মুখে লড়াই ও প্রতিরোধের কথা বললেও যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে চলমান সংঘাতের ফলে ইরানের সামনে পথ ক্রমে সংকুচিত হয়ে আসছে। ওয়াশিংটন এখন বুঝতে পেরেছে যে, ইরানকে কেবল সামরিকভাবে সম্পূর্ণ পর্যুদস্ত করা সম্ভব নয়। তাই তারা রণকৌশল বদলেছে; সামরিক হামলার পরিবর্তে এখন নজর দেওয়া হয়েছে ইরানের অর্থনীতিকে পঙ্গু করে দেওয়ার দিকে। দৃশ্যত এই কৌশলে যুক্তরাষ্ট্র অধিক সাফল্য অর্জন করেছে এবং খোদ ইরানি কর্তৃপক্ষও এই সত্য স্বীকার করে নিয়েছে।
ওয়াশিংটনের চাপানো নৌ-অবরোধের ফলে একদিকে যেমন হরমুজ প্রণালি দিয়ে তেলবাহী জাহাজের চলাচল বেড়েছে, অন্যদিকে ইরানের নিজস্ব তেল রপ্তানি উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। ব্রাসেলসভিত্তিক জাহাজ ও পণ্য পরিবহন পর্যবেক্ষণকারী প্রতিষ্ঠান কেপলারের ২৯ সেপ্টেম্বরের হিসাব অনুযায়ী, সেপ্টেম্বরের প্রথম ২৮ দিনে এই অঞ্চল থেকে দৈনিক অন্তত ১ কোটি ৬৫ লাখ ব্যারেল অপরিশোধিত তেল ও হালকা তরল পেট্রোলিয়াম রপ্তানি হয়েছে। ইরানকে বাদ দিলে এই পরিমাণ যুদ্ধপূর্ব গড়ের সমান এবং ইরানসহ হিসাব করলে তা প্রায় ৯১ শতাংশ। তবে কেপলারের তথ্যমতে, এই পথ দিয়ে ইরানি তেলের রপ্তানি কার্যত শূন্য। অর্থাৎ, প্রতিবেশী দেশগুলো বাজারে তেল পৌঁছানোর পথ খুঁজে পেলেও ইরান তা পারেনি।
ইরানের জন্য এই পরিস্থিতি দ্বিমুখী সংকটের সৃষ্টি করেছে। একদিকে তেল রপ্তানি বাধাগ্রস্ত হওয়ায় জাতীয় আয় কমছে, অন্যদিকে হরমুজ প্রণালি নিয়ন্ত্রণ করে বিশ্ব অর্থনীতির ওপর যে চাপ সৃষ্টি করতে চেয়েছিল, বিকল্প পথ ও পরিবহনব্যবস্থার কারণে তার কার্যকারিতা হ্রাস পাচ্ছে। ফলে দেখা যাচ্ছে, প্রতিবেশীরা তাদের আয় ফিরে পাচ্ছে, কিন্তু ইরানকে এখন নিজস্ব সঞ্চয়ের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে।
এই চাপের সবচেয়ে স্পষ্ট বহিঃপ্রকাশ ঘটছে মুদ্রাবাজারে। রয়টার্সের ৩ অক্টোবরের হিসাব অনুযায়ী, খোলাবাজারে ১ ডলার কিনতে এখন প্রায় ২৬ লাখ ৮৮ হাজার ইরানি রিয়াল প্রয়োজন হচ্ছে। গত এক বছরে ইরানি রিয়াল তার মূল্যের অর্ধেকের বেশি হারিয়েছে এবং মূল্যস্ফীতি ৭০ শতাংশ ছাড়িয়েছে। মুদ্রার এই পতন ঠেকাতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক সর্বোচ্চ ২ বিলিয়ন বা ২০০ কোটি ডলার বিক্রির উদ্যোগ নিয়েছে। সরকারি হিসাবের বাইরেও এই সংকটের প্রভাব সাধারণ মানুষের জীবনে স্পষ্ট—আগের মতো আয় দিয়ে বাজার খরচ চালানো বা বাড়িভাড়া মেটানো অসম্ভব হয়ে পড়েছে। চলতি বছরের শুরুর দিকে অর্থনৈতিক মন্দার কারণেই দেশজুড়ে বিক্ষোভ ছড়িয়েছিল, যার আশঙ্কা এখনো বিদ্যমান।
যুক্তরাষ্ট্র কেবল তেলের পথ বন্ধ করেই থেমে নেই। ‘অপারেশন ইকোনমিক আউটকাস্ট’-এর আওতায় ১ অক্টোবর যুক্তরাষ্ট্রের অর্থ বিভাগ ইরানের গাড়ি, রেল, উৎপাদন ও ইস্পাত খাতের বিদেশি সরবরাহকারীদের বিরুদ্ধে নতুন নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে। এর ফলে বিদেশি ব্যাংক ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের ঝুঁকি আরও বেড়েছে। ইরানের সঙ্গে নিষিদ্ধ লেনদেনে জড়ানো প্রতিষ্ঠানগুলো মার্কিন আর্থিক ব্যবস্থায় প্রবেশাধিকার হারানোর আশঙ্কায় রয়েছে। ফলে ইরান এতদিন যে বিকল্প পথে বাণিজ্য চালিয়ে আসছিল, সেটিও এখন কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সংকটের এই গভীরতা ইরানের অভ্যন্তরীণ পর্যায়েও স্বীকৃত। ইরান ইন্টারন্যাশনালের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ৩ অক্টোবর সরকারের অর্থনৈতিক সমন্বয়সংক্রান্ত এক সভায় সর্বোচ্চ জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের সচিব মহসেন রেজাই বলেছেন, “দেশ তার সবচেয়ে কঠিন সময়গুলোর একটির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে।” তবে সংকট স্বীকার করার অর্থ এই নয় যে, তারা ওয়াশিংটনের সাফল্যের দাবি মেনে নিয়েছে। ইরানি কর্মকর্তারা এখনো অর্থনীতির আসন্ন পতনের পূর্বাভাস প্রত্যাখ্যান করে আসছেন।
ওয়াশিংটনের এই অর্থনৈতিক চাপের মধ্যে যেমন সাফল্যের সম্ভাবনা আছে, তেমনি বিপদের বীজও লুকিয়ে আছে। এই চাপ ইরানকে আলোচনার টেবিলে নিয়ে আসতে পারে, আবার পরিস্থিতি আরও খারাপ হলে তেহরান যুদ্ধের পরিধি বাড়ানোর পথ বেছে নিতে পারে।
লন্ডনভিত্তিক গবেষণাপ্রতিষ্ঠান চ্যাথাম হাউসের মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকা কর্মসূচির পরিচালক সানাম ভাকিল ওয়াল স্ট্রিট জার্নালকে এই আশঙ্কার কথাই জানিয়েছেন। তাঁর মতে, হরমুজকে ঘিরে ইরানের কৌশলের কার্যকারিতা কমে গেলে সংকট থেকে উত্তরণের জন্য দেশটি নিজেই বৃহত্তর সংঘাত উসকে দিতে পারে। জ্বালানিবিষয়ক গবেষণাপ্রতিষ্ঠান এনার্জি অ্যাসপেক্টসের রিচার্ড ব্রোঞ্জও সতর্ক করেছেন যে, হরমুজের ওপর প্রভাব কমছে বলে মনে হলে ইরানি নেতৃত্ব সংঘাত বাড়ানোর অন্য পথ খুঁজতে পারে।
এই আশঙ্কার পেছনে যথেষ্ট যুক্তি রয়েছে। ইরান যদি নিজের তেল নির্বিঘ্নে রপ্তানি করতে না পারে, তবে তারা প্রতিবেশীদের রপ্তানি পথও নির্বিঘ্ন রাখতে চাইবে না। বন্দর, শোধনাগার বা পাইপলাইনে হামলা চালিয়ে সরবরাহে বিঘ্ন ঘটানো অথবা পরিবহনের খরচ বাড়িয়ে দেওয়ার মাধ্যমে চাপ সৃষ্টি করা সম্ভব। এর উদ্দেশ্য হবে ইরানের অর্থনৈতিক যন্ত্রণাকে অন্যদের যন্ত্রণায় পরিণত করা। তখন সমঝোতার তাগিদ শুধু তেহরানের থাকবে না, বরং ওয়াশিংটন ও তার মিত্রদেরও বাড়বে—ইরান হয়তো এই হিসাব কষে রাখতে পারে।
এদিকে হুতিদের সঙ্গে সৌদি আরবের পুরোনো বিবাদ এখন একটি পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধের দিকে যাচ্ছে। হুতিদের একমাত্র সামরিক ও রাজনৈতিক মিত্র হিসেবে এই যুদ্ধ ইরানের জন্য বাড়তি বোঝা হয়ে দাঁড়াতে পারে। ইরান ও হুতি—এই দুই পক্ষকে মাথায় রেখেই তুরস্ক ও পাকিস্তানকে নিয়ে সৌদি আরব মক্কা চুক্তি স্বাক্ষর করেছে এবং এখন সেই চুক্তির ফল পেতে শুরু করেছে। পাকিস্তান ইতিমধ্যে ১০ হাজার অতিরিক্ত সেনা ও ৪টি বিমানবোঝাই অস্ত্র পাঠিয়েছে। অর্থাৎ, হুতিদের পাশে থাকতে হলে ইরানকে এই ত্রিদেশীয় জোটকে সামাল দিতে হবে।
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের আশা, অব্যাহত চাপের মুখে ইরান তাঁর দেওয়া শর্তে সমঝোতা করবে। সেই লক্ষ্যে তিনি একই সঙ্গে যুদ্ধের হুমকি ও চুক্তির কথা বলে চলেছেন। ১ অক্টোবর প্রকাশিত টাইম ম্যাগাজিনের সঙ্গে এক সাক্ষাৎকারে তিনি ইরানকে ধ্বংস করার সম্ভাবনা উড়িয়ে দেননি। আবার বলেছেন, ইরান চুক্তি করতে চায়। মধ্যবর্তী নির্বাচনের পর বোমা হামলা বাড়াবেন কি না, এমন প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেছেন, “সেটাও সম্ভব।”
যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক প্রস্তুতিও অব্যাহত রয়েছে। অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস জানিয়েছে, প্রায় ৯ হাজার নাবিক ও মেরিনসহ অতিরিক্ত যুদ্ধজাহাজ মধ্যপ্রাচ্যের দিকে পাঠানো হচ্ছে, যার মধ্যে তৃতীয় একটি বিমানবাহী রণতরিও রয়েছে। এই সামরিক শক্তি নতুন হামলার সুযোগ তৈরি করবে এবং আলোচনায় চাপ বাড়াতে কার্যকর হবে।
তবে আশার কথা হলো, এত হুমকির মধ্যেও কূটনৈতিক যোগাযোগ পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। জানা গেছে, জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশন চলাকালে ইরান একটি প্রস্তাব দিয়েছে, যার জবাব যুক্তরাষ্ট্র কাতারের মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে পাঠিয়েছে। তেহরানের দাবি, জুনে স্বাক্ষরিত সমঝোতার ভিত্তিতে তাদের সাতটি শর্ত পূরণ হলে হরমুজে স্বাভাবিক চলাচল ফিরিয়ে আনা সম্ভব। এই মুহূর্তে দর-কষাকষির মূল প্রশ্ন হলো—কে আগে পদক্ষেপ নেবে।
ইরান চাইছে নিষেধাজ্ঞা থেকে মুক্তি এবং আটকে থাকা অর্থের ফেরত। অন্যদিকে ওয়াশিংটন চাইছে ইরানের কাছ থেকে গ্রহণযোগ্য অঙ্গীকার। তেহরানের ভয়, আগে ছাড় দিলে প্রতিশ্রুত সুবিধা আর মিলবে না; আর ওয়াশিংটনের ভয়, আগে চাপ কমালে ইরান অঙ্গীকার থেকে সরে যাবে।
যুক্তরাষ্ট্রে ৩ নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচন এই পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। এই নির্বাচনে নিশ্চিত ভরাডুবি এড়াতে ট্রাম্প সম্ভবত একটি ‘অক্টোবর সারপ্রাইজ’–এর পরিকল্পনা করছেন। তিনি আশা করছেন, একদিকে অর্থনৈতিক চাপ এবং অন্যদিকে সামরিক হুমকি ইরানকে তাঁর শর্তে চুক্তি করতে বাধ্য করবে। ট্রাম্পের জন্য সেটি হবে এক মস্ত তুরুপের তাস।
— হাসান ফেরদৌস, সাংবাদিক, প্রাবন্ধিক ও কলাম লেখক। (মতামত লেখকের নিজস্ব)