আট বছরের দীর্ঘ প্রবাস জীবনের সব ক্লান্তি মুছে ফেলে আপন স্বজনদের মাঝে কিছুটা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলতে দেশে ফিরেছিলেন নজরুল ইসলাম রাব্বি। তবে প্রত্যাশার বিপরীতে দেশে ফিরে তিনি দেখলেন, তার শেষ আশ্রয়স্থল পরিবারেও আর কোনো ঠাঁই নেই। বাবার কঠোর বাধার মুখে গত এক সপ্তাহ ধরে ঘরের বাইরে রাত কাটাতে হচ্ছে এই প্রবাসী যুবককে।

পারিবারিক এই বিবাদ মীমাংসার লক্ষ্যে মঙ্গলবার (৬ অক্টোবর) সকালে ফেনী মডেল থানার ওসির কক্ষে একটি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। তবে সেখানে উপস্থিত বাবা ও ছেলের মধ্যে কোনো ধরনের সমঝোতা সম্ভব হয়নি। শেষ পর্যন্ত পুলিশ তাদের এই পারিবারিক জটিলতা আদালতের মাধ্যমে নিষ্পত্তি করার অনুরোধ জানায়।

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, ফেনী সদর উপজেলার শর্শদী ইউনিয়নের দক্ষিণ খানে বাড়ি এলাকার জামাল উদ্দিনের ছেলে নজরুল ইসলাম রাব্বি গত ২৮ সেপ্টেম্বর দীর্ঘ ৮ বছর পর সৌদি আরব থেকে দেশে ফেরেন। বাড়ি পৌঁছে তিনি লক্ষ্য করেন, তার বাবার ঘরে তালা ঝুলছে এবং পাশের ঘরটি ভাড়া দেওয়া হয়েছে, যাতে তিনি কোনোভাবেই ভেতরে প্রবেশ করতে না পারেন।

রাব্বির অভিযোগ, তার বাবা জামাল উদ্দিন তাকে ঘরে ঢুকতে বাধা দিচ্ছেন এবং বর্তমানে তাকে নিজের সন্তান হিসেবে স্বীকার করতে অস্বীকার করেছেন। শুধু তিনি নন, তার বোনকেও নিজের সন্তান বলে মানছেন না বাবা।

নিজের অসহায়ত্বের কথা জানিয়ে রাব্বি বলেন, “প্রবাসে থেকে পরিবারের জন্য অর্থ উপার্জন করেছি। বাবা ও আমি মিলেমিশে জায়গা কিনে এই ঘর তৈরি করেছি। এখন ২৯ বছর বয়সে এসে শুনতে হচ্ছে আমি নাকি তার ছেলেই না! উনি আমার মাকে ২০২৩ সালের দিকে ডিভোর্স দিয়েছেন, তা তিনি দিতেই পারেন। কিন্তু সন্তান হিসেবে আমাদের ওপর কেন এই অবিচার? আমার অনুরোধ থাকবে, প্রশাসন যেন বিষয়টি সুষ্ঠু তদন্ত করে আমার অধিকার ফিরিয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা নেয়।”

ছেলের সব অভিযোগ খণ্ডন করে বাবা জামাল উদ্দিন মুক্তকণ্ঠকে বলেন, “ও আমার ছেলে না। আড়াই বছর আগে তার মায়ের সঙ্গে আমার ছাড়াছাড়ি হয়ে গেছে। আমি নিজেও এক সময় প্রবাসী ছিলাম। কুমিল্লার ভিটেমাটি বিক্রি করে নতুন করে ১৬ শতক জায়গা কিনে নিজস্ব উপার্জনে ১০ বছর আগে এই দোতলা ঘর করেছি, কারও এক টাকাও নেইনি। বর্তমানে আমি ডায়বেটিসহ নানা রোগে ভুগছি। কেউ আমার কোনো খবর রাখেনি।”

ছেলের স্বভাবকে বেপরোয়া আখ্যা দিয়ে জামাল উদ্দিন আরও অভিযোগ করেন, “প্রথমে ওকে কুয়েত পাঠিয়েছিলাম। সেখানে কাজ না করে অনলাইনে বন্ধুদের আড্ডায় পড়ে জুয়ায় আসক্ত হয়ে পড়ে। পরে হোটেল ব্যবসা দিয়েও লস খায়। দেশে এনে আবার আত্মীয়স্বজনদের সহযোগিতায় সৌদি পাঠানো হয়। সে আমাকে বিভিন্ন সময় মেরে ফেলার হুমকি দিয়েছে এবং আমাকে ‘মানসিক রোগী’ বলে অপপ্রচার চালিয়েছে। এর আগে সে আমাকে আট মাস ঘরে ঢুকতে দেয়নি। উল্টো আমার ভাড়াটিয়াদের সঙ্গেও খারাপ আচরণ করেছে। বাধ্য হয়ে আমি তার বিরুদ্ধে থানায় একাধিক অভিযোগ দায়ের করেছি।”

বাবার এই অভিযোগ অস্বীকার করে ছেলে রাব্বি বলেন, “মাকে এত বছরের সংসারের পর তালাক দিয়েছে। তখন সাময়িক রাগারাগি থেকে কিছু বলেছিলাম। তাই বলে আমাকে তো তিনি অস্বীকার করতে পারেন না।”

জামাল উদ্দিনের অভিযোগের প্রেক্ষিতে সরেজমিনে তদন্ত করতে যাওয়া ফেনী মডেল থানার এসআই আবু হাসনাত মিশু মুক্তকণ্ঠকে জানান, ভাড়াটিয়াদের সঙ্গে খারাপ আচরণের অভিযোগ পেয়ে সোমবার তারা ঘটনাস্থলে গিয়ে ছেলেসহ সবার সঙ্গে কথা বলেছেন। তার মতে, “যতটুকু বুঝতে পারছি এটি একটি পারিবারিক কলহ। যার কারণে বাবা ছেলের মানসিক দূরত্ব তৈরি হয়েছে। জিজ্ঞাসাবাদে ছেলেটি ভাড়াটিয়াদের সঙ্গে খারাপ আচরণ করার বিষয়টি অস্বীকার করেছে।”

এই বিষয়ে শর্শদি ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক তারেক ইকবাল মনি মুক্তকণ্ঠকে বলেন, এটি আসলে দীর্ঘ দিনের পারিবারিক কলহ। স্থানীয়রা বহুবার চেষ্টা করেও সমাধান করতে পারেনি। এর কারণে এলাকার বদনাম হচ্ছে। আমরা চাই দ্রুত এ বিবাদের মিমাংসা হোক।

ফেনী মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আমিনুল ইসলাম মুক্তকণ্ঠকে বলেন, “এটি আসলে একটি পারিবারিক কলহের ঘটনা। এ বিষয়ে মীমাংসার জন্য আমরা মঙ্গলবার সকালে বাবা ছেলে দুইজনকেই থানায় ডেকেছিলাম। তারা এলাকার লোকসহ থানায় এসেছিলেন। আমরা উভয় পক্ষের বিস্তারিত আলোচনা শুনে সমঝোতার প্রস্তাব দিলে কোনো পক্ষই আমাদের প্রস্তাবে রাজি হয়নি। পরে এই বিষয়ে তাদের আদালতে যাওয়ার পরামর্শ প্রদান করে আমরা বৈঠক শেষ করেছি।”