি।

৪২ হাজার জেলে পরিবারের জন্য চাল বরাদ্দ

মৎস্য বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, মা ইলিশের প্রজনন নির্বিঘ্ন রাখতে ৮ অক্টোবর থেকে ২৯ অক্টোবর পর্যন্ত মেঘনা নদীতে ইলিশসহ সব ধরনের মাছ ধরায় নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে। এ সময়ে মাছ ধরা, পরিবহন, মজুত ও বিক্রির ওপর বিধিনিষেধ রয়েছে। নিষেধাজ্ঞা বাস্তবায়নে প্রশাসন, মৎস্য বিভাগ ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী অভিযান পরিচালনা করছে।

জেলা মৎস্য কর্মকর্তার কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, নিষেধাজ্ঞার সময়ে লক্ষ্মীপুরের ৪২ হাজার ১৫০টি জেলে পরিবারের জন্য পরিবারপ্রতি ২৫ কেজি করে মোট ১ হাজার ৫৩ দশমিক ৭৫ মেট্রিক টন চাল বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। তবে বরাদ্দের বিপরীতে কতটি পরিবার চাল পেয়েছে, তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি। তালিকায় নাম থাকা সত্ত্বেও চাল না পাওয়ার অভিযোগের বিষয়ে বিতরণসংক্রান্ত তথ্য যাচাই করা প্রয়োজন।

সীমিত জনবলে অভিযান পরিচালনার চ্যালেঞ্জ

এ বিষয়ে রায়পুর ও সদর উপজেলার দায়িত্বপ্রাপ্ত সিনিয়র উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা মাহফুজুল হাসনা বলেন, “সীমিত জনবল ও বরাদ্দ দিয়ে বড় পরিসরে অভিযান পরিচালনা এবং অপরাধীদের আটক করা কঠিন। সফল অভিযানের জন্য পর্যাপ্ত লজিস্টিক সহায়তা, অর্থ বরাদ্দ ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সহযোগিতা প্রয়োজন।”

অভিযানে বিভিন্ন বাহিনীর সদস্যদের কার্যক্রম সমন্বয়ের ক্ষেত্রেও দায়িত্ব ও ক্ষমতার সীমাবদ্ধতা রয়েছে বলে জানান তিনি।

লক্ষ্মীপুরের জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মো. জসিম উদ্দিন বলেন, “নিষেধাজ্ঞা বাস্তবায়নে জেলা ও উপজেলা প্রশাসন, নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট, কোস্টগার্ড, নৌ পুলিশ ও থানা পুলিশের সহযোগিতায় অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। জেলেদের সচেতন করতে সভা, মাইকিং, লিফলেট বিতরণ এবং ব্যানার-পোস্টারের মাধ্যমেও প্রচার চালানো হয়েছে।”

অভিযানের সময় কোনো পুলিশ সদস্যের মোবাইল ফোনে যোগাযোগ বা অনিয়মের বিষয়ে তার কাছে অভিযোগ আসেনি বলে জানান জেলা মৎস্য কর্মকর্তা। এ ধরনের অভিযোগ পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও জানান তিনি।

রায়পুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট আজিজুন্নাহার বলেন, “মা ইলিশ সংরক্ষণে উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। নিষেধাজ্ঞা শতভাগ বাস্তবায়নে উপজেলা প্রশাসনের তৎপরতা অব্যাহত রয়েছে।”

অভিযানের সময় কোনো পুলিশ সদস্যের মোবাইল ফোনে যোগাযোগ বা অনিয়মের বিষয়ে এখন পর্যন্ত তার কাছে অভিযোগ আসেনি বলেও জানান তিনি। এ ধরনের অভিযোগ পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।