ঢাকার আশুলিয়ায় অবস্থিত ‘শারমিন গ্রুপের’ একটি কারখানার ছাদ থেকে পড়ে মো. জামাল উদ্দিন (৩৮) নামের এক কর্মকর্তার মৃত্যু হয়েছে। তিনি ওই কারখানায় সিনিয়র মার্চেন্ডাইজার হিসেবে কর্মরত ছিলেন। এই মর্মান্তিক ঘটনার পর পুলিশের বিরুদ্ধে মামলা নিতে গড়িমসির অভিযোগ ওঠে। পরবর্তীতে মৃতের বড় দুই ভাই থানা ফটকে অনশনে বসলে এবং সংবাদকর্মীদের উপস্থিতিতে আশুলিয়া থানা পুলিশ অবশেষে মামলাটি গ্রহণ করে। উক্ত মামলায় প্রধান আসামি করা হয়েছে শারমিন গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ইসমাইল হোসেনকে এবং দ্বিতীয় আসামি করা হয়েছে পরিচালক শারাফ হোসেনকে।
বুধবার (১৪ অক্টোবর) রাত সাড়ে ১২টার দিকে আশুলিয়া থানার ফটকের সামনে মৃত্যুর প্রকৃত কারণ উদঘাটন এবং মামলা গ্রহণে পুলিশের দীর্ঘসূত্রিতার প্রতিবাদে অনশনে বসেন নিহতের স্বজনরা। সংবাদকর্মীদের উপস্থিতি টের পাওয়ার পর পুলিশ অভিযোগটি আমলে নেয়। জানা গেছে, একই দিন সকালে কারখানার ৮ তলার ছাদ থেকে নিচে পড়ে গিয়ে সিনিয়র কর্মকর্তা জামাল উদ্দিনের মৃত্যু হয়।
নিহত জামাল উদ্দিন গাজীপুর সদরের বুরুলিয়া ডুয়েট এলাকার মৃত মো. সেকেন্দার আলীর ছেলে। তিনি আশুলিয়ার নরসিংহপুর এলাকায় অবস্থিত শারমিন গ্রুপের ডিভিশন-৩-এর সিনিয়র মার্চেন্ডাইজার হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন।
পরিবারের পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয়েছে যে, কারখানার ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের চরম খারাপ আচরণ এবং মানসিক নির্যাতনের কারণেই তিনি মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেওয়া হয়েছেন।
জানা গেছে, ন্যায়বিচার এবং মৃত্যুর সঠিক কারণ উদঘাটনের দাবিতে নিহতের বড় ভাই ইস্কান্দার আলী লিখিত অভিযোগ নিয়ে থানায় গেলেও পুলিশ তা গ্রহণ করতে গড়িমসি করে এবং বারবার ড্রাফট পরিবর্তন করতে বলে। দুপুর থেকে মৃতের স্বজনেরা মামলা দায়েরের চেষ্টা করলেও পুলিশ তা গ্রহণ করেনি বলে অভিযোগ উঠেছে। এরপর বিচারের দাবিতে বুধবার রাত ১২টার দিকে আশুলিয়া থানার ফটকের সামনে অনশনে বসেন মৃতের বড় দুই ভাই কুতুবউদ্দিন খান ও ইস্কান্দার আলী খান। প্রায় বিশ মিনিট ধরে চলা এই অনশনের সময় থানা ফটকে কান্নায় ভেঙে পড়েন ইস্কান্দার আলী। পরবর্তীতে পুলিশ তাদের ডেকে নিয়ে মামলাটি গ্রহণ করে।
নিহত ব্যক্তির স্বজনদের দাবি, অফিসিয়াল বা অন্য কোনো আক্রোশের জেরে জামাল উদ্দিনকে হত্যা করা হয়েছে এবং ঘটনাটি ধামাচাপা দিতে নাটক সাজানো হয়েছে। তাদের অভিযোগ, পুলিশ তাদের মরদেহ দেখতে না দিয়ে সরাসরি মর্গে পাঠিয়ে দিয়েছে। তারা এই বিষয়ে সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত রহস্য উদঘাটন এবং দোষীদের আইনের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন।
বুধবার বিকেলে মামলা গ্রহণের আগে হাতে লিখিত অভিযোগপত্র নিয়ে থানা ফটকে দাঁড়িয়ে ইসকান্দার বলেন, “মৃত জামাল উদ্দিন আমার ভাই। আমরা দুপুর ২টা থেকে একটা অভিযোগ দায়েরের জন্য এই থানায় ঘুরছি, কিন্তু পুলিশ এখনও আমাদের অভিযোগ বা মামলা নেয়নি। আমরা যেখানেই যাই, কেউ আমলে নিচ্ছে না। আমরা তো এই ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচার চাচ্ছি। কারখানা কর্তৃপক্ষ ও প্রভাবশালী মহলের চাপে পুলিশ মামলা নিতে টালবাহানা করছে, বারবার ড্রাফট পরিবর্তন করতে বলছে। আমাদের না জানিয়ে মরদেহ হাসপাতাল থেকে মর্গে পাঠানো হয়েছে। এখন পর্যন্ত আমাদের লাশটা দেখতে দেওয়া হয়নি। আমরা ন্যায়বিচার না পাওয়া পর্যন্ত এই থানা ফটক থেকেই নড়ব না।”
পরবর্তীতে সংবাদকর্মীদের উপস্থিতি টের পেয়ে পুলিশ তাদের থানায় ডেকে নেয় এবং অভিযোগটি আমলে নেয়। পুলিশ দণ্ডবিধি ১৮৬০-এর ৩০৬ ধারায় আত্মহত্যার প্ররোচনার অপরাধে মামলাটি রেকর্ড করে। এই মামলায় প্রধান আসামি করা হয়েছে শারমিন গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ইসমাইল হোসেনকে এবং দ্বিতীয় আসামি করা হয়েছে পরিচালক শারাফ হোসেনকে।
এ বিষয়ে আশুলিয়া থানার পরিদর্শক (অপারেশন) মো. আবুল কালাম আজাদ মামলার সত্যতা নিশ্চিত করে জানান, “রাতে দুজনকে আসামি করে আত্মহত্যার প্ররোচনার অভিযোগে মামলা গ্রহণ করা হয়েছে। মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে এবং এ বিষয়ে আইনগত পরবর্তী পদক্ষেপ গ্রহণ করা হচ্ছে।”
মৃতের স্ত্রী নাহারের দাবি, গতকাল রাত সাড়ে ১১টায় মোবাইল ফোনে জামাল উদ্দিন জানিয়েছিলেন যে কারখানায় একটু ঝামেলা হয়েছে। সকালেও কথা হয়েছিল, তখন তিনি বলেছিলেন মালিক খারাপ যেকোনো কিছু করতে পারে। পরে তাকে অফিসে যেতে নিষেধ করা হলেও তিনি জানান, অফিস থেকে উল্টো তাকে ফাঁসিয়ে দিতে পারে। কিন্তু অফিসে যাওয়ার পর তিনি আর ফোন রিসিভ করেননি। এর দুই ঘণ্টা পর অন্য একজন তার স্বামীর ফোন রিসিভ করে জানান যে তিনি অসুস্থ এবং হাসপাতালে যাওয়ার পরামর্শ দেন। পরবর্তীতে জানানো হয় যে তিনি আত্মহত্যা করেছেন। তবে নাহারের দাবি, তার স্বামী কখনোই আত্মহত্যা করতে পারেন না।
এদিকে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কারখানার এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ও নিহতের সহকর্মী বলেন, “এখানে একটা অকারেন্স অবশ্য হয়েছে। মেরে ফেলছে না আত্মহত্যা করছে, না পড়ে গেছে এটা তো আসলে যারা ভেতরে থাকে তারা বলতে পারে। এখন ধরেন সে স্পট ডেট। এখানে অনেক ঘটনা আছে। আমাদের জন্য অফিস শাটডাউন দেওয়া হয়েছে। এটা আপনি আত্মহত্যা বলতে পারেন, হত্যা বলতে পারেন। এখানে মালিক কে সেটাও আমরা জানি। তার ক্ষমতা সম্পর্কেও আমরা জানি।”
প্রাথমিক সুরতহাল শেষে আশুলিয়া থানার উপপরিদর্শক (এসআই) ফাহিম বলেন, “সিসিটিভি ফুটেজে লাফ দেওয়ার দৃশ্য দেখা গেছে। আসলে কি হয়েছে তদন্ত শেষে জানা যাবে।”