হরমুজ প্রণালির মধ্য দিয়ে সারের পরিবহন ব্যবস্থা ব্যাহত হওয়ায় এশিয়া ও আফ্রিকার বিভিন্ন অঞ্চলে খাদ্যনিরাপত্তা নিয়ে গভীর উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। এই সংকটের ফলে বিশ্ববাজারে খাদ্যের দাম আরও বৃদ্ধি পাওয়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে। বর্তমান পরিস্থিতি মোকাবিলায় ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রকে দ্রুত পারস্পরিক সমঝোতায় পৌঁছানোর আহ্বান জানিয়েছে জাতিসংঘ। সংস্থাটির পক্ষ থেকে প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে যে, জাতিসংঘের সরাসরি তত্ত্বাবধানে হরমুজ প্রণালি দিয়ে সারের পরিবহন কার্যক্রম পরিচালিত হোক।

জাতিসংঘের আন্ডার সেক্রেটারি জেনারেল হোর্হে মোরেইরা দা সিলভা গতকাল বুধবার এই বিষয়ে কথা বলেন। থাইল্যান্ডের ব্যাংককে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) ও বিশ্বব্যাংকের বৈঠকের ফাঁকে রয়টার্সকে তিনি এসব তথ্য জানান।

হোর্হে মোরেইরা দা সিলভা বলেন, “বীজ বপনের মৌসুম ঘনিয়ে আসায় আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের এ প্রস্তাবে সম্মত হওয়া ‘অত্যন্ত জরুরি’।” তিনি সতর্ক করেন যে, বীজ বপনের নির্দিষ্ট সময় পার হয়ে গেলে বড় ধরনের বিপদ হতে পারে। এই সময়ে কৃষকেরা প্রয়োজনীয় সার না পেলে কৃষি উৎপাদন উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পাবে, যার সরাসরি প্রভাব পড়বে খাদ্যের দামের ওপর এবং তা বহুগুণ বেড়ে যাবে।

জাতিসংঘের বিস্তারিত প্রস্তাবে উল্লেখ করা হয়েছে যে, ওমানে জাতিসংঘের কর্মীদের পরিচালনায় একটি সমন্বয়কেন্দ্র স্থাপন করা হবে। এই কেন্দ্রের মূল দায়িত্ব হবে জাহাজের নিবন্ধন প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা এবং হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজের নিরাপদ চলাচল তদারকি করা।

অন্যদিকে, সেপ্টেম্বর মাসে জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) খাদ্যমূল্য সূচক প্রায় চার বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে। গত মাসে এই সূচকের মান ছিল ১৩৬। মূলত সরবরাহব্যবস্থায় বিঘ্ন এবং প্রতিকূল আবহাওয়ার কারণে এই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে এল নিনোর তীব্রতা বৃদ্ধির আশঙ্কায় আন্তর্জাতিক বাজারে চিনির দাম বেড়ে গত ১৮ মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ স্তরে পৌঁছেছে।

এর পাশাপাশি যুদ্ধের প্রভাবে কৃষ্ণসাগরীয় অঞ্চলে বাণিজ্য ব্যবস্থা কার্যত ভেঙে পড়ায় গত মাসের শুরুতে গমের ভবিষ্যৎ সরবরাহ চুক্তির দাম তিন বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে উঠেছিল। বর্তমান পরিস্থিতিতে সারের অভাবে কৃষি উৎপাদন ব্যাহত হলে সামগ্রিক খাদ্য সংকট আরও প্রকট হতে পারে। কৃষি আবাদের একটি নির্দিষ্ট সময়সীমা থাকে, ফলে বীজ বপনে সামান্য বিলম্ব হলেও ফলন মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার সম্ভাবনা থাকে।

উল্লেখ্য, ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সংঘাত শুরু হওয়ার পর থেকে হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল মারাত্মকভাবে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। ইরান এই প্রণালিতে চলাচলকারী জাহাজে হামলা চালাচ্ছে। অন্যদিকে, হরমুজ প্রণালির আশপাশে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে পাল্টাপাল্টি হামলা অব্যাহত রয়েছে।

এই উত্তেজনার ফলে বিশ্ববাজারে ইউরিয়া সারের সরবরাহ ব্যাহত হচ্ছে। ইউরিয়া হলো বিশ্বের সবচেয়ে বহুল ব্যবহৃত নাইট্রোজেনসমৃদ্ধ সার। এছাড়া সারের অন্যতম প্রধান কাঁচামাল সালফারের পরিবহনও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। যুদ্ধ শুরুর আগে বিশ্বের মোট ইউরিয়া পরিবহনের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ এবং সমুদ্রপথে পরিবাহিত সালফারের প্রায় অর্ধেকই হরমুজ প্রণালির মধ্য দিয়ে যেত।

তীব্র সংকটের মধ্যেও কিছু জাহাজ এই প্রণালি দিয়ে চলাচল করতে সক্ষম হচ্ছে। তবে ওয়াশিংটনভিত্তিক আন্তর্জাতিক খাদ্যনীতি গবেষণা ইনস্টিটিউটের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে যেসব পণ্য পরিবহন করা হচ্ছে, তার মধ্যে সারের পরিমাণ ‘খুবই নগণ্য’।

হোর্হে মোরেইরা দা সিলভা জানান, জাতিসংঘের সমর্থিত সার পরিবহনব্যবস্থার পরিকল্পনাটি গত মার্চ মাসেই তৈরি করা হয়েছিল। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান এই পরিকল্পনায় সম্মত হলে মাত্র ৭ থেকে ১০ দিনের মধ্যে এটি কার্যকর করা সম্ভব। তবে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান কেন এখনো এই প্রস্তাবে রাজি হয়নি, সে বিষয়ে তিনি কোনো মন্তব্য করেননি।

দা সিলভা আরও বলেন, “প্রতিদিন মাত্র পাঁচটি জাহাজ হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচল করতে পারলেও যেসব দেশে জরুরি ভিত্তিতে সার প্রয়োজন, সেসব দেশে সরবরাহ অব্যাহত রাখা সম্ভব হবে।”