বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলারের ওপরে উঠেছে। ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সংঘাত তীব্র হওয়ায় তেলের সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ বাড়ায় এই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। আজ বৃহস্পতিবার সকালেও ব্রেন্ট ক্রুডের দাম বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ১০১ দশমিক ৪ ডলারে দাঁড়িয়েছে। গতকাল বুধবার ব্রেন্টের দাম ২ দশমিক ১ শতাংশ বৃদ্ধি পায়।
গত জুলাইয়ের পর এই প্রথম আন্তর্জাতিক বাজারের মানদণ্ড হিসেবে পরিচিত ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ১০০ ডলারের সীমা অতিক্রম করল। সম্প্রতি ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে উত্তেজনা বৃদ্ধি পেয়েছে এবং গতকাল দুই পক্ষ তেলবাহী ট্যাংকারে হামলা ও পাল্টা হামলা চালিয়েছে। এর ফলে হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে, যা তেলের বাজারে ঊর্ধ্বমুখী চাপের মূল কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
রিস্টাড এনার্জির তথ্য অনুযায়ী, আগস্টের শুরুতে পারস্য উপসাগর থেকে প্রতিদিন গড়ে ৬ থেকে ৮ মিলিয়ন বা ৬৮ লাখ ব্যারেল অপরিশোধিত তেল সরবরাহ করা হতো, যা আগস্টের শেষ দিকে বেড়ে দৈনিক ৮ থেকে ৯ মিলিয়ন বা ৮৯ লাখ ব্যারেলে পৌঁছেছিল। তবে সাম্প্রতিক সংঘাতের পর এই সরবরাহ নাটকীয়ভাবে কমে দৈনিক ২ মিলিয়ন বা ২০ লাখ ব্যারেলের নিচে নেমে গেছে। সাত দিনের গড় সরবরাহও কমে ৪ থেকে ৫ মিলিয়ন বা ৪৫ লাখ ব্যারেলে দাঁড়িয়েছে। জাহাজ পর্যবেক্ষণকারী প্রতিষ্ঠান কেপলার জানিয়েছে, ২ সেপ্টেম্বরের পর থেকে একটিও অতি বৃহৎ অপরিশোধিত তেলবাহী জাহাজ হরমুজ প্রণালি পার হয়নি।
এদিকে সংঘাত আরও তীব্র হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র জানিয়েছে, পারস্য উপসাগরে পাঁচটি ইরানি তেলবাহী জাহাজ ধ্বংস করা হয়েছে। এর প্রতিক্রিয়ায় ইরান জর্ডানের এক মার্কিন ঘাঁটিতে হামলা চালিয়েছে। দুই পক্ষের মধ্যে উত্তেজনা প্রশমনের কোনো স্পষ্ট লক্ষণ না থাকায় তেলের দাম আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
তবে কিছু বিকল্প পথে তেল রপ্তানির কারণে পরিস্থিতি খুব বেশি খারাপ হয়নি। সংযুক্ত আরব আমিরাত ফুজাইরাহ বন্দরে, ইরাক তুরস্ক হয়ে ভূমধ্যসাগরীয় উপকূলে এবং সৌদি আরব লোহিত সাগরের ইয়ানবু বন্দরে পাইপলাইনের মাধ্যমে তেল পাঠাচ্ছে। তবে এই বিকল্প পথগুলোও ঝুঁকির মুখে রয়েছে। ইয়েমেনের হুতিরা সৌদি জাহাজে হামলা চালিয়েছে এবং চলতি সপ্তাহে জিজান তেল শোধনাগারে হামলা হয়েছে। এছাড়া আরব উপদ্বীপের আরও কয়েকটি শোধনাগার ইরানি বাহিনীর হামলার শিকার হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে তেলের দাম নিয়ন্ত্রণে রাখা কঠিন হবে। আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার (আইইএ) মাসিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, জুলাই পর্যন্ত মধ্যপ্রাচ্যে দৈনিক প্রায় ৮৩ লাখ ব্যারেল তেল উৎপাদন বন্ধ ছিল এবং বিশ্বব্যাপী তেলের মজুত ৬ কোটি ৯০ লাখ ব্যারেল কমেছে। অর্থাৎ জুলাই মাসে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ২৭ লাখ ব্যারেল তেলের মজুত হ্রাস পেয়েছে।
বছরের শেষ প্রান্তিকে তেলের চাহিদা বাড়ার সম্ভাবনা থাকায় দাম আরও বৃদ্ধির আশঙ্কা রয়েছে। তবে কিছু বিশ্লেষক মনে করেন, বিশ্ববাজারে পর্যাপ্ত তেল ও উৎপাদন থাকায় উত্তেজনা কমলেই দাম কমতে পারে। তবে দীর্ঘমেয়াদী প্রবণতা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরের তুলনায় ব্রেন্ট ক্রুডের দাম প্রায় ৪০ ডলার এবং ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েটের (ডব্লিউটিআই) দাম ৩০ ডলারের বেশি বেড়েছে।
ইতিমধ্যেই মারাবান ক্রুড, ডিএমই ওমান বেঞ্চমার্ক এবং ওপেকের তেলের গড় দাম ১০০ ডলার ছাড়িয়েছে। ভারতের আমদানি করা তেলের দামও ১০০ ডলারের ওপরে। তেহরান ও ওয়াশিংটনের মধ্যে শান্তি আলোচনার কোনো ইঙ্গিত না থাকায় তেলের দাম দ্রুত কমার সম্ভাবনা কম বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।